বিশ্ব
বিশ্ব রাজনীতির দাবার চালে পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বার ‘হরমুজ প্রণালি’ এখন কেবল একটি ভৌগোলিক রেখা নয়, বরং এটি বিশ্ব অর্থনীতির স্পন্দন। ওমান ও ইরানের মধ্যবর্তী মাত্র ২১ মাইল প্রশস্ত এই সরু জলপথটি দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ২০ শতাংশেরও বেশি পরিবাহিত হয়। ২০২৬ সালের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই অঞ্চলে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা বাংলাদেশের মতো ক্রমবর্ধমান জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এক নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা খনিজ তেল ও এলএনজির ওপর নির্ভরশীল, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই জলপথ দিয়ে দেশে পৌঁছায়।
বর্তমানে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের একটি বড় অংশ আমদানি করা এলএনজি এবং খনিজ তেলের ওপর নির্ভরশীল। দেশের শিল্পায়ন ও ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি বজায় রাখতে সরকার যে পরিমাণ জ্বালানি আমদানির পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, তার প্রধান উৎস হিসেবে কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
২০২৬ সালের বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের এলএনজি আমদানির একটি বড় অংশ আসে কাতার ও ওমান থেকে। একইভাবে ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলের সরবরাহ চেইন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত। হরমুজ প্রণালীতে চলাচলের ওপর কোনো ধরণের ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বা কারিগরি বিঘ্ন ঘটলে সরবরাহ ব্যবস্থা যাতে নিরবচ্ছিন্ন থাকে, সেটি নিশ্চিত করা এখন জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয়।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যের ওঠানামা সরাসরি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলে। হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ ও ট্যাঙ্কারের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়লে বিশ্ববাজারে বীমা খরচ এবং পরিবহন ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যায়। বাংলাদেশের জন্য এটি একটি কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। একদিকে উচ্চমূল্যে জ্বালানি ক্রয়ের ফলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর এক ধরণের চাপ সৃষ্টি হয়, অন্যদিকে সরবরাহে বিলম্ব ঘটলে উৎপাদনশীল খাতে তার প্রভাব অনুভূত হয়। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের মতো রপ্তানিমুখী শিল্প এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য। বর্তমান প্রেক্ষাপটে জ্বালানি সরবরাহ চেইনকে বৈচিত্র্যময় করার প্রয়োজনীয়তা আগের চেয়ে অনেক বেশি অনুভূত হচ্ছে।
বাংলাদেশের বর্তমান জ্বালানি ব্যবহারের চিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, দেশীয় খনিগুলো থেকে প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আমদানির ওপর নির্ভরতা একটি বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। দেশের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে সরকার দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির পাশাপাশি স্পট মার্কেট থেকেও জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে হরমুজ প্রণালীর অস্থিরতা নির্দেশ করে যে, একক কোনো ভৌগোলিক অঞ্চলের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা কমিয়ে বিকল্প উৎসের সন্ধান করা প্রয়োজন। বর্তমান সময়ে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটের কারণে মুদ্রাস্ফীতির যে ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে, তা মোকাবিলায় সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি নিশ্চিত করা সরকারের জন্য একটি বড় লক্ষ্য। শিল্প ও কৃষি খাতে জ্বালানির যোগান নিরবচ্ছিন্ন রাখতে কার্যকর ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের জন্য এখন বহুমুখী কৌশল অবলম্বন করা প্রয়োজন। প্রথমত, জ্বালানি আমদানির উৎসে বৈচিত্র্য আনা একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি অন্যান্য বিভিন্ন দেশ থেকে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিতে জ্বালানি সংগ্রহের সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে। এতে করে কোনো একটি নির্দিষ্ট জলপথে সমস্যা তৈরি হলেও বিকল্প পথ বা উৎস থেকে জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখা সম্ভব হবে।
দ্বিতীয়ত, আঞ্চলিক জ্বালানি সহযোগিতাকে আরও সুসংহত করা প্রয়োজন। প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহ বৃদ্ধি এবং জলবিদ্যুৎ আমদানির মতো প্রকল্পগুলো জ্বালানি নিরাপত্তা বলয়কে আরও শক্তিশালী করবে।
দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সম্পদ অনুসন্ধানে গতিশীলতা আনা এখন অপরিহার্য। বাংলাদেশের নিজস্ব ভূখণ্ডে এবং বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। সাশ্রয়ী এবং টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থার জন্য স্থলভাগের পুরোনো কূপগুলো থেকে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন নতুন খনি আবিষ্কারে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি যেমন সৌরশক্তি, বায়ুবিদ্যুৎ এবং বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের হার বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। এটি আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই একটি জ্বালানি কাঠামো তৈরিতে সহায়তা করবে।
জ্বালানি সংরক্ষণের ক্ষমতা বা মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধি করাও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংকটকালীন জাতীয় চাহিদা মেটানোর জন্য দেশজুড়ে স্টোরেজ টার্মিনালগুলোর সক্ষমতা পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হচ্ছে। নতুন নতুন অয়েল রিফাইনারি স্থাপন এবং এলএনজি টার্মিনালের সংখ্যা বৃদ্ধি করার মাধ্যমে জ্বালানি মজুতের একটি শক্তিশালী পরিকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে কোনো অস্থিরতা তৈরি হলেও সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় কোনো বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা কমে আসবে। এ ছাড়া সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বয়ে জ্বালানি মজুত ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও ডিজিটাল তদারকির আওতায় আনা হচ্ছে।
জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে মিতব্যয়ী হওয়া এবং অপচয় রোধ করা এখন একটি জাতীয় কর্তব্য হিসেবে দেখা দিচ্ছে। শিল্প কারখানা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে জ্বালানি ব্যবহারে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। ‘এনার্জি এফিসিয়েন্সি’ বা শক্তি সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতির ব্যবহার উৎসাহিত করার মাধ্যমে সামগ্রিক চাহিদা কিছুটা কমিয়ে আনা সম্ভব। লোড ডেসপাচ সেন্টারের আধুনিকায়ন এবং গ্রিড লাইনের সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সিস্টেম লস কমিয়ে আনলে উৎপাদিত জ্বালানির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হবে। অপ্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে জ্বালানি ও বিদ্যুতের ব্যবহার কমিয়ে এনে তা উৎপাদনশীল খাতে ডাইভার্ট করা গেলে অর্থনীতির চাকা সচল থাকবে।
হরমুজ প্রণালির অস্থিরতা আমাদের শিখিয়ে দিচ্ছে যে, ভূ-রাজনীতি এবং জ্বালানি নিরাপত্তা একে অপরের পরিপূরক। বিশ্ববাজারের অনিশ্চয়তা সামাল দিতে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধি এবং আমদানির বিকল্প উৎস খোঁজার কোনো বিকল্প নেই। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে দেশের শিল্পায়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা সম্ভব। সরকারের দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে দক্ষ জনবল তৈরি এবং প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানো প্রয়োজন। বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলোকে সুযোগে রূপান্তর করে একটি মজবুত জ্বালানি কাঠামো গড়ে তোলাই হবে আগামীর লক্ষ্য।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা যেকোনো দেশের জন্য একটি সংবেদনশীল ইস্যু। হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথের স্থিতিশীলতা যেমন কাম্য, তেমনি যেকোনো পরিস্থিতির জন্য আগাম প্রস্তুতি রাখাও বিচক্ষণতার পরিচয়। বাংলাদেশ বর্তমানে যে উন্নয়ন যাত্রায় রয়েছে, তার মূল চালিকাশক্তি হলো জ্বালানি। তাই এই খাতের চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি আরও দৃঢ় হবে। সমন্বিত পরিকল্পনা, বৈচিত্র্যময় আমদানি উৎস এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমেই বাংলাদেশ তার জ্বালানি নিরাপত্তার লক্ষ্য অর্জন করতে সক্ষম হবে।
লেখক: মো. সালমান সাদেকীন চয়ন, সহকারী পরিচালক, তথ্য ও প্রকাশনা, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)
রাজনীতির দাবার চালে পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বার ‘হরমুজ প্রণালি’ এখন কেবল একটি ভৌগোলিক রেখা নয়, বরং এটি বিশ্ব অর্থনীতির স্পন্দন। ওমান ও ইরানের মধ্যবর্তী মাত্র ২১ মাইল প্রশস্ত এই সরু জলপথটি দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ২০ শতাংশেরও বেশি পরিবাহিত হয়। ২০২৬ সালের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই অঞ্চলে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা বাংলাদেশের মতো ক্রমবর্ধমান জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এক নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা খনিজ তেল ও এলএনজির ওপর নির্ভরশীল, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই জলপথ দিয়ে দেশে পৌঁছায়।
বর্তমানে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের একটি বড় অংশ আমদানি করা এলএনজি এবং খনিজ তেলের ওপর নির্ভরশীল। দেশের শিল্পায়ন ও ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি বজায় রাখতে সরকার যে পরিমাণ জ্বালানি আমদানির পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, তার প্রধান উৎস হিসেবে কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
২০২৬ সালের বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের এলএনজি আমদানির একটি বড় অংশ আসে কাতার ও ওমান থেকে। একইভাবে ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলের সরবরাহ চেইন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত। হরমুজ প্রণালীতে চলাচলের ওপর কোনো ধরণের ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বা কারিগরি বিঘ্ন ঘটলে সরবরাহ ব্যবস্থা যাতে নিরবচ্ছিন্ন থাকে, সেটি নিশ্চিত করা এখন জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয়।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যের ওঠানামা সরাসরি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলে। হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ ও ট্যাঙ্কারের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়লে বিশ্ববাজারে বীমা খরচ এবং পরিবহন ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যায়। বাংলাদেশের জন্য এটি একটি কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। একদিকে উচ্চমূল্যে জ্বালানি ক্রয়ের ফলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর এক ধরণের চাপ সৃষ্টি হয়, অন্যদিকে সরবরাহে বিলম্ব ঘটলে উৎপাদনশীল খাতে তার প্রভাব অনুভূত হয়। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের মতো রপ্তানিমুখী শিল্প এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য। বর্তমান প্রেক্ষাপটে জ্বালানি সরবরাহ চেইনকে বৈচিত্র্যময় করার প্রয়োজনীয়তা আগের চেয়ে অনেক বেশি অনুভূত হচ্ছে।
বাংলাদেশের বর্তমান জ্বালানি ব্যবহারের চিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, দেশীয় খনিগুলো থেকে প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আমদানির ওপর নির্ভরতা একটি বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। দেশের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে সরকার দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির পাশাপাশি স্পট মার্কেট থেকেও জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে হরমুজ প্রণালীর অস্থিরতা নির্দেশ করে যে, একক কোনো ভৌগোলিক অঞ্চলের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা কমিয়ে বিকল্প উৎসের সন্ধান করা প্রয়োজন। বর্তমান সময়ে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটের কারণে মুদ্রাস্ফীতির যে ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে, তা মোকাবিলায় সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি নিশ্চিত করা সরকারের জন্য একটি বড় লক্ষ্য। শিল্প ও কৃষি খাতে জ্বালানির যোগান নিরবচ্ছিন্ন রাখতে কার্যকর ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের জন্য এখন বহুমুখী কৌশল অবলম্বন করা প্রয়োজন। প্রথমত, জ্বালানি আমদানির উৎসে বৈচিত্র্য আনা একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি অন্যান্য বিভিন্ন দেশ থেকে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিতে জ্বালানি সংগ্রহের সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে। এতে করে কোনো একটি নির্দিষ্ট জলপথে সমস্যা তৈরি হলেও বিকল্প পথ বা উৎস থেকে জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখা সম্ভব হবে।
দ্বিতীয়ত, আঞ্চলিক জ্বালানি সহযোগিতাকে আরও সুসংহত করা প্রয়োজন। প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহ বৃদ্ধি এবং জলবিদ্যুৎ আমদানির মতো প্রকল্পগুলো জ্বালানি নিরাপত্তা বলয়কে আরও শক্তিশালী করবে।
দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সম্পদ অনুসন্ধানে গতিশীলতা আনা এখন অপরিহার্য। বাংলাদেশের নিজস্ব ভূখণ্ডে এবং বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। সাশ্রয়ী এবং টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থার জন্য স্থলভাগের পুরোনো কূপগুলো থেকে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন নতুন খনি আবিষ্কারে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি যেমন সৌরশক্তি, বায়ুবিদ্যুৎ এবং বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের হার বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। এটি আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই একটি জ্বালানি কাঠামো তৈরিতে সহায়তা করবে।
জ্বালানি সংরক্ষণের ক্ষমতা বা মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধি করাও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংকটকালীন জাতীয় চাহিদা মেটানোর জন্য দেশজুড়ে স্টোরেজ টার্মিনালগুলোর সক্ষমতা পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হচ্ছে। নতুন নতুন অয়েল রিফাইনারি স্থাপন এবং এলএনজি টার্মিনালের সংখ্যা বৃদ্ধি করার মাধ্যমে জ্বালানি মজুতের একটি শক্তিশালী পরিকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে কোনো অস্থিরতা তৈরি হলেও সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় কোনো বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা কমে আসবে। এ ছাড়া সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বয়ে জ্বালানি মজুত ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও ডিজিটাল তদারকির আওতায় আনা হচ্ছে।
জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে মিতব্যয়ী হওয়া এবং অপচয় রোধ করা এখন একটি জাতীয় কর্তব্য হিসেবে দেখা দিচ্ছে। শিল্প কারখানা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে জ্বালানি ব্যবহারে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। ‘এনার্জি এফিসিয়েন্সি’ বা শক্তি সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতির ব্যবহার উৎসাহিত করার মাধ্যমে সামগ্রিক চাহিদা কিছুটা কমিয়ে আনা সম্ভব। লোড ডেসপাচ সেন্টারের আধুনিকায়ন এবং গ্রিড লাইনের সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সিস্টেম লস কমিয়ে আনলে উৎপাদিত জ্বালানির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হবে। অপ্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে জ্বালানি ও বিদ্যুতের ব্যবহার কমিয়ে এনে তা উৎপাদনশীল খাতে ডাইভার্ট করা গেলে অর্থনীতির চাকা সচল থাকবে।
হরমুজ প্রণালির অস্থিরতা আমাদের শিখিয়ে দিচ্ছে যে, ভূ-রাজনীতি এবং জ্বালানি নিরাপত্তা একে অপরের পরিপূরক। বিশ্ববাজারের অনিশ্চয়তা সামাল দিতে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধি এবং আমদানির বিকল্প উৎস খোঁজার কোনো বিকল্প নেই। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে দেশের শিল্পায়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা সম্ভব। সরকারের দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে দক্ষ জনবল তৈরি এবং প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানো প্রয়োজন। বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলোকে সুযোগে রূপান্তর করে একটি মজবুত জ্বালানি কাঠামো গড়ে তোলাই হবে আগামীর লক্ষ্য।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা যেকোনো দেশের জন্য একটি সংবেদনশীল ইস্যু। হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথের স্থিতিশীলতা যেমন কাম্য, তেমনি যেকোনো পরিস্থিতির জন্য আগাম প্রস্তুতি রাখাও বিচক্ষণতার পরিচয়। বাংলাদেশ বর্তমানে যে উন্নয়ন যাত্রায় রয়েছে, তার মূল চালিকাশক্তি হলো জ্বালানি। তাই এই খাতের চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি আরও দৃঢ় হবে। সমন্বিত পরিকল্পনা, বৈচিত্র্যময় আমদানি উৎস এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমেই বাংলাদেশ তার জ্বালানি নিরাপত্তার লক্ষ্য অর্জন করতে সক্ষম হবে।
লেখক: মো. সালমান সাদেকীন চয়ন, সহকারী পরিচালক, তথ্য ও প্রকাশনা, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)







