জ্বালানি তেলের সংকট দ্রুত কাটছে না, বাড়ছে উদ্বেগ – Rupantor Television

জ্বালানি তেলের সংকট দ্রুত কাটছে না, বাড়ছে উদ্বেগ

পাকিস্তানের ইসলামাবাদে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ বন্ধের বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পর নতুন করে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বেড়েছে। বিশেষ করে যুদ্ধবিরতির পর হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হতে পারে এমন খবরে যে স্বস্তি তৈরি হয়েছিল সেটা আবারও এক ধরনের শঙ্কায় রূপ নিয়েছে। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের সরবরাহব্যবস্থায় যে শঙ্কা, সেখানে বাংলাদেশও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যুদ্ধ বন্ধের অনিশ্চয়তা এবং বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের ঊর্ধ্বমুখিতার কারণে বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের জোগান ও সরবরাহব্যবস্থা আরও নাজুক হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পেট্রলপাম্পগুলোতে লাইন ছোট হওয়ার পরিবর্তে আরও বড় হচ্ছে।

তবে সরকার বলছে, জ্বালানি তেলের সংকট নেই। মানুষ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কিনছে। ফলে সংকট হচ্ছে। কার্যত আমদানি ও সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে সরকারের পক্ষ থেকে জ¦ালানি তেল বিক্রিতে অলিখিত রেশনিং চলছে। শুধু গণপরিবহনের নয়, বিভিন্ন শিল্পকারখানায়ও পর্যাপ্ত জ¦ালানি তেল সরবরাহ করা হচ্ছে না। ফলে শিল্প মালিকদের মধ্যেও শিল্পকারখানা চালু রাখা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

গাজীপুর অঞ্চলের একাধিক শিল্প মালিক আমাদের সময়কে বলেন, তারা নিয়মিত বিভিন্ন ডিলারের মাধ্যমে জ্বালানি তেল সংগ্রহ করতেন। কোনো কোনো কারখানায় মাসে ৯ হাজার লিটারের তিন-চার গাড়ি ডিজেল প্রয়োজন হতো। এখন ডিলাররা জ্বালানি তেল দিতে পারছে না ঠিকমতো। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দাম বেশি দাবি করছে। তবে বেশি দাম দিয়েও প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল সংগ্রহ করতে পারছে না।

বিষয়টি নিয়ে নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আমাদের সময়কে বলেন, বিভিন্ন শিল্প মালিক আগে তাদের প্রয়োজনীয় জ¦ালানি তেল তেলের ডিপো বা অনেক ডিলারের কাছ থেকে সংগ্রহ করে নিতেন। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে স্বাভাবিক তেল সংগ্রহ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। অনেক শিল্প মালিক ঠিকমতো জ¦ালানি তেল সংগ্রহ করতে পারছে না। বিষয়টি নিয়ে আমি জ¦ালানিমন্ত্রী, বিপিসির চেয়ারম্যান এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করেছি। তারা নিশ্চিত করছেন যাতে শিল্পকারখানাগুলোতে প্রয়োজনীয় জ¦ালানি তেল সরবরাহ করা হয়। তবে বাস্তবতা হলো বিভিন্ন জেলাপর্যায়ে ডিপোগুলো থেকে শিল্প মালিকরা তাদের চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত জ¦ালানি তেল পাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে চাহিদার অর্ধেক বা কিছুটা কমিয়ে সরবরাহ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, যে কোনোভাবেই হোক শিল্পকারখানার প্রয়োজনীয় জ¦ালানি তেলের জোগান নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলেও দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বিষয়টি নিয়ে জ¦ালানি মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, সত্যিকার অর্থে বিশ্বব্যাপী এখন জ্বালানি তেলের জোগান নিয়ে এক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশের অনিশ্চয়তা একটু বেশি। তিনি বলেন, যদিও সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে জ¦ালানির জোগান ও সরবরাহ নিশ্চিত রাখতে। তবে আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে তেলের মজুদ করার যে অদমনীয় প্রবণতা এটা হতাশাজনক। ফলে সরকার বাধ্য হয়েছে জ¦ালানি তেলের বরাদ্দ বা সরবরাহের ক্ষেত্রে কিছু বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে। বিশেষ করে যে কোনো বড় গ্রাহকের গত বছরের বরাদ্দ বিবেচনায় চলতি বছর সরবরাহ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, শিল্পকারখানায় তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করতে বারবার বলা হয়েছে। তবু অনেক জায়গায় অভিযোগ থাকবে= এটাও আমরা মানছি। কারণ জেলা প্রশাসকদের জ¦ালানি তেল সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনায় কঠোর হতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফলে কোথাও কোথাও সংকট সৃষ্টি হতে পারে।

এদিকে জ¦ালানি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গতকাল জ্বালানি বিভাগ বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এবং তিনটি তেল বিপণনকারী কোম্পানি- পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার সঙ্গে বৈঠক করেছে। সেখানে জ¦ালানি তেল সরবরাহ পরিস্থিতিতে তেল বরাদ্দের ক্ষেত্রে কঠোর হতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বৈঠকে উপস্থিত এক কর্মকর্তা আমাদের সময়কে বলেন, জ্বালানি তেল আমদানি ও সরবরাহে সংকট রয়েছে। তবে সরকার যে প্রক্রিয়ায় আমদানি করে সরবরাহ চালিয়ে রাখার চেষ্টা করছে, সেখানে যদি গণহারে মজুদ করার চেষ্টা রুখে দেওয়া না যায় তবে যত তেলই আমদানি বা সরবরাহ করা হোক না কেন, সংকট বড় হয়ে দেখা দেবে। ফলে তেল বরাদ্দের ক্ষেত্রে সবক্ষেত্রে কঠোর হওয়ার বার্তা দেওয়া হয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে ইরানযুদ্ধের আলোচনা ভেস্তে যাওয়ায় জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন সামনে কঠিন পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে। বিষয়টি নিয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, যে কোনো যুদ্ধেই বাংলাদেশে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ইরানযুদ্ধের কারণে সেটা ক্রমান্বয়ে খারাপ দিকে যাচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা দেখতে পাচ্ছি, ডলারের দামটা ওঠানামা করছে। আগামীতে বেশি বোঝা যাবে দুটি জিনিসে; আমাদের রেমিট্যান্সে কতটুকু প্রভাব ফেলেছে এবং রপ্তানিতে কতটুকু প্রভাব পড়েছে। এটার হিসাব পেলে পুরো পরিস্থিতি বোঝা যাবে। তিনি বলেন, এ যুদ্ধে জ¦ালানি তেলের স্বাভাবিক প্রবাহ ছাড়াও নানা ক্ষেত্রে প্রভাব পড়ছে। আমাদের রেমিট্যান্স, জনশক্তি রপ্তানি, শিল্পকারখানার উৎপাদন, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া নানা দিক।

ম. তামিম বলেন, আপাতত জ্বালানিতে সরকার ভর্তুকি দিয়ে চালাচ্ছে। যুদ্ধ বন্ধে আলোচনা হলেও সেটা এখনও সমাধান হয়নি। এ যুদ্ধ কবে থামবে সেই নিশ্চয়তা নাই। এ ছাড়া যুদ্ধ থামলেও খুব দ্রুত সেই ৮০ ডলার বা ৭০ ডলারে তেলের দাম ফেরত যাচ্ছে না। তেলের দাম ১০০ ডলারই থাকবে। তিনি বলেন, আমাদের মতো আমদানিনির্ভর দেশ যুদ্ধের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যুদ্ধ বেশি দিন চলা মানে আমাদের উদ্বেগ বাড়বে।

জানা গেছে, ইতোমধ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উড়োজাহাজ চলাচলে ব্যবহৃত জেট এ-১ (এভিয়েশন ফুয়েল) জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গেছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এপ্রিল মাসে অভ্যন্তরীণ রুটের ফ্লাইটে লিটারে ২২৭ টাকা ৮ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসের তুলনায় যা প্রায় দ্বিগুণের বেশি। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনাকারী দেশি ও বিদেশি এয়ারলাইন্সের জন্য শুল্ক ও মূসকমুক্ত জেট এ-১ জ্বালানির মূল্য প্রতি লিটার ১ দশমিক ৪৮০৬ মার্কিন ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে।

এদিকে গতকাল আবার ফার্নেস অয়েলের (এইচএফও) দাম বাড়িয়েছে বাংলাদেশ জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিইআরসি)। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতি লিটার ফার্নেস অয়েলের দাম ৭০ টাকা ১০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৯৪ টাকা ৬৯ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ লিটারে দাম বেড়েছে ২৪ টাকা ৫৯ পয়সা।

এ ছাড়া চলতি এপ্রিল মাসে গ্রাহকপর্যায়ে প্রায় সব ধরনের এলপিজির দাম বেড়েছে। ভোক্তাপর্যায়ে বেসরকারি খাতের তরলিকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম এপ্রিলে প্রতি কেজিতে বেড়েছে ৩২ টাকা ৩০ পয়সা। ফলে বাজারে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের নতুন দাম হয়েছে এক হাজার ৭২৮ টাকা। গত মাসে দাম ছিল এক হাজার ৩৪১ টাকা। এক মাসের ব্যবধানে এক লাফে ১২ কেজিতে দাম বেড়েছে ৩৮৭ টাকা।

অর্থাৎ যুদ্ধের প্রভাব অব্যাহতভাবে বাড়ছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ছে অর্থনীতিতে। দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাচ্ছে, পরিবহনের দাম বেড়ে যাচ্ছে; একই সঙ্গে অন্যান্য জ¦ালানি তেলের দাম বাড়ার আশাঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া বাড়তে পারে বিদ্যুতের দামও।

  • Related Posts

    নববর্ষ উদযাপনে কোনো হুমকি নেই : র‍্যাব ডিজি

    বাংলা নববর্ষ-১৪৩৩ উৎসব উদযাপনে কোনো ধরনের হুমকি নেই বলে জানিয়েছেন র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) এর মহাপরিচালক (অতিরিক্ত আইজিপি) মো. আহসান হাবীব পলাশ। সোমবার (১৩ এপ্রিল) সকালে রাজধানীর রমনার বটমূলে র‍্যাবের…

    আজ যে দামে বিক্রি হচ্ছে স্বর্ণ

    দেশের বাজারে স্বর্ণের দামে সাম্প্রতিক সময়ে বড় ধরনের সমন্বয় এসেছে। বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) দাম কমানোর পর আজ সোমবার পর্যন্ত সেই কম দামে স্বর্ণ বিক্রি হচ্ছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) এক…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *