প্রকৃত বিজয় তখন যখন যুদ্ধ থামবে স্বস্তি আসবে – Rupantor Television

প্রকৃত বিজয় তখন যখন যুদ্ধ থামবে স্বস্তি আসবে

ড. ইমতিয়াজ আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি, যুদ্ধবিরতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, মানবিক সংকট ও বাংলাদেশের সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেছেন আমাদের সময়ের সঙ্গে। সাক্ষাৎকারে রণজিৎ সরকার

আমাদের সময় : মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত কি কেবল একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ, নাকি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক সংঘাতের অংশ?

ইমতিয়াজ আহমেদ : এ সংঘাতকে একমাত্রিকভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে না। এটি একই সঙ্গে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক। যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু মধ্যপ্রাচ্য হলেও এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে পুরো বিশ্বে। কারণ এ অঞ্চলটি শুধু রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও অত্যন্ত সংবেদনশীল। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বব্যাপী বিপুল পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহ হয়, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইরানকে কেন্দ্র করে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক সম্পৃক্ততা, তা এ সংঘাতকে আরও জটিল করেছে। বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি থাকা এবং সেগুলো লক্ষ্যবস্তু হওয়া এই সংকটকে একটি বৃহত্তর শক্তির সংঘাতে রূপ দিয়েছে। ফলে এটি আর শুধু একটি আঞ্চলিক দ্বন্দ্ব নয়; বরং একটি বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন।

আমাদের সময় : সাম্প্রতিক ঘোষিত দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিকে আপনি কতটা বাস্তবসম্মত ও কার্যকর মনে করেন? এটি কি কৌশলগত বিরতি, নাকি শান্তির দিকে একটি সত্যিকারের পদক্ষেপ?

ইমতিয়াজ আহমেদ : এই যুদ্ধবিরতি কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করছে অনেকগুলো ভেরিয়েবলের ওপর। শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের একটি ধারণা ছিলÑ ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে দুর্বল করা গেলে ভেতরে রাজনৈতিক বিভাজন তৈরি হবে এবং একটি রেজিম পরিবর্তনের পথ তৈরি হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, তার উল্টোটা ঘটেছে।

ইরানের অভ্যন্তরে একটি জাতীয় ঐক্য তৈরি হয়েছে, যা বাইরের চাপকে প্রতিরোধ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এমনকি প্রবাসী ইরানিদের মধ্যেও এই যুদ্ধের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলার পর আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচনা বেড়েছে। এই অবস্থায় যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক খরচ অনেক বেড়ে যাবেÑ এটি উপলব্ধি করেই মূলত যুদ্ধবিরতির দিকে যাওয়া হয়েছে। তাই এটিকে আংশিকভাবে কৌশলগত বিরতি বলা যায়, তবে এটি শান্তির সম্ভাবনাও তৈরি করছেÑ যদি তা সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়।

আমাদের সময় : ঘোষিত যুদ্ধবিরতির পরও অনিশ্চয়তা কাটছে না; ইতোমধ্যেই ইসরায়েলের হামলায় লেবাননে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ এবং ২৫৪ জন নিহত ও বহু হতাহতের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে – যুদ্ধবিরতি কতটা কার্যকর ও টেকসই? এরপর আবার পূর্ণমাত্রার সংঘাত শুরু হওয়ার ঝুঁকি কতটা রয়েছে এবং এই উত্তেজনা কি শেষ পর্যন্ত বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে?

ইমতিয়াজ আহমেদ : যুদ্ধবিরতির টেকসই হওয়া নির্ভর করছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর। প্রথমত, ইরানের অভ্যন্তরীণ ঐক্য কতটা বজায় থাকে এবং তারা তাদের সামরিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কতটা কার্যকরভাবে ধরে রাখতে পারে। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা। এই যুদ্ধের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক জনসমর্থন ছিল না। এমনকি রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপরও চাপ তৈরি হয়েছিল। সামরিক ব্যর্থতা, অর্থনৈতিক ব্যয় এবং অভ্যন্তরীণ সমালোচনাÑ সব মিলিয়ে তারা একটি চাপের মধ্যে ছিল। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘মিলিটারি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স’Ñ যারা যুদ্ধ থেকে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়। তাদের স্বার্থ অনেক সময় যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করতে পারে। ফলে যুদ্ধবিরতি ভেঙে আবার সংঘাত শুরু হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।

এ ছাড়া সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোÑ যেমন লেবাননে হামলা প্রমাণ করে যে উত্তেজনা এখনও পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি। তাই এটি একটি অনিশ্চিত পরিস্থিতি।

আমাদের সময় : পাকিস্তানে সম্ভাব্য আলোচনার উদ্যোগকে আপনি কীভাবে দেখছেন? পাকিস্তান কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে?

ইমতিয়াজ আহমেদ : পাকিস্তান এই প্রেক্ষাপটে একটি কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের সামরিক সম্পর্ক রয়েছে, আবার ইরানের সঙ্গে তাদের ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগও আছে। একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক পাকিস্তানকে একটি বহুমাত্রিক কূটনৈতিক অবস্থানে নিয়ে গেছে। এই তিনটি শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক থাকার কারণে পাকিস্তান এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে পারে, যেখানে বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের স্বার্থের কথা বলতে পারে। ইতিহাসেও দেখা গেছে, পাকিস্তান অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করেছে।

অন্যদিকে, ভারতের মতো দেশ এই মুহূর্তে নিরপেক্ষতা ধরে রাখতে পারেনি, ফলে সেই সুযোগ পাকিস্তান পেয়েছে। তাই এই আলোচনায় পাকিস্তানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আমাদের সময় : আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর ভূমিকা কতটা প্রভাব ফেলেছে?

ইমতিয়াজ আহমেদ : আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপীয় দেশগুলো শুরু থেকেই এই সংঘাত নিয়ে দ্বিধায় ছিল এবং সরাসরি সম্পৃক্ত হতে চায়নি, বরং তারা যুদ্ধবিরতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশও অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণে এই যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য চাপ সৃষ্টি করেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র এক ধরনের কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতায় পড়ে যায়। তবে ইসরায়েলের অবস্থান আলাদা। তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং নেতৃত্বের স্বার্থ অনেক সময় এই ধরনের যুদ্ধবিরতিকে দুর্বল করে দিতে পারে। তাই আন্তর্জাতিক চাপ থাকলেও সেটি কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করছে বাস্তব প্রয়োগের ওপর।

  • Related Posts

    নববর্ষ উদযাপনে কোনো হুমকি নেই : র‍্যাব ডিজি

    বাংলা নববর্ষ-১৪৩৩ উৎসব উদযাপনে কোনো ধরনের হুমকি নেই বলে জানিয়েছেন র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) এর মহাপরিচালক (অতিরিক্ত আইজিপি) মো. আহসান হাবীব পলাশ। সোমবার (১৩ এপ্রিল) সকালে রাজধানীর রমনার বটমূলে র‍্যাবের…

    আজ যে দামে বিক্রি হচ্ছে স্বর্ণ

    দেশের বাজারে স্বর্ণের দামে সাম্প্রতিক সময়ে বড় ধরনের সমন্বয় এসেছে। বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) দাম কমানোর পর আজ সোমবার পর্যন্ত সেই কম দামে স্বর্ণ বিক্রি হচ্ছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) এক…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *