জোর কদমে স্থানীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি জামায়াত-এনসিপির – Rupantor Television

জোর কদমে স্থানীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি জামায়াত-এনসিপির

ঈদুল ফিতরকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে নতুন মাত্রার তৎপরতা। উৎসবের আবহকে কাজে লাগিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে জনসংযোগ বাড়াতে মাঠে নেমেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। ঘরে ঘরে শুভেচ্ছা পৌঁছে দেওয়া, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং স্থানীয় সমস্যার খোঁজখবর নেওয়ার মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনের কৌশল নিয়েছে দল দুটি। কেন্দ্রীয় নির্দেশনায় নেতাকর্মীদের সক্রিয় উপস্থিতি নিশ্চিত করার পাশাপাশি সম্ভাব্য প্রার্থীরাও নিজ নিজ এলাকায় স্থানীয় নির্বাচনের আগাম প্রচার চালাচ্ছেন।

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে এই তৎপরতা কেবল উৎসবকেন্দ্রিক নয়; বরং স্থানীয় নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ। ঈদকে উপলক্ষ করে তৈরি হওয়া সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ কাজে লাগিয়ে ভোটারদের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করা, সাংগঠনিক কাঠামো আরও সক্রিয় করা এবং সম্ভাব্য ভোটব্যাংক সুসংহত করার দিকে নজর দিচ্ছে দুই দলই। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঈদভিত্তিক এই জনসম্পৃক্ততা তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেললেও এর প্রকৃত ফল নির্ভর করবে পরবর্তী সময়েও একই ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ওপর।

বিরোধীদলীয় জোটের একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রথম ঈদে আনুষ্ঠানিকতা বা শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে নেতাকর্মীদের জন্য নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে। এমপি, কেন্দ্রীয় নেতা থেকে শুরু করে স্থানীয় নেতাকর্মীদের নিজ নিজ এলাকায় সক্রিয় উপস্থিতি নিশ্চিত করতেই

শুধু বলা হয়নি, বরং ঘরে ঘরে গিয়ে ঈদের শুভেচ্ছা পৌঁছে দেওয়া, অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং স্থানীয় সমস্যা সম্পর্কে সরাসরি খোঁজখবর নেওয়ার মাধ্যমে জনআস্থা অর্জনের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। কোনো ধরনের শৈথিল্য গ্রহণ করা হবে না বলে দলের একাধিক নেতা প্রতিবেদকের কাছে জানান।

জামায়াতের একাধিক সূত্রে জানা যায়, ঈদের দিন জামায়াতের এমপিরা নিজ নিজ এলাকায় কাটাবেন, তারা ঈদ উৎসবে যোগদানের পাশাপাশি সরকারি বরাদ্দ করা ১০ লাখ টাকা ছাড়াও নিজেদের থেকে দুস্থদের মধ্যে জাকাত ও ফিতরা বিতরণ করবেন। সামাজিক-রাজনৈতিক-ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে ঈদ কার্ড, এসএমএস পাঠিয়ে এবং সোশ্যাল মিডিয়া ও ব্যানার-পোস্টারের মাধ্যমে স্থানীয় নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থীরা গণসংযোগ করার অলিখিত নির্দেশনা পেয়েছেন কেন্দ্র থেকে। স্থানীয় প্রার্থী যারা হবেন, তারা ইতোমধ্যে ঈদ বকশিশের নামে এলাকায় অসহায়দের মাঝে নগদ টাকা বিতরণ করছেন। নেতাকর্মীর পাশাপাশি সাধারণ ভোটারদের জন্য ঈদের দিন ভোজের আয়োজনও করেছেন অনেক স্থানীয় নেতা (প্রার্থী)।

এদিকে এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া আমাদের সময়কে বলেন, ঈদ শুধু আনন্দের উৎসব নয়, এটি মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার একটি বড় সুযোগ। তিনি বলেন, দলের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সমাজের ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবাই যেন ঈদের আনন্দে শামিল হতে পারে, সেজন্য নেতাকর্মীদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। একই সঙ্গে নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে এনসিপির প্রতি মানুষের যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে, সেটিকে কাজে লাগিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর অধিকতর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, দেশবাসী এখন বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি খুঁজছে। এই বাস্তবতায় দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জনমতকে সংগঠিত করে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ভিত্তিতে রূপান্তর করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তার মতে, ঈদকেন্দ্রিক এই জনসংযোগ কার্যক্রম ভবিষ্যতে দলের সাংগঠনিক বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এ সময় তিনি নিজের দলের প্রধানের ঈদ উপলক্ষে দরিদ্র মানুষের জন্য বরাদ্দ অর্থ বিতরণের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বার্তা দিয়ে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, আমাদের দলে ছয়জন সংসদ সদস্যের প্রত্যেককে দেওয়া ১০ লাখ টাকার একটি টাকাও ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার করা হবে না; পুরো অর্থই প্রকৃত উপকারভোগীদের মাঝে ঈদে বিতরণ করা হবে। এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের ঢাকা-১১ আসনে ইতোমধ্যে ৫০০ দরিদ্র ব্যক্তির তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে এবং প্রত্যেককে ২ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।

অন্যদিকে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক আবদুল হালিম আমাদের সময়কে বলেন, জামায়াত একটি সুশৃঙ্খল ও নীতিনিষ্ঠ দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে চায়। আমাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকলেও তা সুস্থ ও সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। দলীয় মনোনয়ন সব সময় ঐকমত্যের ভিত্তিতেই দেওয়া হয়। স্থানীয় নির্বাচনেও তার ব্যতিক্রম হবে না। আমাদের দলের এমপি ও স্থানীয় নেতাদের সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, প্রত্যেকেই যেন ঈদে নিজেদের সাধ্যমতো সাধারণ মানুষের সহায়তা করেই ক্ষ্যান্ত না হয়ে ঘরে ঘরে গিয়ে শুভেচ্ছা পৌঁছে দেয়। দলের জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে কাজ করতে হবে। তিনি আরও যোগ করেন, আমরা দল হিসেবে চাই, ঈদ যেন শুধু ব্যক্তিগত আনন্দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং এটি হোক সামাজিক সংহতির একটি মাধ্যম। তিনি বলেন, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দলের প্রতি মানুষের আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে, যা স্থানীয় নির্বাচনে ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে সহায়ক হবে।

এদিকে দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক চাপে থাকা জামায়াত ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে বেশ ভালো ফল অর্জন করেছে তাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে। একে কাজে লাগাতে তৃণমূল পর্যায়ে নিজেদের সংগঠিত করতে এবারের ঈদে ব্যাপক জোর দিচ্ছে। ঈদের মতো সামাজিক উৎসবকে কেন্দ্র করে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর এই উদ্যোগ তাদের জন্য একটি পুনর্গঠনের সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক সারোয়ার জাহান আমাদের সময়কে বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ঈদ বরাবরই জনসংযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষে। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের পর এবারই প্রথম ঈদ। নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ, ভোটারদের মনোভাবের পরিবর্তন এবং স্থানীয় নির্বাচন সামনে রেখে দলগুলো আরও পরিকল্পিতভাবে এই সময়কে কাজে লাগানোর চেষ্টা করবে। বিশেষ করে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন এনসিপির মতো নতুন দলের জন্য এটি একটি বড় পরীক্ষা, তারা কত দ্রুত তৃণমূল পর্যায়ে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে পারে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তার মতে, শুধু ঈদকেন্দ্রিক তৎপরতা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সাফল্য অর্জন সম্ভব নয়। তবে এটি একটি কার্যকর সূচনা হতে পারে। যদি দলগুলো পরবর্তী সময়ে একই ধারাবাহিকতা বজায় রাখাসহ নিয়মিত জনসংযোগ, স্থানীয় সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখতে পারে এবং সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী করতে পারে তবেই রাজনৈতিক ভিত্তি মজবুত হবে।

  • Related Posts

    আবার ফ্যাসিবাদ কায়েমের ইঙ্গিত দিচ্ছে সরকার : বিরোধীদলীয় নেতা

    বিরোধী দল যতদিন সংসদে লড়াই করতে পারবে, ততদিন সংসদে থাকবে। এর বাইরে এক সেকেন্ডও থাকবে না বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।…

    এবার নারী আসনে বিএনপির এমপি হতে চান মেঘনা আলম

    ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মেঘনা আলম গণ অধিকার পরিষদের প্রার্থীহয়ে ঢাকা-৮ আসনে ভোটের লড়াইয়ে নেমেছিলেন। ৬০৮ ভোট পেয়ে জামানত হারানো আালোচিত এই মডেল এবার সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *