জিরো টলারেন্সে এসএসসি পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা – Rupantor Television

জিরো টলারেন্সে এসএসসি পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা

আসন্ন মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমান পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে এবার নজিরবিহীন কঠোরতায় এগোচ্ছে শিক্ষা প্রশাসন। নকল ও অনিয়ম ঠেকাতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড ৩১ দফা নির্দেশনা জারি করেছে। একই সঙ্গে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত নির্দেশনা দিয়েছে।

আগামী ২১ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এ পরীক্ষাকে ঘিরে এরই মধ্যে সারাদেশের কেন্দ্রগুলোতে প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে। শিক্ষা-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবার শুধু নিয়ম জারি নয়, বাস্তবায়নেই থাকবে সর্বোচ্চ কঠোরতা।

প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারিতে পরীক্ষা কেন্দ্র : মাউশির নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিটি পরীক্ষা কেন্দ্র ও কক্ষে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং তা সচল রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ক্যামেরায় ধারণকৃত ভিডিও সংরক্ষণ করে প্রয়োজনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে সরবরাহ করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে মাউশির মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক বিএম আব্দুল হান্নান বলেন, ‘আমরা চাই পরীক্ষা পুরোপুরি স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য হোক। কোনো ধরনের অনিয়ম বা নকলের সুযোগ রাখা হবে না। প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রতিটি কক্ষে দেয়ালঘড়ি, পর্যাপ্ত আলো-বাতাস এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আসনবিন্যাসে শৃঙ্খলা, প্রবেশে কঠোরতা : পরীক্ষার্থীদের মধ্যে দূরত্ব বজায় রাখতে বেঞ্চভিত্তিক আসনবিন্যাস নির্ধারণ করা হয়েছে। ৫-৬ ফুট বেঞ্চে দুজন এবং ৪ ফুট বেঞ্চে একজন বসবে। প্রতি ২০ জন পরীক্ষার্থীর জন্য একজন করে কক্ষ পরিদর্শক এবং প্রতিটি কক্ষে ন্যূনতম দুজন দায়িত্ব পালন করবেন।

পরীক্ষা শুরু হবে প্রতিদিন সকাল ১০টায়। পরীক্ষার্থীদের অন্তত ৩০ মিনিট আগে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে হবে। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে এলে বিশেষ বিবেচনায় রেজিস্টারে তথ্য সংরক্ষণ করে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হবে।

প্রশ্নপত্র নিরাপত্তায় বহুস্তরীয় ব্যবস্থা : প্রশ্নপত্র ব্যবস্থাপনায় আনা হয়েছে কঠোর নিয়ন্ত্রণ। সৃজনশীল (সিকিউ) ও বহুনির্বাচনী (এমসিকিউ) প্রশ্নপত্র আলাদা সিকিউরিটি খামে প্যাকেট করা হবে এবং নির্ধারিত সেট কোড নিশ্চিত করে তবেই তা খোলা যাবে।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর এসএম কামাল উদ্দিন হায়দার আমাদের সময়কে বলেন, ‘প্রশ্নপত্র ফাঁস বা গড়মিল ঠেকাতে এবার প্রতিটি ধাপে জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়েছে। কোনো ব্যত্যয় ঘটলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

নকল প্রতিরোধে কঠোর বার্তা : পরীক্ষাকেন্দ্রে কেন্দ্রসচিব ছাড়া অন্য কারও মোবাইল ফোন বা ইলেকট্রনিক ডিভাইস বহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পরীক্ষার্থীদের দেহ তল্লাশি করে কেন্দ্রে প্রবেশ করানো হবে, বিশেষ করে ছাত্রীদের ক্ষেত্রে নারী শিক্ষকের মাধ্যমে এ তল্লাশি সম্পন্ন করতে হবে।

এ ছাড়া কেন্দ্রের প্রবেশপথে সতর্কতামূলক পোস্টার টাঙানো, কেন্দ্রের বাইরে ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং পরীক্ষা শুরু হওয়ার পরপরই টয়লেট তল্লাশির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় সরকারের জিরো টলারেন্স প্রসঙ্গে শিক্ষাবিদ ড. সায়েদা নাসরিন বলেন, নকল প্রতিরোধ শুধু নিয়ম দিয়ে সম্ভব নয়, সচেতনতা ও কঠোর প্রয়োগ দুইই দরকার। পদক্ষেপগুলো ইতিবাচক। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান-প্রধানদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষা শুরুর অন্তত ১০ দিন আগে প্রবেশপত্র বিতরণ, ত্রুটি সংশোধন এবং পরীক্ষার সামগ্রী সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কেন্দ্রসচিব ও প্রতিষ্ঠান-প্রধানদের ওপর।

রাজধানীর একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, কেন্দ্র পরিচালনায় এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক থাকতে হচ্ছে। প্রতিটি ধাপেই জবাবদিহি বাড়ানো হয়েছে, যা পরীক্ষার মান উন্নয়নে সহায়ক হবে।

সিলেবাস ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা : বোর্ড জানিয়েছে, অনিয়মিত ও মানোন্নয়ন পরীক্ষার্থীরা ২০২৫ সালের সিলেবাস অনুযায়ী এবং নিয়মিত পরীক্ষার্থীরা ২০২৬ সালের সিলেবাস অনুযায়ী পরীক্ষায় অংশ নেবে। পরীক্ষা চলাকালে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছাড়া অন্য কেউ কেন্দ্রে অবস্থান করতে পারবেন না। প্রশ্নপত্র ও উত্তরপত্র পরিবহনে পুলিশের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হবে। পরীক্ষাকালীন বিদ্যালয়ে নিয়মিত ক্লাস বন্ধ থাকবে, তবে যেসব দিনে পরীক্ষা নেই সেসব দিনে শ্রেণিকক্ষ কার্যক্রম চালু রাখা যাবে।

সব মিলিয়ে, এসএসসি পরীক্ষা ঘিরে শিক্ষা বোর্ড ও মাউশির এ সমন্বিত উদ্যোগকে পরীক্ষার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করার একটি শক্ত বার্তা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। এবার পরীক্ষাকেন্দ্রগুলো শুধু পরীক্ষার স্থান নয় বরং শৃঙ্খলা, প্রযুক্তি ও কঠোর নজরদারির এক সমন্বিত কাঠামোয় রূপ নিচ্ছে।

  • Related Posts

    শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৩ দিন অনলাইন, ৩ দিন অফলাইনে ক্লাস: শিক্ষামন্ত্রী

    শিক্ষার্থীদের শনিবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এনে ক্লাস করাতে চায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সে ক্ষেত্রে রোববার অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চলবে। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন এ তথ্য জানিয়েছেন। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘শনি-সোম-বুধবার…

    শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে যে তথ্য দিলেন মন্ত্রী

    মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইন ক্লাসের বিষয়ে এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। আজ রোববার সচিবালয়ে…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *