‘সন্ধ্যার সময়টাই সিনেমা হলের পিকটাইম। কর্মজীবী মানুষ সাধারণত এই সময়েই পরিবার নিয়ে সিনেমা দেখতে আসেন। সরকারের নির্দেশনা আমরা মানছি, তবে সিনেমা হলগুলোর ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদা করে বিবেচনা করা হলে ভালো হতো। এটি শুধু ব্যবসায়িক ক্ষতিই নয়, চলচ্চিত্রশিল্পের জন্যও অশনিসংকেত।’ কথাগুলো বলেছেন লায়ন সিনেমাসের প্রতিষ্ঠাতা মির্জা আবদুল খালেক। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিপণিবিতান বন্ধ রাখার কারণে প্রথমে ব্লকবাস্টার সিনেমাস সন্ধ্যার পর শো বন্ধের ঘোষণা দেয়। এরপর পরিস্থিতি বিবেচনা করে একে একে একই পথে হাঁটে অন্যান্য মাল্টিপ্লেক্সও। সন্ধ্যার পর মাল্টিপ্লেক্সে শো বন্ধের সিদ্ধান্তে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে চলচ্চিত্র অঙ্গনে।
স্টার সিনেপ্লেক্সের মিডিয়া ও মার্কেটিং বিভাগের এজিএম মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ জানান, মার্কেট বন্ধ থাকলে দর্শক আসার সুযোগ কমে যায়। তাই পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত বিকাল পর্যন্তই শো চালানো হবে, সন্ধ্যার পরের সব প্রদর্শনী বন্ধ থাকবে। ব্লকবাস্টার সিনেমাসের সহকারী ব্যবস্থাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘অফিস শেষে দর্শকরা সাধারণত সন্ধ্যার পর পরিবার নিয়ে সিনেমা দেখতে আসেন। এই সময় শো বন্ধ থাকলে দর্শক হারানোর পাশাপাশি ব্যবসায় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। পরিস্থিতি বিবেচনায় সামনে নতুন করে প্রদর্শনীর সূচি সাজাতে হতে পারে।’ চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আশা, বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত সহানুভূতিশীল সিদ্ধান্ত নেবে। কারণ ঈদের এই জমজমাট সময়ে প্রদর্শনী সীমিত হয়ে গেলে শুধু একটি মৌসুম নয়, পুরো চলচ্চিত্রশিল্পের গতিই শ্লথ হয়ে পড়তে পারে।
এ পরিস্থিতিতে সরব হয়েছেন ঈদের সিনেমাগুলোর নির্মাতা ও প্রযোজকরা। এক যৌথ বিবৃতিতে তারা সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান জানালেও সিনেমা হল বন্ধ রাখার প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিবৃতিতে বলা হয়, সরকার সংকট মোকাবিলায় রাত ৭টার পর মার্কেট বন্ধ রাখার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা তারা সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করছেন। তবে এই সিদ্ধান্তের কারণে মার্কেটের ভেতরে থাকা সিনেমা হলগুলোও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, যা চলমান ঈদের সিনেমা এবং সামগ্রিক চলচ্চিত্রশিল্পের জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে। নির্মাতা-প্রযোজকদের মতে, ঈদের সিনেমার মূল দর্শক সমাগম ঘটে সন্ধ্যা ও রাতের শোগুলোতে, যা ‘প্রাইম টাইম’ হিসেবে বিবেচিত। দিনের কর্মব্যস্ততা শেষে অধিকাংশ দর্শক এই সময়েই পরিবারসহ প্রেক্ষাগৃহে আসেন। ফলে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে শো বন্ধ হয়ে গেলে বিপুলসংখ্যক দর্শক সিনেমা দেখা থেকে বঞ্চিত হবেন। তারা অতীতের দৃষ্টান্ত তুলে ধরে বলেন, আগে মার্কেট নির্দিষ্ট সময়ে বন্ধ হলেও সিনেমা হলগুলোকে সেই নিয়মের বাইরে রাখা হতো। রাত ১০টা বা শো শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রদর্শনী চালানোর অনুমতি থাকত এবং এতে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়নি। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে বর্তমান পরিস্থিতিতেও একই ব্যবস্থা বজায় রাখার দাবি জানান তারা।
অর্থনৈতিক দিকটিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে বিবৃতিতে তারা বলেন, ‘একটি সিনেমা নির্মাণের পেছনে প্রযোজকের কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ থাকে। উৎসবের এই কয়েকদিনেই সেই বিনিয়োগ তুলে আনার প্রধান সময়। পিক-আওয়ারে হল বন্ধ থাকলে লগ্নিকৃত অর্থ ফেরত পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় চলচ্চিত্রের জন্য খুবই খারাপ হবে।’ এ প্রেক্ষিতে তাদের প্রধান দাবি- সিনেমা হলকে সাধারণ দোকানের আওতামুক্ত রেখে, মার্কেট বন্ধ থাকলেও আগের মতো প্রদর্শনী চালু রাখার সুযোগ দেওয়া। তারা মনে করেন, এতে একদিকে দর্শকদের ঈদের আনন্দ পূর্ণতা পাবে, অন্যদিকে প্রযোজকরাও তাদের বিনিয়োগ ফেরত পাওয়ার সুযোগ পাবেন। বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ নির্মাতা তানিম নূর, প্রযোজক সাকিব আর খান, ‘রাক্ষস’ প্রযোজক শাহরিন আক্তার সুমি, ‘দম’-এর নির্মাতা রেদওয়ান রনি ও প্রযোজক শাহরিয়ার শাকিল, ‘প্রেশার কুকার’ নির্মাতা ও প্রযোজক রায়হান রাফী এবং ‘প্রিন্স’-এর প্রযোজক শিরিন সুলতানা।








