চীনের ছিনমিং উৎসব বা সমাধি পরিচ্ছন্নকরণ দিবস হচ্ছে পূর্বপুরুষদের স্মরণ ও শ্রদ্ধা জানানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী উৎসব। এবারের এই উৎসব উপলক্ষে চীনে মুক্তি পায় এআই নির্মিত শর্টফিল্ম ‘পেপার ফোন’। পারিবারিক ভালোবাসা ও স্মৃতির গল্পে নির্মিত এই সিনেমা ইতিমধ্যেই দর্শকের হৃদয় স্পর্শ করেছে, লাভ করেছে বিপুল জনপ্রিয়তা। প্রায় ৫ মিনিটের ফিল্মটি প্রকাশের কিছু সময়ের মধ্যেই ভিউ সংখ্যা ৪ কোটিরও বেশি ছাড়িয়ে যায়। মাত্র ৩ দিনে দুই তরুণ নির্মাতা এটি তৈরি করেছেন।
‘পেপার ফোন’র গল্প অত্যন্ত সরল হলেও আবেগে গভীর। একটি নিষ্পাপ ছোটছেলে তার সঞ্চয় করা ১৫ ইউয়ান হাতে নিয়ে একটি কাগজের দোকানে যায়। তার সদ্য প্রয়াত দাদির স্মৃতির উদ্দেশে পুড়িয়ে দেওয়ার জন্য সে একটি কাগজের মোবাইল ফোন কিনতে চায়। শিশুটি এখনও ‘মৃত্যু’ শব্দের প্রকৃত অর্থ বুঝতে পারেনি। সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে- ‘মৃত্যু কি দূরের কোথাও চলে যাওয়াকে বলে?’ তার ছোট্ট কল্পনার জগতে দাদি এমন এক দূরবর্তী স্থানে গেছেন, যেখানে কেউ পৌঁছাতে পারে না। তাই তার বিশ্বাস, একটি ছোট মোবাইল ফোন হয়তো সেই দূরত্বের ওপর একটি সেতু হয়ে উঠতে পারে।
এই সিনেমার নির্মাতা দুই তরুণ- লি থিং ও ইয়াং সুয়ান। একজন চিত্রনাট্য ও আবেগের সূক্ষ্মতা নির্মাণে কাজ করেছেন, অন্যজন স্টোরিবোর্ড ও ভিজ্যুয়াল টেক্সচার নিয়ন্ত্রণে মনোযোগ দিয়েছেন। দুজনেই চীনের ছাওশান অঞ্চলের মানুষ, যেখানে পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে কাগজের জিনিসপত্র তৈরি ও পোড়ানোর ঐতিহ্য বহুল প্রচলিত। তাদের শৈশবের স্মৃতি- কাগজের টাকা, কাগজের ঘর বা কাগজের মোবাইল পোড়ানোর সংস্কৃতি এই সিনেমা নির্মাণে অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে।
ছাওশান অঞ্চলে ছিংমিং দিবস শুধু শোকের দিন নয়, এটি জীবিত ও মৃতদের মধ্যে একধরনের প্রতীকী যোগাযোগের মাধ্যম। ধূপ জ্বালানো ও কাগজের জিনিস পোড়ানোর মাধ্যমে মানুষ বিশ্বাস করে, তারা মৃত আত্মীয়দের কাছে প্রয়োজনীয় জিনিস পাঠাতে পারছে এবং তাদের সঙ্গে একধরনের আধ্যাত্মিক সংযোগ স্থাপন করছে।
শর্টফিল্মটি দেখার পর অনেক দর্শকই বিশ্বাস করতে পারেননি যে এটি সম্পূর্ণ এআই দিয়ে তৈরি। চরিত্রের আবেগ, ত্বকের টেক্সচার, আলো-ছায়ার ব্যবহার ও পরিবেশ- সবই প্রশংসা কুড়িয়েছে।
একসময় এআই নির্মিত কাজকে ‘ঠাণ্ডা’, ‘যান্ত্রিক’ ও ‘আবেগহীন’ বলে মনে করা হতো। কিন্তু ‘পেপার ফোন’ সেই ধারণাকে বদলে দিয়েছে! এটি দেখিয়েছে যে, এআই ভিডিও প্রযুক্তি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে গল্পের আবেগ, পরিবেশ ও মানবিক অনুভূতিও যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব।
শর্টফিল্মটির বেশিরভাগ দৃশ্য তৈরি হয়েছে চীনের এআই ভিডিও মডেল খ্যলিং ৩.০ ওমনি ব্যবহার করে। দৃশ্য নির্মাণ, চরিত্রের নকশা, অ্যাকশন ডিজাইন, সাউন্ডট্র্যাক- এমনকি চরিত্রের চোখের সূক্ষ্ম অভিব্যক্তিও এআই দ্বারা তৈরি হয়েছে। তবে নির্মাতারা লক্ষ্য করেন যে, এআই দিয়ে তৈরি কাগজের মোবাইলটি অত্যন্ত নিখুঁত হয়ে গেছে, যেন শিল্পপণ্য! এতে একজন সাধারণ বৃদ্ধ দোকানির হাতে আঁকা স্বাভাবিক অমসৃণতা ছিল না। তাই শেষপর্যন্ত তারা নিজেরাই মোবাইলটির নকশা আঁকেন।
সামাজিকমাধ্যমে নেটিজেনদের মধ্যে সিনেমাটির একটি ছোট ‘ত্রুটি’ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। একটি দৃশ্যে দেখা যায়, দোকানদার ফোন করার সময় তার আঙুল ডায়াল স্পর্শ করছে না; আর এ থেকেই অনেকে বুঝতে পারেন এটি এআই-নির্মিত কাজ।
নির্মাতারা জানিয়েছেন, তারা এই ত্রুটি লক্ষ্য করেছিলেন, কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবেই তা রেখে দিয়েছেন। কারণ তাদের মতে প্রযুক্তিগত নিখুঁততার চেয়ে চরিত্রের আবেগ ও গল্পের অনুভূতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই এর প্রকৃত সাফল্য প্রযুক্তির উৎকর্ষে নয়, বরং একটি মানবিক, সাংস্কৃতিকভাবে গভীর ও আবেগী গল্প বেছে নেওয়ার মধ্যেই মূল শক্তি নিহিত।
সূত্র: সিএমজি বাংলা







