সুরক্ষা ঘাঁটিই কাল হলো মার্কিন মিত্রদের জন্য

তেহরানে মার্কিন-ইসরায়েল যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং এক ঝাঁক শীর্ষ কর্মকর্তা নিহতের পর থেকেই ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে কড়া প্রত্যাঘাত করে চলেছে তেহরান। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন মিত্র দেশগুলোতে থাকা সামরিক ঘাঁটির পাশাপাশি আর্থিক ও শিল্পকেন্দ্রেও আঘাত হানছে। ইরান যুদ্ধের আগেই ঘোষণা দিয়েছিল ওয়াশিংটন ও তেলআবিব তাদের দেশে হামলা করলে মধ্যপ্রাচ্যের ইরাক, কাতার, সৌদি আরব, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, জর্ডানে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি তাদের আক্রমণের বৈধ লক্ষ্যবস্তু হবে। যুদ্ধ শুরুর পর এসব মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ওই সব দেশের নাভিশ্বাস উঠেছে। এ ঘটনায় জনজীবনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি দেশগুলোর জীবনযাত্রা, পর্যটন ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। আবার ওই সব দেশের সরাসরি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।

ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলভর্তি জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় ইতোমধ্যে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে গেছে। সহসাই যুদ্ধ বন্ধ না হলে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। পৃথিবীর ব্যস্ততম বিমানবন্দর দুবাই এয়ারপোর্টে থেমে গেছে প্রাণচাঞ্চল্য। পণ্যসামগ্রীর দাম লাফিয়ে বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।

গত শনিবার ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানে হামলা চালিয়ে আলী খামেনি এবং আরও এক ঝাঁক শীর্ষ সামরিক নেতাকে হত্যা করেছে। ইরানজুড়ে সামরিক ও সরকারি নানা অবকাঠামোতে হামলা চালানো হয়েছে। ইরানে একটি স্কুলে হামলায় অন্তত ১৫০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন, যাদের বেশির ভাগই শিশু।

জবাবে তেহরান ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। এসব হামলায় আরব আমিরাতে তিনজন নিহত এবং ৫৮ জন আহত হয়েছেন। ক্ষেপণাস্ত্র বা সেগুলোকে আকাশে ধ্বংস করার পর সৃষ্ট ধ্বংসাবশেষ দুবাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভবন ও বিমানবন্দর, মানামার বহুতল ভবন এবং কুয়েতের বিমানবন্দরে আঘাত হেনেছে। পাশাপাশি দোহায় কিছু এলাকায় ধোঁয়া উড়তে দেখা গেছে। সৌদি আরব বলেছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র রাজধানী রিয়াদ ও দেশটির পূর্বাঞ্চলেও আঘাত হেনেছে। সৌদি তেল কোম্পানি আরমাকোর স্থাপনায় ইরানের ড্রোন আঘাত হেনেছে। কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটি ও দূতাবাসে হামলা হয়েছে। ইরাকের ইরবিলে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা হয়েছে। ওমান উপকূলে তেলবাহী জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে।

কাতার বলেছে, তাদের দেশে ১৬ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া ওমানে ৫ জন, কুয়েতে ৩২ জন এবং বাহরাইনে ৪ জন আহত হয়েছেন।

উপসাগরীয় দেশগুলো এই যুদ্ধ চায়নি। ইরানে এই হামলার কয়েক সপ্তাহ আগে থেকে ওমানের উদ্যোগে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা চলছিল। এমনকি হামলার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল-বুসাইদি আলোচনার মাধ্যমে শান্তি ‘হাতের নাগালে’ বলে বর্ণনা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ইরান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ না করার ব্যাপারে রাজি হয়েছে এবং বিদ্যমান মজুদের মানও দ্রুত কমাবে।

বহু বছর ধরে উপসাগরীয় দেশগুলোর উদ্বেগের মূলে ছিল ইয়েমেনের হুথি বা লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহর মতো অরাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীগুলো। এখন ওই হিসাব পাল্টে গেছে। রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্র যুদ্ধের শঙ্কা বহুগুণে বেড়ে গেছে।

এই মুহূর্তে উপসাগরীয় দেশগুলো দ্রুত নিজেদের কৌশল পুনঃ সমন্বয় করছে। তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ভর করছে ইরান কী করে, তার ওপর। একটি বিকল্প হতে পারে এ যুদ্ধে নিজেদের না জাড়নো এবং উপসাগরীয় দেশগুলো ঠিক এটাই চাইছে।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার মাত্রা ও সময় নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সৌদি আরবের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা। তারা উপসাগরীয় মিত্রদের সতর্ক করেছেন, এমন কোনো পদক্ষেপ না নিতে, যা তেহরান বা তাদের মিত্র গোষ্ঠীর পাল্টা প্রতিক্রিয়া উসকে দিতে পারে এবং অঞ্চলকে আরও বড় সংঘাতে ঠেলে দিতে পারে।

দুটি উপসাগরীয় আরব সূত্র মিডল ইস্ট আইকে জানিয়েছে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান শনিবার বাহরাইন, কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতাদের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেন।

সূত্রগুলো জানায়, কথোপকথনগুলো সংক্ষিপ্ত ছিল। তবে একটি মতৈক্য গড়ে উঠছিল যে, ইরানের পাল্টা হামলা প্রত্যাশার তুলনায় কম তীব্র ছিল। তাই উপসাগরীয় দেশগুলোর উচিত হবে এমন কোনো সরাসরি পদক্ষেপ না নেওয়া, যা তেহরানের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ডেকে আনতে পারে।

পরে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান বিন আবদুল্লাহ আঞ্চলিক সমকক্ষদের সঙ্গে ফোনালাপেও একই মনোভাব প্রতিফলিত হয় বলে সূত্রগুলো জানায়। সেই ফোনালাপগুলোতে উত্তেজনা প্রশমন এবং উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের ছয় দেশের পররাষ্ট্রনীতিকে ঐক্যবদ্ধ রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়, যাতে কোনো একক দেশ আলাদা পথে না হাঁটে।

  • Related Posts

    হিজবুল্লাহর গোয়েন্দা প্রধান নিহত: আইডিএফ

    লেবাননের বৈরুতে ইসরায়েলি হামলায় হিজবুল্লাহর গোয়েন্দা প্রধান হুসেইন মাকলেদ নিহত হয়েছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) এক বিবৃতিতে এ দাবি করা হয়েছে। আজ সোমবার বিবিসির প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। আইডিএফ…

    ইরানে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে জড়াবে না যুক্তরাষ্ট্র: জেডি ভ্যান্স

    ইরাক ও আফগানিস্তানের মতো ইরানে বহু বছরের দীর্ঘস্থায়ী এমন কোনো সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র জড়াবে না, যা বছরের পর বছর ধরে চলবে বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তিনি…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *