সেই অবৈধ নিয়োগ এখন বিটিআরসির গলার কাঁটা

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনে (বিটিআরসি) এক সময়ের বিতর্কিত ও অবৈধ নিয়োগ এখন প্রতিষ্ঠানটির জন্য ‘গলার কাঁটা’তে পরিণত হয়েছে। সরকারি অডিট, তদন্ত কমিটি ও শ্বেতপত্র প্রতিবেদনে দুর্নীতিগ্রস্ত ও বিধিবহির্ভূত হিসেবে চিহ্নিত এসব নিয়োগ ঘিরেই আজ কমিশনের ভেতরে-বাইরে তৈরি হয়েছে তীব্র অস্বস্তি ও সংকট।

অভিযোগ উঠেছে, দীর্ঘদিন ধরে অডিট আপত্তিতে থাকা কয়েকজন কর্মকর্তাকে বর্তমান কমিশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তড়িঘড়ি করে পদোন্নতি দিতে মরিয়া একটি মহল। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর কমিশন পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে সামনে রেখেই এই তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পরীক্ষা ছাড়াই নিয়োগ, আজ বোঝা : অনুসন্ধানে জানা যায়, বিগত সরকারের আমলে কোনো প্রিলিমিনারি, লিখিত কিংবা মৌখিক পরীক্ষা ছাড়াই সরকারি বিধি লঙ্ঘন করে ২৯ জনকে ‘জুনিয়র পরামর্শক’ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। সরকারি অডিট অধিদপ্তর ও শ্বেতপত্র কমিটির প্রতিবেদনে এসব নিয়োগকে স্পষ্টভাবে ‘অবৈধ’ ও ‘দুর্নীতিপ্রসূত’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ একাধিকবার এসব নিয়োগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে লিখিত নির্দেশ দিলেও রহস্যজনক কারণে কমিশন তা কার্যকর করেনি। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই অবৈধ নিয়োগই এখন বিটিআরসির জন্য বড় প্রশাসনিক ও নৈতিক সংকটে রূপ নিয়েছে।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, অডিটে অবৈধ ঘোষিত নিয়োগ বহাল থাকা মানেই প্রতিষ্ঠানকে ঝুঁকির মধ্যে রাখা। এসব নিয়োগ এখন কমিশনের জন্য দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ডিপিসি সভা ঘিরে টানাপড়েন : বিতর্কিত এই নিয়োগপ্রাপ্তদের পদোন্নতি দিতে বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির (ডিপিসি) সভা নিয়ে শুরু হয় অস্বাভাবিক টানাপড়েন। গত ২৫ জানুয়ারির ডিপিসি সভায় স্পষ্ট সিদ্ধান্ত হয়- যাদের নিয়োগ নিয়ে অডিট আপত্তি রয়েছে, তাদের কাউকেই পদোন্নতি দেওয়া হবে না। সভায় উপস্থিত মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি ও বহিঃসদস্যরা এ সিদ্ধান্তে একমত হন। কিন্তু মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে ২৮ জানুয়ারি পুনরায় সভা আহ্বান করা হলে বহিঃসদস্যরা অনুপস্থিত থাকেন।

অভিযোগ রয়েছে, কমিশনের একটি প্রভাবশালী মহল চাপ প্রয়োগ ও যোগসাজশের মাধ্যমে সভার সিদ্ধান্ত বদলানোর চেষ্টা করে। সর্বশেষ আগামীকাল ৩ ফেব্রুয়ারি আবারও সভা ডাকার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা অনেকের কাছে বিতর্কিত পদোন্নতি বাস্তবায়নের শেষ চেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

শ্বেতপত্রে উঠে এসেছে অনিয়ম : অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত শ্বেতপত্র কমিটি গত ১৫ বছরে টেলিযোগাযোগ খাতে সংঘটিত দুর্নীতি ও অনিয়ম পর্যালোচনা করে যে প্রতিবেদন দিয়েছে, তাতে বিটিআরসির নিয়োগ সংক্রান্ত গুরুতর অনিয়মের বিস্তারিত তথ্য উঠে এসেছে। নিরীক্ষা নথির ভিত্তিতে বিতর্কিত এসব কর্মকর্তার নামও প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা ইতোমধ্যে জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব আব্দুন নাসের খান আমাদের সময়কে বলেন, ‘অতীতে কী ঘটেছিল… বিষয়গুলো নিশ্চয় বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির সদস্যরা অবগত। তারা সে বিষয়গুলো বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেবেন বলে আমি মনে করি।’

যোগ্যদের বঞ্চনা, বাড়ছে ক্ষোভ : বর্তমানে বিটিআরসির ৩৫৫ জন স্থায়ী জনবলের মধ্যে অন্তত ১৫৩ জনের নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়। পরিচালক ও উপ-পরিচালকসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য থাকলেও বৈধ ও যোগ্য কর্মকর্তারা বছরের পর বছর পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত।

এ প্রসঙ্গে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাকালীন নির্বাহী পরিচালক এবং বর্তমান ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ব্যারিস্টার মনজুর হাসান বলেন, অবৈধ নিয়োগ রক্ষা করতে গিয়ে যদি পদোন্নতি দেওয়া হয়, তাহলে সেটি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিকে স্থায়ী রূপ দেয়।

তিনি বলেন, এক সময়কার অবৈধ নিয়োগই এখন বিটিআরসির জন্য সবচেয়ে বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অডিট আপত্তি উপেক্ষা করে এসব নিয়োগপ্রাপ্তদের পদোন্নতি দেওয়া হলে তা সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার নীতিকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, অডিট প্রতিষ্ঠান ও দুদকের দৃঢ় ও সমন্বিত হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।

একজন পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তা বলেন, অবৈধ নিয়োগ আড়াল করতে গিয়ে আমাদের ন্যায্য পদায়ন আটকে রাখা হচ্ছে। এতে প্রতিষ্ঠানজুড়ে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বিটিআরসির নিয়োগ ও পদোন্নতি কার্যক্রম সরকারি বিধি, কমিশনের চাকরি প্রবিধান এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া বাধ্যতামূলক। অথচ অডিট আপত্তি থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং গত বছর ৩০ জুলাই ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ যে নির্দেশনায় বিতর্কিত কর্মকর্তাদের ওএসডি করা ও সাইনিং পাওয়ার প্রত্যাহারের কথা বলেছিল, তা আজও বাস্তবায়ন হয়নি। উল্টো অভিযোগ রয়েছে, তারা বিদেশ ভ্রমণ, আর্থিক প্রণোদনা ও প্রশাসনিক সুবিধা ভোগ করে চলেছেন।

এ প্রসঙ্গে জানতে বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব) মো. এমদাদ উল বারী, ভাইস-চেয়ারম্যান মো. আবু বকর ছিদ্দিক এবং মহাপরিচালক (প্রশাসন) মো. মেহেদী-উল-সহিদকে ফোনকল করা হলে সাড়া পাওয়া যায়নি।

  • Related Posts

    সংসদে ভাষণ দেবেন রাষ্ট্রপতি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

    রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন জাতীয় সংসদে ভাষণ দেবেন বলে জানিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। আজ বুধবার দুপুরে সংসদ থেকে বের হয়ে তিনি এ কথা বলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন,…

    জ্বালানি তেল বিক্রি নিয়ে সরকারের নতুন নির্দেশনা

    মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা মোকাবিলায় অকটেন ও পেট্রল বিক্রির ক্ষেত্রে নতুন নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। নির্দেশনায় দেশের বিভাগীয় শহরে জ্বালানি তেলের (অকটেন ও পেট্রল) গড় বিক্রয় হ্রাস…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *