ববি হাজ্জাজকে চ্যালেঞ্জে ফেলবেন মামুনুল হক

অপরাধীদের হটস্পট হিসেবে পরিচিত রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকা। এখানে শিয়া, সুন্নি, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ নানা সম্প্রদায়ের বসবাস। এই এলাকার সমস্যা যেমন রয়েছে, তেমনি ইতিহাস-ঐতিহ্যে ভরপুর। খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেও এগিয়ে এলাকাটি। আন্দোলন-সংগ্রামেও এ এলাকার একটা ইতিহাস রয়েছে। সপ্তদশ শতাব্দীর মোগল স্থাপত্যের নিদর্শন সাত গম্বুজ মসজিদ ও বিবির মাজার এখানে অবস্থিত। ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের স্মারক আসাদ গেট এই এলাকার ঐতিহ্যের অংশ। অথচ এই মোহাম্মদপুর এখন অপরাধের স্বর্গরাজ্য হিসেবে গণ্য হয়। আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে মোহাম্মদপুর, আদাবর ও শেরেবাংলা নগর থানা নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৩ আসন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৮ থেকে ৩৪ নম্বর ওয়ার্ড এই আসনের অংশবিশেষ। এই আসনে ৯ জন এমপি প্রার্থী ভোটের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বয়সে তরুণ এবং স্মার্ট হওয়ায় তরুণ ভোটারদের কাছে প্রাধান্য পাচ্ছেন বিএনপির ববি হাজ্জাজ। অন্যদিকে মাদ্রাসাকেন্দ্রিক ভোটারের দিকে নজর ধর্মীয় নেতা মাওলানা মামুনুল হকের। অনেকের মনে প্রশ্ন- ববি হাজ্জাজকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারবেন মাওলানা মামুনুল হক?

২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর মানুষ চায় একটি নিরাপদ আবাসন গড়ে উঠুক মোহাম্মদপুর এলাকায়। এ জন্য যোগ্য নেতৃত্ব খুঁজে নিতে উদগ্রীব মোহাম্মদপুরবাসী। আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দুটি বড় রাজনৈতিক জোটের প্রার্থীর পাশাপাশি দুজন স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং অন্যান্য দলের প্রার্থীরা অংশ নিচ্ছেন এই আসন থেকে। সংখ্যায় ৯ জন প্রার্থী থাকলেও ভোটের মাঠে সরব মাত্র দুজন। বিএনপি মনোনীত জোটের প্রার্থী জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক

আন্দোলনের (এনডিএম) সাবেক চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ ধানের শীষ নিয়ে ভোটের মাঠে সরব। তার সঙ্গে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মো. মামুনুল হক (মাওলানা মামুনুল হক)। তার প্রতীক রিকশা।

অতীতের নির্বাচনগুলোতে এখানে আধিপাত্য বিস্তার করেছে বিএনপি, আওয়ামী লীগ। বড় দুটি দলের বিশাল ভোটব্যাংক রয়েছে ঢাকা-১৩ আসনে। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর আবাসস্থল এখানে। তা ছাড়া বিএনপির অনেক সিনিয়র নেতার বাসা রয়েছে। মাত্র ২৩ বছর বয়সে ঢাকা সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছিলেন বিএনপি নেতা আহমেদ ইকবাল হাসান। তিনি এখানকার স্থানীয়। এ ছাড়া সাবেক ছাত্রনেতা, এরশাদবিরোধী আন্দোলনের অগ্রনায়ক ও বেগম খালেদা জিয়ার সাবেক উপদেষ্টা আতাউর রহমান ঢালী ঢাকা-১৩ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। তাই তাদের মধ্যে মনোমালিন্য হলেও দল ও জোটের স্বার্থে শেষ মুহূর্তে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এমন প্রেক্ষাপটে স্থানীয়রা মনে করেন, বিএনপির মধ্যকার ভেদাভেদ ভুলে ঐক্য হলে ধানের শীষের বিজয় ঠেকাতে পারবে না রিকশা মার্কা।

তবে মাদ্রাসাপূর্ণ এলাকাটিতে মামুনুল হকের অবস্থানও শক্ত বলে জানা গেছে। তার বাবা বিখ্যাত আলেম ও শায়খুল হাদিস আজিজুল হক মোহাম্মদপুরে জামিয়া রহমানিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যেখানে তিনি দীর্ঘ দিন শিক্ষকতা করেছেন। মামুনুল হকও সেখানকার শিক্ষক। তাই তার অনেক ভক্ত, অনুরাগী শিক্ষার্থী রয়েছে। এটা তার বড় শক্তি। তা ছাড়া জামায়াত জোটের প্রার্থী হওয়ায় অবাঙালিদের ভোটের দিকেও তার নজর। তবে তার প্রচার মাদ্রাসাকেন্দ্রিক এবং মসজিদ-মাদ্রাসায় সীমাবদ্ধ হওয়ায় সাধারণ ভোটারদের মনে ঠাঁই করে নিতে পারেননি এখনও। অন্যদিকে অবাঙালিরা জামায়াতের প্রতি ঝুঁকতে পারে এমন ধারণা করা হলেও অনেকে মনে করেন, যেহেতু জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নেই, তাই অবাঙালি ভোট ভাগ হয়ে যেতে পারে।

বাবর রোডের বাসিন্দা মারগুব আহমেদ নাজাম উদ্দীন আমাদের সময়কে বলেন, আসনটি মূলত বিএনপির। এখানে দাঁড়িপাল্লার খুব বেশি প্রভাব কখনই ছিল না। অতীতে বিএনপি, আওয়ামী লীগের মধ্যে লড়াই হতো। এবার আওয়ামী লীগ না থাকায় বিএনপির জন্য ভালো সুযোগ রয়েছে। তা ছাড়া মামুনুল হক সাহেবের প্রচার এখনও মাদ্রাসা-মসজিদকেন্দ্রিক। তিনি সাধারণ ভোটারের কাছে যেতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাই শেষ মুহূর্তে ধানের শীষের কাছে টিকতে পারবে না রিকশা। তবে এ জন্য বিএনপির সবগুলো গ্রুপকে সক্রিয় হতে হবে।

তিনি বলেন, মাঠে একটা প্রচার আছে ববি হাজ্জাজ বহিরাগত। কিন্তু তিনি এবং তার স্ত্রী যেভাবে ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন, তাতে সবার হৃদয় জয় করেছেন বলেই মনে হয়েছে।

ঢাকা-১৩ আসনে আরও যারা প্রার্থী রয়েছেন : আপেল প্রতীক নিয়ে ভোটের মাঠে রয়েছেন ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ-এর ফাতেমা আক্তার মুনিয়া। গণঅধিকার পরিষদের মিজানুর রহমান ট্রাক মার্কায় দাঁড়িয়েছেন। বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) মো. খালেকুজ্জামান আছেন মই মার্কা নিয়ে। বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টির (বিএমজেপি) মো. শাহাবুদ্দিন রকেট মার্কা নিয়ে ভোটের মাঠে। এ ছাড়া বাংলাদেশ মুসলিম লীগের শাহরিয়ার ইফতেখারের হারিকেন, স্বতন্ত্র প্রার্থী শেখ মো. রবিউল ইসলামের ঘুড়ি, আরেক স্বতন্ত্র সোহেল রানার কলস মার্কাও থাকবে ব্যালটে। স্বতন্ত্র প্রার্থী শেখ মো. রবিউল ইসলামের ঘুড়ি মার্কার কিছু ব্যানার-ফেস্টুন চোখে পড়লেও অন্য প্রার্থীদের তেমন একটা দেখা যায়নি।

আসনটিতে ভোটারের সংখ্যা : ঢাকা-১৩ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৮ হাজার ৭৯১ জন। পুরুষ ২ লাখ ৯ হাজার ৮১২ জন। মহিলা ১ লাখ ৯৮ হাজার ৯৭১ জন। হিজড়া ৮ জন। এর মধ্যে মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্পে অবাঙালি ভোটার রয়েছে প্রায় ৩০ হাজার। এ ছাড়া আরও প্রায় ২০ হাজারের মতো বিহারি ভোটার রয়েছে মোহাম্মদপুরে। ধারণা করা হচ্ছে, বিহারিদের ভোট জয়-পরাজয়ে ফ্যাক্টর হতে পারে।

শেখেরটেক ৬ নম্বর রোডের একটি বাসায় ভাড়া থাকেন কালু নামের এক অবাঙালি। তিনি আমাদের সময়কে বলেন, জামায়াতকে আমরা ভোট দেব না। আমাদের ভোট ধানের শীষেই পড়বে।

ভোটাররা প্রার্থী বিবেচনায় ভোট দিতে চান। তা ছাড়া যে প্রার্থী নিরাপদ মোহাম্মদপুর গড়তে পারবেন, তাকেই বেছে নিতে চান ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে।

আদাবরের বাসিন্দা মনিরুজ্জামান টিটু আমাদের সময়কে বলেন, বিএনপি, আওয়ামী লীগের শাসন দেখেছি। দুই দলই সন্ত্রাস, চাঁদাবাজদের প্রশ্রয় দেয়। তাই এবার জামায়াতের সুযোগ এসেছে। আমরা চাই, সুষ্ঠু ভোটের মাধ্যমে জামায়াতের প্রার্থীর বিজয় হোক। তা হলে দেশে হানাহানি, চাঁদাবাজি বন্ধ হয়ে যাবে।

  • Related Posts

    হুট করে প্লেনে চড়ে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা আমাদের নাই: তারেক রহমান

    হুট করে প্লেনে চড়ে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা নেই বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) সন্ধ্যা ৭টায় নওগাঁ শহরের এটিএম মাঠে জেলা বিএনপি আয়োজিত সমাবেশে প্রধান অতিথির…

    আমরা আর কাউকেই টানাটানি করার সুযোগ দেব না: জামায়াত আমির

    শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে জামায়াত-বিএনপির সংঘর্ষের ঘটনায় নির্বাচনী লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বলে মন্তব্য করেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, ‘আমরা আমাদের কনসার্ন জানিয়েছি। আমরা এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *