ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিদেশি কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিশেষ পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। নির্বাচন কমিশন (ইসি), স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে তৈরি এই নিরাপত্তা কাঠামোর মাধ্যমে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ভোট পর্যবেক্ষকদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে। ১৬টি দেশ থেকে আসা ৫৭ জন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ভোটকেন্দ্র পরিদর্শনের আগে তাদের সফরসূচি জানালে স্থানীয় প্রশাসন প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বিদেশি পর্যবেক্ষক ও ঢাকার বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে রাজধানী ঢাকায় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করবে পুলিশ। পাশাপাশি ভোট পর্যবেক্ষণে তারা দেশের বিভিন্ন জেলায় গেলে সেখানেও স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তত্ত্বাবধানে পৃথক নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার সানা শামীনুর রহমান এ বিষয়ে আমাদের সময়কে বলেন, বিদেশি কূটনীতিক ও পর্যবেক্ষকদের জন্য সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এক্ষেত্রে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুসরণ করা হবে। ডিএমপির ভেতরে আমরা নিরাপত্তা দেব। আর ঢাকার বাইরে নিজ নিজ জেলা ও মহানগর পুলিশ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজধানীর কূটনৈতিক এলাকা, বিদেশি অতিথিদের আবাসন কেন্দ্র, হোটেল ও পর্যবেক্ষকদের চলাচলের রুটগুলোয় বিশেষ নজরদারি বাড়ানো হবে। এ ছাড়া কূটনৈতিক জোন ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোয় অতিরিক্ত পুলিশ, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হবে।
নিরাপত্তা পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিদেশি পর্যবেক্ষক দল ভোটকেন্দ্র পরিদর্শনে গেলে তাদের সফরসূচি আগেই সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে জানাতে হবে। সেই অনুযায়ী স্থানীয় প্রশাসন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। প্রয়োজনে সশস্ত্র বাহিনীর সহায়তাও রাখা হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বিদেশি অতিথিদের জন্য আলাদা সমন্বয় সেল গঠন করা হচ্ছে, যা সফরসূচি, নিরাপত্তা, যোগাযোগ এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সহায়ক হয়। রাজধানীতে অবস্থানকালে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও পর্যবেক্ষকদের চলাচলের সময় প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশ এসকর্ট দেওয়া হবে। যেসব পর্যবেক্ষক দল ঢাকার বাইরে যাবেন, তাদের জন্য সংশ্লিষ্ট জেলার পুলিশ সুপার ও প্রশাসনকে আগাম নির্দেশনা দেবে পুলিশ সদর দপ্তর।
জানা গেছে, নিরাপত্তা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গোয়েন্দা তৎপরতা এবং অনলাইন মাধ্যমে সম্ভাব্য বিভ্রান্তি বা গুজব ছড়ানো ঠেকাতেও নজর রাখা হবে। নির্বাচনকালীন বিদেশি নাগরিকদের লক্ষ্য করে কোনো ধরনের অপপ্রচার বা নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকবে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, ভোটের সময় সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা যেমন জরুরি, তেমনি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বিদেশি প্রতিনিধিরা নির্বাচন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রতিবেদন উপস্থাপন করে থাকেন।
নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, বিদেশি পর্যবেক্ষক ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের জন্য নিবন্ধন, চলাচল এবং নিরাপত্তা সহায়তার বিষয়ে আগেভাগেই নির্দেশনা তৈরি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দূতাবাস ও সংস্থাগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগও রাখা হচ্ছে।
ভোটের আগে ও পরে সম্ভাব্য সহিংসতা বা নাশকতা এড়াতে সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েনের পরিকল্পনাও চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, আনসার ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা মাঠে দায়িত্ব পালন করবেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক, বিদেশি কূটনীতিক ও উন্নয়ন সহযোগীদের উপস্থিতি নির্বাচনকে আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। ফলে তাদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে সরকার।
সব মিলিয়ে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিদেশি অতিথিদের জন্য এবার আরও সুসংগঠিত ও সমন্বিত নিরাপত্তা পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এতে নির্বাচনকালীন সময়ে বিদেশি প্রতিনিধিদের নির্বিঘ্নে দায়িত্ব পালনের সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নির্বাচনে আসছে ১৬ দেশের পর্যবেক্ষক
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচন এবং গণভোট পর্যবেক্ষণ করতে ১৬টি দেশ থেকে আসছেন ৫৭ জন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক। গতকাল শুক্রবার প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে জানানো হয়, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), কমনওয়েলথ এবং বিশ্বের বিভিন্ন মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলোর কয়েকশ পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে এই ৫৭ জন দ্বিপাক্ষিক প্রতিনিধি যুক্ত হবেন। এখন পর্যন্ত প্রায় ৪০০ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়েছে।
দ্বিপাক্ষিক প্রতিনিধিদলের মধ্যে সবচেয়ে বড় দল পাঠাচ্ছে মালয়েশিয়া। দেশটির নির্বাচন কমিশনের চেয়ারম্যান দাতো শ্রী রামলান বিন দাতো হারুনের নেতৃত্বে ১৪ সদস্যের একটি দল বাংলাদেশে আসবে। এরপরই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১২ জন পর্যবেক্ষক পাঠাবে তুরস্ক। সাবেক তুর্কি রাষ্ট্রদূত মেহমেত ভাকুর এরকুলের নেতৃত্বে এই দলে তুরস্কের সংসদ সদস্যরাও অন্তর্ভুক্ত থাকবেন।
অন্য দেশের মধ্যে ইন্দোনেশিয়া থেকে ৫ জন, জাপান থেকে ৪ জন এবং পাকিস্তান থেকে ৩ জন পর্যবেক্ষক আসার কথা রয়েছে। পাকিস্তানের প্রধান নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ জালাল সিকান্দার সুলতান এবং ভুটানের প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড্যাকি পেমা অন্যতম উল্লেখযোগ্য পর্যবেক্ষক হিসেবে উপস্থিত থাকবেন।
এ ছাড়া মালদ্বীপ, ফিলিপাইন, জর্দান, জর্জিয়া, রাশিয়া, কিরগিজস্তান এবং দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ২ জন করে এবং শ্রীলংকা, ইরান ও উজবেকিস্তান থেকে ১ জন করে পর্যবেক্ষক প্রতিনিধি দল পাঠাচ্ছে।
কমনওয়েলথের ১৪ সদস্যের পর্যবেক্ষক দলটির নেতৃত্ব দেবেন ঘানার সাবেক প্রেসিডেন্ট নানা আকুফো-আডো। এই দলে মালদ্বীপের সাবেক উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেফরি সালিম ওয়াহিদ এবং সিয়েরালিওনের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড জন ফ্রান্সিস অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।
অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের নেতৃত্বে থাকছেন লাটভিয়ার সংসদ সদস্য ইভারস ইজাবস। তার সঙ্গে অস্ট্রিয়া, রোমানিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র, স্পেন, আয়ারল্যান্ড এবং নেদারল্যান্ডসের ৭ জন ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য পর্যবেক্ষক হিসেবে যোগ দেবেন।
নির্বাচন ও গণভোটের প্রস্তুতি সিনিয়র সচিব ও এসডিজি বিষয়ক সমন্বয়ক লামিয়া মোরশেদ জানান, পর্যবেক্ষক সমন্বয়ে তারা সর্বোচ্চ সহযোগিতা করছেন এবং আরও কিছু দেশ খুব শিগগিরই তাদের প্রতিনিধিদের নাম নিশ্চিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।





