এগিয়ে আসছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, দেশের রাজনীতিতে বাড়ছে উত্তাপ। আসন্ন এ নির্বাচন ঘিরে মূল আলোচনায় রয়েছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। এর পাশাপাশি আলোচনায় যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর অবস্থানও। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের। জামায়াতে ইসলামী অভিযোগ করেছে, ভারতের সঙ্গে বিএনপির একটি গোপন সমঝোতা হয়েছে, যা নির্বাচনী কৌশল ও ভবিষ্যৎ ক্ষমতার সমীকরণকে প্রভাবিত করতে পারে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। তাদের মতে, আসন্ন নির্বাচনে জামায়াত আশ্চর্যজনকভাবে ভালো ফল করতে পারে। একদিকে জামায়াতের পক্ষ থেকে ভারতের সঙ্গে বিএনপির গোপন সমঝোতার অভিযোগ, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পর্যবেক্ষণে জামায়াতের সম্ভাব্য ‘অবিশ্বাস্য ভালো ফল’র ইঙ্গিত- ত্রয়োদশ নির্বাচনের বাস্তবতাকে রাজনীতির জটিল সমীকরণে দাঁড় করিয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের সম্প্রতি প্রকাশ্যে অভিযোগ করেন, ত্রয়োদশ নির্বাচন সামনে রেখে ভারতের সঙ্গে গোপন একটি চুক্তিতে পৌঁছেছে বিএনপি। তার দাবি, এ চুক্তির মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় এলে নির্দিষ্ট কিছু আঞ্চলিক ও কৌশলগত বিষয়ে ভারতের স্বার্থ অগ্রাধিকার পাবে, যার বিনিময়ে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় নীরব সমর্থন বা সুবিধা নিশ্চিত করা হচ্ছে। যদিও তিনি অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট কোনো নথি বা প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি, তবু তার বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। জামায়াতের একটি অংশ মনে করছে, দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে ভারতের প্রভাব বিবেচনায় রেখে বিএনপি নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠন করছে এবং তাতে জামায়াতকে কোণঠাসা করা হচ্ছে।
এই অভিযোগের প্রতিক্রিয়ায় বিএনপি দ্রুত ও দৃঢ় ভাষায় অবস্থান পরিষ্কার করেছে। দলটির শীর্ষ নেতারা একাধিক বিবৃতিতে বলেছেন, ভারতের সঙ্গে বিএনপির কোনো গোপন বা প্রকাশ্য চুক্তি নেই এবং এমন অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছেÑ দলটি বরাবরই বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ও সমতার ভিত্তিতে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের পক্ষে। কোনো বিদেশি শক্তির সঙ্গে আপস বা গোপন সমঝোতার রাজনীতি বিএনপির আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেও তারা দাবি করেন।
বিএনপির নেতারা বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে একটি বিশেষ রাজনৈতিক শক্তি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে, যাতে বিরোধী শিবিরের মধ্যে সন্দেহ ও অবিশ্বাস তৈরি হয়। তাদের মতে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করার জন্যই এমন অভিযোগ তোলা হচ্ছে, যার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। একই সঙ্গে তারা জামায়াতকে ইঙ্গিত করে বলেন, রাজনীতিতে টিকে থাকতে হলে দায়িত্বশীল ও প্রমাণভিত্তিক বক্তব্য জরুরি।
গত ২২ জানুয়ারি মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’ একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের নতুন ইঙ্গিত উন্মোচন করেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তন এবং ছাত্র রাজনীতিতে প্রভাব বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র জামায়াতকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন কূটনীতিকদের ধারণা অনুযায়ী আগামী নির্বাচনে জামায়াত উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করতে পারে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে যুক্তরাষ্ট্র দলটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বা ‘বন্ধুত্ব’ স্থাপনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে তারা সতর্কও যে, জামায়াত যদি তাদের ইতিহাসের বিরুদ্ধে বা মার্কিন স্বার্থবিরোধী কোনো কট্টর অবস্থান গ্রহণ করে, তাহলে তৈরি পোশাক খাতে উচ্চ শুল্ক আরোপসহ কঠোর অর্থনৈতিক পদক্ষেপের আওতায় আসবে।
গত ১ ডিসেম্বর ঢাকায় নারী সাংবাদিকদের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে একজন মার্কিন কূটনীতিক বলেন, বাংলাদেশ ‘ইসলামিক ধারায়’ মোড় নিয়েছে। প্রকাশিত খবর অনুযায়ী তিনি ধারণা করেন যে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াত তাদের ইতিহাসের সেরা ফল করতে পারে। তবে তিনি জামায়াতের শরিয়াহ আইন চাপানোর শঙ্কা উড়িয়ে দেন। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মুখপাত্র মনিকা শাই পরবর্তী সময়ে ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’কে জানান, বৈঠকটি ছিল স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে নিয়মিত ও ঘরোয়া আলোচনা, যেখানে অনেক রাজনৈতিক দলের বিষয়ে কথা হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র কোনো বিশেষ দলের পক্ষে নেই। জামায়াতের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়, মার্কিন কূটনীতিকের ব্যক্তিগত বৈঠক সম্পর্কে তারা কোনো মন্তব্য করতে চান না।
দায়িত্ব নেওয়ার পর গত কয়েক দিনে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। চট্টগ্রাম সফরে তিনি সরাসরি ব্যবসায়িক নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং নির্বাচনকালীন স্থিতিশীলতার গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেন। মার্কিন দূতাবাসের মুখপাত্র পূর্ণিমা রাই জানান, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের নির্বাচনপ্রক্রিয়ার প্রতি গভীর আগ্রহ রাখে এবং আশা রাখে ভোট প্রক্রিয়া অবাধ, স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু হবে। তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য বাংলাদেশের জনগণ যেন তাদের ইচ্ছা মুক্তভাবে প্রকাশ করতে পারেন।
অন্যদিকে ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলা সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন, বাংলাদেশে আসন্ন নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হলে জামায়াত ক্ষমতায় আসতে পারবে না। তার মতে, দলটির ভোটের হার সর্বোচ্চ ৫ থেকে ৭ শতাংশ, যা অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সহায়তায় অল্পমাত্রায় বাড়তে পারে। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এক বিবৃতিতে জানান, দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয় ও নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়ে বিদেশি মন্তব্য আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও পররাষ্ট্রনীতির লঙ্ঘন। তিনি বলেন, কোনো বিদেশি রাজনীতিকের নির্বাচনের বিষয়ে মন্তব্য করার অধিকার নেই। ভোটের সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণরূপে দেশের জনগণের।
বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশন ও সহকারী হাইকমিশনগুলোয় দায়িত্বরত কূটনীতিক ও অন্য কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যদের ফিরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নয়াদিল্লি। বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে ভারতের একাধিক সরকারি সূত্র জানায়। বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগে এমন পদক্ষেপ নেয় ভারত সরকার। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে সার্বিকভাবে নিরাপত্তার এখন পর্যন্ত কোনো বিঘ্ন ঘটেনি উল্লেখ করে এ ব্যাপারে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেন, অতীতের নির্বাচনের সময়ের তুলনায় সংঘর্ষ বেশি হচ্ছে, আমার তা মনে হচ্ছে না। আমার মনে হয় না যে এমন কোনো নিরাপত্তা-পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে যে এমন পদক্ষেপ নিতে হবে। নিরাপত্তা নিয়ে ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাস আগাম উদ্বেগ জানিয়েছিল কিনা, জানতে চাইলে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, তারা কোনো নিরাপত্তা উদ্বেগের কথা জানায়নি।
অন্যদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ভারত বিশ্লেষণ করতে পারে, তবে মতামত দেওয়ার সুযোগ রাখে না বলে মন্তব্য করেন অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।





