জাতীয়সর্বশেষ

ভাড়া মিটারে চলে না সিএনজিচালিত অটোরিকশা, যাত্রীদের হয়রানি

চালকদের দাবি, যাত্রীরা মিটারে যেত চান না
যাত্রীরা বলছেন, হয় মিটার নষ্ট, নতুবা মিটারে যেতে অনীহা চালকদের
ট্রাফিক বিভাগের বক্তব্য, অভিযোগ পেলে আমরা ব্যবস্থা নেই
প্রায় ৬০ লাখ মানুষের বাস চট্টগ্রাম মহানগরীতে। নগরীতে চলাচল করে প্রায় সাড়ে তিন লাখ যান্ত্রিক যানবাহন। পাশাপাশি আছে তিন লাখের বেশি প্যাডেলচালিত রিকশা। এসব যানবাহন নিয়ন্ত্রণে হিমশিম চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ। নগরীজুড়ে যত্রতত্র পার্কিং, ট্রাফিক নির্দেশনা না মানা, অবৈধ যানবাহন চলাচল করার কারণে অব্যবস্থাপনা দেখা দিয়েছে নগর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায়। দুর্ঘটনা, প্রতারণা কিংবা যানজটে নাকাল হয়ে যার মাশুল গুনতে হচ্ছে নগরবাসীকেই। নগর ট্রাফিকের অব্যবস্থাপনা নিয়ে নিজস্ব প্রতিবেদক ইকবাল হোসেনের ছয় পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ থাকছে দ্বিতীয়টি।
চট্টগ্রাম মহানগরীতে সরকারি হিসাবে চলাচল করে ১৩ হাজার সিএনজিচালিত অটোরিকশা। নিয়ম অনুযায়ী এসব অটোরিকশায় চড়লে যাত্রীদের মিটারে ভাড়া পরিশোধ করার কথা। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বেশিরভাগ অটোরিকশার মিটার নষ্ট। যাদের মিটার ঠিক আছে তারা চুক্তি ছাড়া যেতে চান না। সচেতন যাত্রীদের সঙ্গে চালকদের হরহামেশাই চলে বাকবিতণ্ডা। বিষয়টি নিয়ে মাথাব্যথা নেই নগর ট্রাফিক বিভাগের। তাদের বক্তব্য, যাত্রীরা অভিযোগ দিলেই মিটার ছাড়া চলাচলকারী অটোরিকশার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেন ট্রাফিক সার্জেন্টরা।
তথ্য অনুযায়ী, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ ২০১৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর সিএনজিচালিত অটোরিকশার ভাড়া বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। প্রজ্ঞাপনে সিএনজি ও পেট্রোলচালিত ফোর স্ট্রোক থ্রি-হুইলারের ভাড়া সংশোধন করে পুনর্নির্ধারণ করা হয়। অটোরিকশা মালিকের ভাড়া ৬০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৯০০ টাকা করা হয়। প্রথম দুই কিলোমিটারের ভাড়া ২৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে করা হয় ৪০ টাকা, পরবর্তী প্রতি কিলোমিটার ৭ টাকা ৬৪ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১২ টাকা, বিরতির জন্য প্রতি মিনিট ১ টাকা ৪০ পয়সার স্থলে ২ টাকা এবং যে কোনো দূরত্বে সর্বনিম্ন বাধ্যতামূলক ভাড়া ২৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
চট্টগ্রাম মহানগরীতে ১৩ হাজার সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলে। ২০১৮ সাল থেকে পুনঃস্থাপন হওয়ার কারণে প্রায় সবগুলো গাড়ি নতুন। সবগুলোতে মিটার সচল রয়েছে।- চট্টগ্রাম সাধারণ সিএনজি অটোরিকশা সাধারণ মালিক ঐক্য পরিষদ সভাপতি মো. মহিউদ্দিন
সরকারি নির্দেশনা থাকলেও প্রায় সিএনজিচালিত অটোরিকশাই এ নিয়ম মানে না। চট্টগ্রাম মহানগরীতে নিবন্ধন পাওয়া ১৩ হাজার সিএনজি অটোরিকশার বেশিরভাগেরই মিটার নষ্ট। যেসব মিটার সচল রয়েছে, সেগুলোও ব্যবহার হয় না। নগরীর জিইসি মোড়ে ‘চট্টমেট্রো-থ-১৩-০০৬৬’ নম্বর অটোরিকশার চালক মুরাদ বলেন, ‘যাত্রীরা এখন মিটারে চড়েন না। তাই দেড় বছর ধরে আমার গাড়িতে মিটার নেই।’
একই এলাকায় কথা হয় ‘চট্টমেট্রো-থ-১২-৮০৫৩’ নম্বর অটোরিকশার চালক মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমার গাড়িতে মিটার আছে, কিন্তু প্লাগ খুলে রেখেছি। যাত্রীরা এখন মিটারে যেতে চায় না। মিটারে যেতে বললে বেশিরভাগ যাত্রীই গাড়িতে উঠতে চায় না। উল্টো রাগ করে।’
তিনি বলেন, ‘মিটারে গেলে আমাদের যাত্রীদের সঙ্গে কথা কাটাকাটি করতে হয় না। একটি সুন্দর সিস্টেম। কিন্তু কম গন্তব্যেও বেশি ভাড়া আসার কারণে যাত্রীরা মিটারে যেতে অনাগ্রহী।’
নগরীর কাজীর দেউড়ি মোড়ে কথা হয় ‘চট্টমেট্রো-থ-১২-৬৩৮২’ নম্বর অটোরিকশার চালক মো. আবদুল মোতালেবের সঙ্গে। প্রায় ৪৩ বছর ধরে ত্রি-হুইলার চালান তিনি। তিনি বলেন, ‘আমার গাড়িতে মিটার লাগানো রয়েছে। কিন্তু চলে না। চট্টগ্রামের কোনো সিএনজিচালিত অটোরিকশাতেই মিটার ব্যবহার হয় না। যাত্রীরা চড়েন না।’
বহদ্দার বাস টার্মিনাল এলাকায় ‘চট্টমেট্রো-থ-১২-৫২৯২’ নম্বর থ্রি-হুইলার চালক মনির আহমেদ বলেন, ‘গাড়িতে মিটার আছে। কিন্তু চলে না। যখন নতুন করে গাড়িগুলো রাস্তায় নেমেছে তখন থেকেই মিটারে চলে না।’
তবে যাত্রীদের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের অভিযোগ, মিটার নষ্ট থাকার কারণে চাইলেও মিটারে যাওয়া যায় না। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী আলাউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘কাজীর দেউড়ি থেকে আগ্রাবাদ হোটেল পর্যন্ত দূরত্ব সোয়া তিন কিলোমিটার। এই দূরত্বে যেতে নির্ধারিত ভাড়া অনুযায়ী ৬০-৭০ টাকার লাগার কথা। কিন্তু চালকরা ১২০-১৫০ টাকা দাবি করেন।’
চট্টগ্রাম মহানগরীতে ১৩ হাজার বাণিজ্যিক সিএনজিচালিত অটোরিকশা রয়েছে, যেগুলো ভাড়ায় চলে। আর আইন অনুযায়ী নগরীতে চলাচলকারী বাণিজ্যিক অটোরিকশাগুলোতে ভাড়া নির্ধারণের মিটার রয়েছে। যেসব গাড়ি মিটারে যাত্রী নেয় না, কিংবা মিটার অকার্যকর, সেসব বিষয়ে অভিযোগ পেলে আমরা তাৎক্ষণিক ওইসব অটোরিকশার বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেই।- সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) প্রকৌশলী আবদুল মান্নান মিয়া
চট্টগ্রামের লোহাগাড়া এলাকার ব্যবসায়ী আলী হোসেন বলেন, ‘আমরা বাসে নতুন ব্রিজ এসে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় আসতে চাইলে নিউ মার্কেট আসার জন্য ১২০-১৫০ টাকা ভাড়া দাবি করে। অথচ এই জায়গার দূরত্ব তিন কিলোমিটারের বেশি নয়। রোববার সকালে দেড়শ টাকার কমে আসতেই চায় না। মিটারের কথা বললে কোনো গাড়িতেই মিটার পাওয়া যায় না।’
নগরীর চান্দগাঁও আবাসিকের বাসিন্দা রতন চৌধুরী বলেন, ‘চান্দগাঁও এক নম্বর রোডের মাথা থেকে কাস্টমস হাউজ ১০ থেকে সোয়া ১০ কিলোমিটার দূরত্ব। নিয়ম অনুযায়ী ভাড়া আসার কথা ১৫০ টাকার মতো। কিন্তু চালকরা ২৫০-৩০০ টাকা ভাড়া দাবি করেন। অফিস টাইমে বাধ্য হয়েই ২৫০-২৭০ টাকা ভাড়ায় যেতে হয়। বৃহস্পতিবার বিকেল হলে অটোরিকশাগুলো আর কথাই বলেন না। যানজটের দোহাই দিয়ে বেশি ভাড়া দাবি করে।’
এদিকে সরকারিভাবে সিএনজিচালিত অটোরিকশার দিনপ্রতি মালিকের ভাড়া ৯০০ টাকা নির্ধারিত থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। চালক মনির আহমেদ বলেন, ‘আমাদের গ্যারেজে যতগুলো গাড়ি আছে সবগুলোর ভাড়া ৯৫০ টাকা। গাড়ি রাখার গ্যারেজের ভাড়াও দিতে হয় চালককে। এজন্য প্রতিদিন ৩০ টাকা করে দিতে হয়। আবার রাস্তায় বেশ কিছু অবৈধ গাড়ি আছে। যে কারণে আমাদের গাড়িতে আয় কমে গেছে। যাত্রীর জন্য রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে হয়। এতে গাড়ি বেশি রান হয়, কিন্তু আয় কম হয়।’
চট্টগ্রাম সাধারণ সিএনজি অটোরিকশা সাধারণ মালিক ঐক্য পরিষদ সভাপতি মো. মহিউদ্দিন বলন, ‘চট্টগ্রাম মহানগরীতে ১৩ হাজার সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলে। ২০১৮ সাল থেকে পুনঃস্থাপন হওয়ার কারণে প্রায় সবগুলো গাড়ি নতুন। সবগুলোতে মিটার সচল রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘নগরীতে আনুপাতিকহারে পরিবহনের সংখ্যা বেশি। অনেক সময় যানজট লেগে থাকে। নানা কারণে যাত্রীরাও মিটারে যেতে চান না। যে কারণে কন্ট্রাক্ট ভাড়ায় চলে। আবার ২০১৫ সালে বর্তমান ভাড়া সিলিং নির্ধারণ করা হয়। প্রথম দুই কিলোমিটার ৪০ টাকা, পরবর্তী কিলোমিটার প্রতি ১২ টাকা হারে ভাড়া ওঠে। এ ভাড়ায় এখন পোষায় না। এখন আগের চেয়ে খরচ অনেক বেড়ে গেছে।’
‘২০১৫ সালে যখন ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছিল, তখন সিএনজিচালিত অটোরিকশার একটি টায়ার ১৬৫০-১৭০০ টাকায় পাওয়া যেত। এখন একটি টায়ার ২৬৫০-২৭৫০ টাকা। ওই সময়ে এক লিটার মোবিল (ইঞ্জিন অয়েল) ১৮০ টাকায় বিক্রি হতো। এখন এক লিটার মোবিল ৩৯০ টাকার বেশি। গাড়ির পার্টসের দামও অনেক বেড়েছে। যে কারণে আগের ভাড়ায় অটোরিকশা চালানোও কষ্টসাধ্য। তারপরেও যাত্রীরা চাইলে গাড়িগুলো মিটারে ভাড়ায় যেতে বাধ্য।’
সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) প্রকৌশলী আবদুল মান্নান মিয়া বলেন, ‘চট্টগ্রাম মহানগরীতে ১৩ হাজার বাণিজ্যিক সিএনজিচালিত অটোরিকশা রয়েছে, যেগুলো ভাড়ায় চলে। আর আইন অনুযায়ী নগরীতে চলাচলকারী বাণিজ্যিক অটোরিকশাগুলোতে ভাড়া নির্ধারণের মিটার রয়েছে। যেসব গাড়ি মিটারে যাত্রী নেয় না, কিংবা মিটার অকার্যকর, সেসব বিষয়ে অভিযোগ পেলে আমরা তাৎক্ষণিক ওইসব অটোরিকশার বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেই।’
তবে যাত্রীদের সচেতন হওয়ার অনুরোধ জানিয়ে এ পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘যাত্রীরা যাতে মিটারে যান। কোনো চালক ভাড়া মিটারে যেতে না চাইলে কাছের যে কোনো ট্রাফিক সার্জেন্টকে বিষয়টি অবগত করা এবং অভিযোগ দেওয়া উচিত। আমাদের টিআই ও সার্জেন্টদের বিষয়গুলোতে নির্দেশনা দেওয়া আছে। যে কোনো যাত্রী বিষয়টি অবগত করলেই ওই অটোরিকশার বিরুদ্ধে মামলা দেওয়াসহ আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *