সর্বশেষসাধারণ

যে মেলা থেকে জোড়া ইলিশ নিয়ে বাড়ি ফেরেন ক্রেতারা

ভোর হতেই খোলা মাঠে চৌকি পেতে ডালায় ইলিশের পসরা সাজিয়ে বসেন মাছ বিক্রেতারা। তার পাশেই বসে সবজি, খেলনা আর নানা খাবারের দোকান। কনকনে শীত উপেক্ষা করে ক্রেতা বিক্রেতার হাঁক-ডাকে জমে ওঠে পুরো মেলা প্রাঙ্গণ। এদিন মেলায় আসা সবাই ঘরে ফেরেন জোড়া ইলিশ আর বেগুন নিয়ে।
শরীয়তপুরের মনোহর বাজার ও তার আশপাশের এলাকার শতবছরের ঐতিহ্য এটি। প্রতি বছরের মাঘ মাসের প্রথম দিনে মনোহর বাজার কালিমন্দির ও গরুর মাঠে বসে এই ঐতিহ্যবাহী জোড় মাছের মেলা।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মেলাটি কতো বছর আগে থেকে প্রচলন শুরু হয়েছে জানেন না কেউ। তবে ধারণা করা হয় অন্তত ২০০ বছরের পুরনো এ মেলা। প্রথম প্রথম মেলায় শুধু ইলিশ মাছ বিক্রি হলেও ধীরে ধীরে বিভিন্ন প্রজাতির মাছও মেলায় বিক্রি শুরু হয়। এরপর বিভিন্ন খাবারের দোকান ও খেলনার দোকান যুক্ত হয় মেলায়। পুরো বছরজুড়ে এ দিনটির জন্য অপেক্ষায় থাকেন এখানকার স্থানীয় হিন্দুধর্মের মানুষের পাশাপাশি মুসলিমরাও। মেলাটি ঘিরে আশপাশের বেশ কয়েকটি এলাকার মানুষের সমাগম ঘটে। মেলা উপলক্ষে এখানকার স্থানীয়রা তাদের আত্মীয়দের বাড়িতে নিমন্ত্রণ জানান।
এ মেলাকে ঘিরে বড়দের চাইতে ছোটদের আগ্রহ থাকে আরও বেশি। বড়দের সঙ্গে মেলায় গিয়ে মিষ্টির পাশাপাশি কিনে আনে রঙ-বেরঙের বেলুন আর খেলনা। খেলনা হাতে বাঁশিতে ফুঁকতে ফুঁকতে খুশিমনে বাড়ি ফেরে তারা৷
মঙ্গলবার (১৬ জানুয়ারি) সরেজমিনে মেলার মাঠে গিয়ে দেখা যায়, প্রধান সড়কের পাশে কালিমন্দিরের সামনে শতাধিক মাছ বিক্রেতারা টিনের ডালায় বিভিন্ন ধরনের মাছ সাজিয়ে বসেছেন৷ মাছের মধ্যে রয়েছে ইলিশ, রুই, কাতল, বোয়াল, আইড় ও কার্প। এছাড়াও মেলায় মাছের পাশাপাশি সবজি, মিষ্টি, খেলনা নিয়ে বসেছেন অন্যান্য দোকানীরা। ক্রেতারা আসছেন দামদর করে মাছ কিনে বাড়ি ফিরছেন। ছোট শিশুরাও খেলনার দোকানে ভিড় জমাচ্ছে।
প্রতিবছর মেলায় মাছ বিক্রি করেন মধ্যপাড়া এলাকার মনিষ দাস। তিনি বলেন, এই মেলাটি আমাদের দুইশো বছরের ঐতিহ্য। এই মেলায় সবাই আসে, ইলিশ মাছ কেনে। খুব আনন্দ উৎসবে পালন করা হয় দিনটি। হিন্দু আর মুসলমান নয়, সবাই এই মেলায় হাজির হয়ে মাছ কেনে। এটাকে পৌষ সংক্রান্তির জোড় মাছের মেলা বলা হয়।
দিপু দাস নামের এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, এই মেলায় ছোট বড় সবাই খুব আনন্দ সহকারে আসে। ছোটরা আমাদের সঙ্গে মেলায় আসে, খেলনা কিনে মিষ্টি খেয়ে বাড়ি ফেরে। আমরা সকলেই আজ জোড়া ইলিশ মাছ কিনে থাকি।
যে মেলা থেকে জোড়া ইলিশ নিয়ে বাড়ি ফেরেন ক্রেতারা
তবে ইলিশ মাছের দাম চড়া উল্লেখ করে মেলায় আসা ক্রেতা খোকন মন্ডল বলেন, প্রতিবছর আমরা এই একটি দিনের অপেক্ষায় থাকি ইলিশ মাছ কেনার জন্য। মেলায় দিন দিন ইলিশ মাছের দাম বেড়ে যাচ্ছে। গতবারের চাইতে এই বছর মাছের দাম আরও বেড়েছে। আমাদের সাধারণ মানুষের ক্রয়সীমার উপরে চলে যাচ্ছে।
মেলায় টেরাকোটা বিক্রি করা মোহাম্মদ চাঁনমিয়া বলেন, এই মেলা আমাদের বাপ-দাদার আমলের আগে থেকে চলে আসছে। আমি ১২ বছর ধরে মেলায় মাটির মালামাল বিক্রি করি। এই মেলা আমাদের ঐতিহ্য, আমরা এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে চাই।
যে মেলা থেকে জোড়া ইলিশ নিয়ে বাড়ি ফেরেন ক্রেতারা
মনোহর বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক আতিকুর রহমান মোল্লা বলেন, আমাদের অঞ্চলের দুইশো বছরের ঐতিহ্য এই জোড় মাছের মেলা। প্রতিবছর এই দিনে মনোহর বাজার মাঠে ভোরবেলা থেকেই ইলিশ মাছ বিক্রি করা হয়। হিন্দু মুসলিম সবাই মেলায় আসে মাছ কিনতে। এই মেলার মাধ্যমে আমাদের সম্প্রীতির বন্ধন আরও মজবুত হয়। এখানে সার্বিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা রাখা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *