জুলাই আন্দোলনের ঢাকা সিটি করপোরেশন ২৭নং ওয়ার্ড যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক হাফিজুর রহমান সুমন (৪১) হত্যা মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৫ জন অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছে পুলিশ।
একই মামলায় জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও বরিশাল-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম কিবরিয়া টিপুসহ ৬৩ জনের বিরুদ্ধ অভিযোগের প্রমাণ না পাওয়ায় অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এন্টি টেররিজম ইউনিটের ইনভেস্টিগেশন শাখার ইন্সপেক্টর মোহাম্মদ আতিকুর রহমান খাঁন সম্প্রতি আদালতে এ চার্জশিট দাখিল করেন।
চার্জশিটের অপর আসামিরা হলেন-আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত ওরফে এম এ আরাফাত, সাবেক পররাষ্টমন্ত্রী হাসান মাহমুদ, সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবীর নানক, হারুন অর রশিদ বিশ্বাস, মানাম আহমেদ রাতুল, মো. রায়হান ওরফে রাহেল, আব্দুর রহমান রাসেল, শহিদুল ইসলাম ওরফে রানা ওরফে লম্বু রানা, সোহাগ ওরফে রানা, আসাদুজ্জামান নুর ওরফে আসাদ, টাডি রাজু।
অব্যাহতি পাওয়া আসামিদের মধ্যে রয়েছেন-নজরুল ইসলাম, রায়হান, তারিক হাসান কাজল, কাজী কবির, মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম, মোহাম্মদ মকবুল চেয়ারম্যান, খন্দকার মোহাম্মদ সেলিম, ইফতেখারুল আলম হিরক, রাইসুল ইসলাম শাকিল, সাইফুল ইসলাম ওরফে রুম্মন, ফরিদুর রহমান খান ইরান, ইকরামুল কবির লাভলু, আসাদুজ্জামান দুলাল, জাবেদুর রহমান দুরান, রুম্মান বিন মাসুদ সাব্বির, মিন্টু চৌধুরী, মনোয়ার হোসেন সোহেল ওরফে লাদেন সোহেল, ফেরদৌস আলম শাহীন ওরফে কোট্টা শাহীন, রেজাউল করিম, আবুল হাসনাত দুলাল, নাবিদুর রহমান, কালী মনির ওরফে মনি সিং, আবু দায়েন মীর, তাজুল ইসলাম পলাশ ওরফে পিচ্চি পলাশ, মেহেদী হাসান মনির, মাহবুবুর রহমান মাহবুব, জ্যোতি প্রকাশ বড়ুয়া, শাহজাহান, তানজিন আহমেদ, দেলোয়ার হোসেন চুন্নু, অলি-উল্লাহ অলি, শাহজাহান মজুমদার, এসএম অলি উল্লাহ ওলি, আবুল, ফোরকান হোসেন, আসাদুজ্জামান আসাদ, সজিব, আবু সাদেক, সাব্বির আহমেদ লিটু, ফজলুল আহমেদ অপু, বাপ্পি, হাসিনুর রহমান, আসিফ হাসান, সিজার, সৈয়দ জিয়াউল আহসান, আবুল হোসেন, রুহুল আমিন, কাইয়ুম, আব্দুর রাজ্জাক, মাহে আলম, আব্দুল কুদ্দুস ওরফে নাডা কুদ্দুস, টুটুল, বি কে পাইক বাবু, এমএস কিবরিয়া মজুমদার, পাপ্পু, কালু বাবু, শাহ আলম, দেলোয়ার হোসেন সোহাগ ওরফে শ্যুটার সোহাগ, নাসির উদ্দিন সাগর, সাদ্দাম, সালাম।
এদিকে চার্জশিটে তদন্ত কর্মকর্তা আতিকুর রহমান বলেছেন,‘সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ছাত্ররা সারাদেশব্যাপী বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ডাক দেয়। আন্দোলন চলাকালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ১৪ জুলাই রাজাকারের বাচ্চা সম্বোধন করায় এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ কর্তৃক আন্দোলন দমনে ছাত্রলীগ যথেষ্ট মর্মে উসকানিমূলক বক্তব্য দিলে সারাদেশব্যাপী ছাত্র আন্দোলন বেগবান হয়।
শান্তিপূর্ণ যৌক্তিক আন্দোলনকে প্রতিহত করতে সাবেক আওয়ামী সরকার তাদের নেতাকর্মীদের সংঘবদ্ধ করে। আন্দোলনকারীদের যেকোনো মূল্যে প্রতিরোধ করার সরাসরি নির্দেশ দেয়। তাদের নির্দেশনা পেয়ে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন মারাত্মক অস্ত্র শস্ত্রে সজ্জিত হয়ে আন্দোলনকারীদের হত্যার মাধ্যমে প্রতিরোধ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। তখন দেশের আপামর জনতা আন্দোলনে শরিক হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় ৫ অগাস্ট হাফিজুর রহমান সুমন, তার ভাগ্নে আ.রহিমসহ অন্যান্যদের সাথে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চলাকালে শেখ হাসিনা পালিয়ে গেছে মর্মে খবর পেয়ে আনন্দ মিছিল শুরু করে। একপর্যায়ে বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে আনন্দ মিছিলে হামলা করতে শুরু করলে সুমন, আ. রহিমের সঙ্গে আব্দুর রহমান রাসেলের ধস্তাধস্তি শুরু হয়।
তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, সোহাগ ও রাসেল আ. রহিমের গলায় ফাঁস দিয়ে মারপিট করে। আ. রহিম তাদের কাছ থেকে নিজেকে ছোটাতে গিয়ে সোহাগের হাতে কামড় দেয়। পরবর্তীতে সোহাগ আ. রহিমের পিঠে চাকু দিয়ে কোপ দেয়। রাতুল, রাসেল, আসাদ ও লম্বু রানা ভিকটিম সুমনকে চাইনিজ কুড়াল দিয়ে মাথা ও বাম হাতে কোপ দেয় এবং রড দিয়ে মেরে শরীরের বিভিন্ন স্থানে আহত করে ড্রেনে ফেলে দেয়। ড্রেন থেকে উঠার পর রাসেল, আসাদ, লম্বু রানাসহ অন্যান্য আসামিরা সুমন ও আ. রহিমকে এলোপাতাড়ি মারপিট করে। তারা গুরুতর আহত হলে স্থানীয় লোকজন হাসপাতালে নিয়ে যায়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ১১ অগাস্ট তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। ১৬ অগাস্ট চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।
জুলাই আন্দোলনের শেষ দিন অর্থাৎ ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট দুপুর একটার দিকে শেরেবাংলা নগর মহিলা কলেজ সংলগ্ন এলাকায় আন্দোলনে অংশ নেন হাফিজুর রহমান সুমন। দুপুর দুইটা থেকে আড়াইটার দিকে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা আন্দোলনকারীদের উপর হামলা চালায়। গুরুতর আহন হন সুমন। আশপাশের লোকজন তাকে উদ্ধার করে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৬ অগাস্ট সন্ধ্যা ৬টার দিকে মারা যান সুমন।
সুমন নিহতের ঘটনায় তার স্ত্রী মোসা. বিথী খাতুন ২০২৪ সালের ৯ অক্টোবর শেরেবাংলা নগর থানায় শেখ হাসিনাসহ ৬৮ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা ২০/৩০ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন।







