শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকায় শীতের সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে যায় পাখির উপদ্রব। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকির পাশাপাশি উড়োজাহাজ চলাচলও বিঘ্নিত হয়। পাখির আঘাতের ফলে ফ্লাইট বাতিল, উড়োজাহাজের ইঞ্জিনের ক্ষতি কিংবা উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়ে প্রাণহানির মতো ঘটনাও ঘটে থাকে। এক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ উড়োজাহাজ উড্ডয়ন-অবতরণের এলাকা থেকে পাখি ও বন্যপ্রাণীদের দূরে রাখতে আধুনিক প্রচলিত প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেরও এ ধরনের সরঞ্জাম রয়েছে। কিন্তু এখানে পাখি তাড়াতে যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল এবং ঠিকমতো কাজ না করায় ঝুঁকি নিয়েই উড়োজাহাজ চলাচল করে। শাহজালালে বন্যপ্রাণী ও পাখি তাড়ানোর জন্য রয়েছে বার্ড মনিটরিং কন্ট্রোল সিস্টেম ও বার্ড শুটার। জানা গেছে, এ সিস্টেম ঠিকমতো কাজ করছে না। উপরন্তু রয়েছে বার্ড শুটারের স্বল্পতা। এ ছাড়া নিজস্ব বন্দুক না থাকায় পাখি তাড়াতে গিয়ে বিপাকে পড়ছে বেসরকারি বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)।
সিভিল এভিয়েশনের এটিএম বিভাগের পরিচালক একেএম সাইদুজ্জামান গত ৫ নভেম্বর সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড স্টোর ইউনিটের (সেমসু) নির্বাহী পরিচালককে চিঠি দিয়ে জানান, বিমান উড্ডয়নের রানওয়ে ও তৎসংলগ্ন এলাকায় পাখির উপস্থিতি ও উড্ডয়ন হুমকিস্বরূপ। পাখির উপদ্রব নিয়ন্ত্রণের জন্য ২০২২ সালে কর্তৃপক্ষ বার্ড মনিটরিং সিস্টেম স্থাপন করে। যন্ত্রটির বিভিন্ন যন্ত্রাংশের কার্যকারিতা আগের চেয়ে কমে যাওয়ায় পাখির উপদ্রব নিয়ন্ত্রণে যথাযথ ফল পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বিমানবন্দরে বিমান উড্ডয়ন অবতরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। চিঠিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।
বেবিচক ও শাহজালাল কর্তৃপক্ষও পাখি ও বন্যপ্রাণী তাড়াতে বার্ড শুটারের স্বল্পতা এবং বার্ড মনিটরিং কন্ট্রোল সিস্টেমে সমস্যার কথা স্বীকার করছেন। তারা বলছেন, বার্ড মনিটরিং কন্ট্রোল সিস্টেমে কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে। এর সমাধানে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে বলা হয়েছে। বিমানবাহিনীর বার্ড শুটার প্রতিদিন পাখি তাড়াতে কাজ করছে। এক্ষেত্রে বন্দুকের স্বল্পতা রয়েছে। এটা নিয়ে রয়েছে আইনি জটিলতাও। তা নিরসনে মন্ত্রণালয় কাজ করছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেবিচক সদস্য (এটিএম) নূর-ই-আলম বলেন, পাখির উপদ্রবের বিষয়ে গত কয়েক মাস ধরে আমরা তৎপর। আমাদের বার্ড শুটারের কিছুটা স্বল্পতা রয়েছে। বিমানবাহিনীর সহায়তায় আমরা এটা কভার করছি।
বিমানবাহিনীর বার্ড শুটার প্রতিদিনই আমাদের সহায়তা করছেন। তিনি আরও বলেন, পাখি তাড়ানোর জন্য আমাদের একটি বার্ড মনিটরিং কন্ট্রোল সিস্টেম আছে। সেখানে ক্যামেরা, গ্যাস কামান, লেজার, শব্দ তৈরি করা গাড়িসহ নানা যন্ত্রপাতি রয়েছে। বেবিচক চেয়ারম্যান রানওয়ের বিভিন্ন পয়েন্ট পরিদর্শন করে দেখেছেন সিস্টেমটি ঠিকমতো কাজ করছে কিনা। দুয়েকটা জিনিসে সমস্যা পাওয়া গেছে। ঠিকাদারকে এগুলো ঠিক করার জন্য ডাকা হয়েছে। তিনি বলেন, গত ২ সপ্তাহ আগে বার্ড মনিটরিং সিস্টেমটির ওয়ারেন্টি পিরিয়ড শেষ হয়ে গিয়েছিল। সেটা আরেক বছরের জন্য নবায়ন করা হয়েছে। তাদের সঙ্গে চেয়ারম্যান স্যার মিটিং করেছেন।
এ বিষয়ে অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, শাহজালালে বন্যপ্রাণী ও পাখির আঘাতে দুর্ঘটনা রোধে দ্রুত গ্যাস কামান যন্ত্র সচল করা এবং অত্যাধুনিক যন্ত্র স্থাপন করা জরুরি। বিশ্বের অন্যান্য দেশের বিমানবন্দরে যানবাহনের গতি নির্ণয় এবং মনিটরিং করা হয় নিয়মিত। শাহজালালে এখনও এ প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু না-হওয়াটা অবাক করার মতোই।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শাহজালাল বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এসএম রাগীব সামাদ জানান, এখানে বন্যপ্রাণী তাড়ানোর সিস্টেমটা চালু আছে। আমরা বন্যপ্রাণী তাড়ানোর বিষয়ে এর মধ্যে সভাও করেছি। নতুন সিস্টেম কেনার পরিকল্পনা করেছি। বার্ড মনিটরিং সিস্টেমটায় কিছুটা সমস্যা দেখা দিয়েছে। এর সমাধানে ইতোমধ্যে ঠিকাদারের সঙ্গে যোগোযোগ করা হয়েছে। দ্রুত সমাধান হয়ে যাবে, বলেন তিনি।
স্ট্রংরুম থেকে উদ্ধার আরও ৩৬ অস্ত্র

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আমদানি কার্গো হাউসের স্ট্রংরুমের ভল্টে পাওয়া গেছে আরও ৩৬টি অস্ত্র। তিনটি কার্টন থেকে উদ্ধার করা হয় এসব অস্ত্র। গত বুধবার স্ট্রংরুমের আমদানি পণ্যের তালিকা করতে গিয়ে অস্ত্রের চালানটি পাওয়া যায়। গত ১৮ অক্টোবর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে কার্গো হাউসে। এরপর কার্গো হাউসের স্ট্রংরুমের পণ্যের তালিকা তৈরি করতে ১৭ নভেম্বর কাস্টমস ও বিমানের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে ২০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে বিমান কর্তৃপক্ষ। কমিটি স্ট্রংরুম তল্লাশি করে এসব অস্ত্রের সন্ধান পায়।অস্ত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে ১৬টি পিস্তল, ২৬টি পিস্তলের ম্যাগাজিন, ২০টি শটগান, ২০টি শটগান ম্যাগাজিন, ২০টি প্লাস্টিক পাম্প অ্যাসেম্বলি ও ৮০টি ব্যারেল ক্যাপ। কমিটিকে তিন কর্মদিবসের মধ্যে সার্বিক অবস্থা জানিয়ে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কার্গো হাউসে অগ্নিকাণ্ডের পর স্ট্রংরুম থেকে মালামাল হারানোর অভিযোগ ওঠে। প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল, আগুনে বহু মালামাল পুড়ে গেছে। বাস্তবে দেখা যায়, ভল্টে আগুন লাগেনি; ভল্ট ছিল ভাঙা এবং সেখান থেকে অস্ত্র গায়েবের ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়। অগ্নিকাণ্ডের পরপরই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস জরুরি অফিস আদেশ দিয়ে অবশিষ্ট মালামালের অবস্থান নিশ্চিত করা ও স্ট্রংরুমে রাখা সামগ্রী তিন কর্মদিবসের মধ্যে জরুরি ইনভেন্ট্রির মাধ্যমে যাচাইয়ের নির্দেশ দেয়। তদন্ত কমিটি স্ট্রংরুমে লুকানো অবস্থায় তিনটি কার্টন পায়। সেই কার্টনে ওই অস্ত্রগুলো মেলে। পরে এসব অস্ত্র পুলিশের হেফাজতে দেওয়া হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিমানের একজন কর্মকর্তা বলেন, ইনভেন্ট্রি প্রক্রিয়া শেষে বোঝা যাবে কী পরিমাণ অস্ত্রসহ অন্য মালামাল খোয়া গেছে। এর আগে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অগ্নিকাণ্ডের পর কার্গো হাউসের স্ট্রং রুমের ভাঙা ভল্ট থেকে পাওয়া যায় ৮০টি অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র, বিপুল সংখ্যক ম্যাগাজিন ও কার্তুজ। এসব আগ্নেয়াস্ত্র, গুলিসহ অন্য মালামাল পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়।
অগ্নিকাণ্ডের পর গত ২৮ অক্টোবর সকালে স্ট্রংরুমের ভল্টের তালা ভেঙে অস্ত্রসহ মূল্যবান পণ্য চুরির ঘটনা সামনে আসে। পরে বিমানবন্দর থানা পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থা অকুস্থলে উপস্থিত হয়ে পুরো এলাকার নিরাপত্তা







