কিছু ব্যাংকের অনিয়ম ও আর্থিক সংকটের মধ্যেও সামগ্রিকভাবে ব্যাংক খাতে আমানত ও উদ্বৃত্ত তারল্য বাড়ছে। আপাত বিরোধী মনে হলেও একই সঙ্গে মানুষের মধ্যে নগদ টাকা হাতে রাখার প্রবণতাও বেড়েছে। মূলত বেসরকারি বিনিয়োগে গতি না থাকা এবং এর প্রভাবে উদ্যোক্তাদের ঋণ গ্রহণে আগ্রহ কমায় ব্যাংকে আমানত ও উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ বেড়েছে। সর্বশেষ জুন মাসে ব্যাংকগুলোতে আমানত বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এ সময় ব্যাংকগুলোতে উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৬৬ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে একই সময়ে ব্যাংকের বাইরে মানুষের হাতে নগদ অর্থ বেড়েছে প্রায় দুই হাজার ৬০০ কোটি টাকা। কিছু ব্যাংকের অনিয়ম ও দুর্বলতার কারণে মানুষের মধ্যে নগদ অর্থ তুলে হাতে রাখার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
এ ধরনের পরিস্থিতিকে অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, এর ফলে নতুন পুঁজি উৎপাদনে ব্যবহার না হওয়ায় কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধিতে প্রভাব পড়বে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানো ও দুর্বল ব্যাংকগুলো নিয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই সংকট আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন আমাদের সময়কে বলেন, বেসরকারি বিনিয়োগ কমায় ব্যাংকে আমানত ও উদ্বৃত্ত তারল্য বেড়েছে বলে মনে হয়। আসলে দেশে বিনিয়োগের জন্য যে পরিবেশ দরকার তা নেই। রাজনৈতিক দিক থেকে বড় অনিশ্চয়তা রয়েছে। এক পরিসংখ্যানে দেখলাম গত ৫ আগস্টের পর থেকে দেশে ১৭৫টি আন্দোলন হয়েছে। এ রকম পরিস্থিতিতে কি কেউ বিনিয়োগে সাহস দেখাবে। তিনি আরও বলেন, বিনিয়োগের অন্যতম পূর্বশর্ত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। হয়তো ধীরে ধীরে আমরা সেই দিকে যেতে পারব। নির্বাচন নিয়ে অস্পষ্টতা দূর হওয়ায় ইতোমধ্যে রাজনৈতিক দিক থেকে এই অনিশ্চয়তা কাটতে শুরু করেছে। তবে নির্বাচনটা সুষ্ঠু না হওয়া পর্যন্ত এই অনিশ্চয়তা একেবারে কাটবে না।
দেশে মহামারী করোনার আঘাত আসার পর থেকেই বেসরকারি বিনিয়োগে এক প্রকার ধীরগতি বিরাজ করছিল। এরপর আসে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এর সঙ্গে যোগ হয় গত বছরের জুলাই অস্থিরতার প্রভাব। গত ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, সুদের হার বৃদ্ধিসহ নানা কারণে ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। ব্যাংক খাত সংস্কারে পদক্ষেপ ও খেলাপি বৃদ্ধির কারণে ব্যাংকগুলো বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে এখন অনেক বেশি সতর্ক। এর পরিবর্তে তারা সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে অর্থ বিনিয়োগ করাকে তুলনামূলক নিরাপদ ও লাভজনক বলে মনে করছে। ফলে সার্বিক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি আবদুল আউয়াল মিন্টু আমাদের সময়কে বলেন, বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হলে সবার আগে রাজনীতি ঠিক করতে হবে। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা যদি থাকে তাহলে বিনিয়োগ হবে না। আবার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যদি ঠিক না হয় তাহলে ব্যবসা-বাণিজ্য চালানো অসম্ভব। এর মধ্যে ঋণের সুদের হার অনেক বেড়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের সমস্যা আছে। তাই দেশকে এগিয়ে নিতে বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।
বিনিয়োগে খরা চলছে : নতুন বিনিয়োগের অন্যতম উপাদান শিল্পের মূলধনী যন্ত্রপাতি। গত তিন অর্থবছর ধরে এর আমদানি কমছে। সর্বশেষ গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি কমেছে প্রায় ২৫ শতাংশ। এ যন্ত্রপাতির আমদানি কমার অর্থÑ দেশে নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ কমেছে। এর প্রভাবে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধিও তলানিতে পৌঁছেছে। গত জুনে বেসরকারি খাতে ঋণ স্থিতি বেড়ে হয়েছে ১৭ লাখ ৪৭ হাজার ৬৭৫
কোটি টাকা। গত এক বছরে ঋণ বেড়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ৪৪৭ কোটি টাকা। প্রবৃদ্ধির হার মাত্র ৬ দশমিক ৪০ শতাংশ। এটি ইতিহাসে সর্বনি¤œ। এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি নেমেছিল ৬ দশমিক ৮২ শতাংশ। অথচ করোনা মহামারী সময়েও এই প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের ওপরে ছিল।
ব্যাংক এশিয়ার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আরফান আলী বলেন, সরকার পরিবর্তনের পর ব্যাংক খাতে সংকট নিরসনে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি ছিল অনিশ্চয়তার মধ্যে। এতে বিনিয়োগ কমে যায় এবং ঋণ নেওয়ার আগ্রহও হ্রাস পায়। ফলে ব্যাংকে বাড়ে অতিরিক্ত তারল্য।
বাড়ছে আমানত, জমছে তারল্য : গত জুন মাস শেষে দেশের ব্যাংক খাতে আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৭৭ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা। আগের মাসে (গত মে) যার পরিমাণ ছিল ১৮ লাখ ৩২ হাজার ৬৫ টাকা। আর গত বছরের জুনে ছিল ১৭ লাখ ৪২ হাজার ২২৪ কোটি টাকা। ফলে এক মাসের ব্যবধানে ব্যাংক খাতে আমানত বেড়েছে প্রায় ৪৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বা ২ দশমিক ৪৪ শতাংশ। আর এক বছরের ব্যবধানে বেড়েছে ১ লাখ ৩৫ হাজার ৩৪১ কোটি টাকা বা ৭ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
অন্যদিকে গত জুন শেষে ব্যাংকগুলোর মোট তারল্যের পরিমাণ ছিল পাঁচ লাখ ৭০ হাজার ৬১১ কোটি টাকা। অথচ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে বিধিবদ্ধ জমা (এসএলআর) ও নগদ জমা সংরক্ষণ (সিআরআর) বাবদ ন্যূনতম তারল্য রাখার প্রয়োজন ছিল তিন লাখ চার হাজার ৮৪৪ কোটি টাকা। সেই হিসাবে উদ্বৃত্ত তারল্যে পরিমাণ দাঁড়ায় দুই লাখ ৬৫ হাজার ৭৬৭ কোটি টাকা। এর আগের বছরের জুনে ব্যাংক খাতে মোট তারল্য ছিল চার লাখ ৭৩ হাজার ৪০৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংক খাতে তারল্য বেড়েছে প্রায় ৯৭ হাজার ২০৭ কোটি টাকা।
নগদ টাকা হাতে রাখার প্রবণতাও কমেনি : আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক খাতে নানা অনিয়ম ও লুটপাট হয়, যা নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সামনে আসে। এতে বেশ কয়েকটি ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থার সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছিল। ফলে সেসব ব্যাংক থেকে টাকা তোলার চাপ ব্যাপকহারে বেড়ে গিয়েছিল। তবে গত সেপ্টেম্বর মাস থেকে সেই প্রবণতা কমতে থাকে এবং হাতে রাখা টাকা ব্যাংকে ফিরতে শুরু করে। তবে দুই ঈদের আগে (মার্চ এবং মে) বাড়তি খরচে জন্য নগদ টাকা তোলার প্রবণতা বেড়ে যায়। গত জুন মাসেও সেই প্রবণতা অব্যাহত ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত জুন মাস শেষে ব্যাংকের বাইরে মানুষের হাতে নগদ অর্থের স্থিতি বেড়ে হয়েছে ২ লাখ ৯৬ হাজার ৪৫১ কোটি টাকা। এক মাসে আগে গত মে মাসে ছিল ২ লাখ ৯৩ হাজার ৭৭৮ কোটি টাকা। ফলে এক মাসে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ বেড়েছে প্রায় ২ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা। এর আগের মাস মে-তে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ বেড়েছিল ১৬ হাজার ৪১২ কোটি টাকা বা ৫ দশমিক ৯২ শতাংশ।
কোরবানির ঈদে বাড়তি কেনাকাটা ও দুর্বল ব্যাংক একীভূতকরণের ঘোষণায় এ দুই মাসে মানুষের হাতে নগদ টাকা বেড়েছে বলে জানান ব্যাংকাররা। এর আগে রোজার ঈদের কারণে মার্চ মাসে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ বেড়েছিল প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা। তার আগে টানা ছয় মাস ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থের পরিমাণ কমেছিল। তবে ওই কমার পরিমাণ ছিল খুবই কম। ওই ছয় মাসে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থের পরিরিমাণ কমেছিল মাত্র ২০ হাজার ৯৩৯ কোটি টাকা।







