যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে অভিষেকের পর থেকে বিশ্বরাজনীতি এক অভূতপূর্ব অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তার উগ্র জাতীয়তাবাদী ‘আগে আমেরিকা’নীতি বর্তমান বিশ্বব্যবস্থাকে আমূল বদলে দিতে চলেছে। এক বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর এটি স্পষ্ট, গত এক শতাব্দীর প্রতিষ্ঠিত কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও আন্তর্জাতিক আইন এখন চরম ঝুঁঁকির মুখে।
আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও গ্রিনল্যান্ড ইস্যু
ট্রাম্পের এই মেয়াদের সবচেয়ে বিতর্কিত ও বিস্ময়কর পদক্ষেপ হলো বন্ধুপ্রতিম দেশ ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড দখলের বা ক্রয়ের হুমকি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধপরবর্তী সময়ে কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রপ্রধান কর্তৃক অন্য একটি সার্বভৌম অঞ্চলের ভূমি দখলের এমন আকাক্সক্ষা নজিরবিহীন। এটি কেবল ডেনমার্কের অখণ্ডতা নয়, বরং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তিÑ ‘সার্বভৌম সমতা’কে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে। কংগ্রেসের মাধ্যমে ‘গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণ আইন’ উত্থাপন প্রমাণ করে যে, এটি কোনো সাময়িক উক্তি নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত ভূরাজনৈতিক উচ্চাকাক্সক্ষা।
আন্তর্জাতিক জোট ও নিরাপত্তার সংকট
ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ন্যাটোর মতো দীর্ঘস্থায়ী সামরিক জোট। ট্রাম্পের ‘জোর যার মুল্লুক তার’নীতি এবং মিত্রদের চেয়ে রাশিয়ার ভয়কে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রনের ভাষায়, এটি এমন এক বিশ্ব, যেখানে ‘সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাকাক্সক্ষা’ আন্তর্জাতিক আইনের জায়গা দখল করছে। ট্রাম্পের খামখেয়ালি অবস্থানÑ কখনও রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ হওয়া, আবার কখনও ইউক্রেনের পক্ষে যাওয়াÑ ইউরোপের সম্মিলিত নিরাপত্তাকে ভঙ্গুর করে দিয়েছে।
কূটনীতি ও ‘ডনরো ডকট্রিন’
ট্রাম্পের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতিকে বিশেষজ্ঞরা ‘ডনরো ডকট্রিন’ হিসেবে অভিহিত করছেন। এটি মূলত লাতিন আমেরিকা ও তার বাইরের অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের নীতি। ঐতিহাসিক মনরো ডকট্রিনের ‘এম’-এর বদলে ‘ডোনাল্ড’ নামের ‘ডি’ নিয়ে বলা হচ্ছে ডনরো ডকট্রিন। মধ্যপ্রাচ্যে গাজায় সাময়িক যুদ্ধবিরতি অর্জনে তার ব্যক্তিগত প্রভাব কাজ করলেও, দীর্ঘমেয়াদি শান্তির চেয়ে শক্তি প্রদর্শনই সেখানে প্রাধান্য পেয়েছে। তার শাসনব্যবস্থাকে ‘মাফিয়া স্টাইল’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন অনেকে, যেখানে আদর্শ বা মূল্যবোধের চেয়ে ‘দেওয়া-নেওয়া’ ও ‘ব্যক্তিগত আনুগত্য’ মুখ্য।
অর্থনৈতিক যুদ্ধ ও মিত্রদের প্রতিক্রিয়া
বাণিজ্যযুদ্ধের হুমকি এখন কেবল চীন বা রাশিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো ঘনিষ্ঠ মিত্রদের দিকেও প্রসারিত। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির ‘ডলারের জবাবে ডলার’ নীতি বা ফ্রান্সের ‘ট্রেড বাজুকা’ চালুর ঘোষণা ইঙ্গিত দেয় যে, বিশ্ব এক চরম মেরুকরণের দিকে যাচ্ছে। ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডে বিশ্বব্যবস্থায় একটি বড় ধরনের ‘ভাঙন’ পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এখন দেখার বিষয়, ট্রাম্পের বাকি তিনটি বছর কীভাবে সামলা দেয় বিশ্ব।







