দেশের অর্থনীতি বিনিয়োগ সংকটে রয়েছে। নতুন বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগপ্রস্তাব নিবন্ধনের হার নিম্নমুখী। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে আইনশৃঙ্খলার অবনতিতে শত শত কারখানা বন্ধ হয়েছে। লাখ লাখ মানুষ হারিয়েছেন কর্মসংস্থান।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বিনিয়োগ ছাড়া অর্থনীতি গতি পাবে না। মূলত আস্থা ও নিরপত্তাহীনতায় স্থবির হয়ে পড়েছে বিনিয়োগ। ফলে থমকে আছে কর্মসংস্থান। ব্যাংকঋণের চড়া সুদে নাভিশ্বাস উদ্যোক্তাদের। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও নাজুক। উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট এবং উচ্চ সুদের কারণে বিনিয়োগ হচ্ছে না। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরের মাশুল বেড়েছে। অগ্রিম আয়কর ও উৎসে করের চাপে পিষ্ট হচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলো। দেশে ব্যবসার পরিবেশের তেমন কোনো উন্নতি না হলেও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ দিন দিন বাড়ছে। ফলে বিদ্যমান ব্যবসা টেকাতেই হিমশিম খাচ্ছেন তারা।
জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকে অর্থনৈতিক খাতে কিছুটা স্থিতিশীলতা এলেও প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আনায় পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। এফডিআই বাড়াতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের (এনআরবি) নগদ প্রণোদনা দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রবাসীরা যদি দেশে এফডিআই আনতে সহায়তা করেন, তাহলে বিনিয়োগের একটি নির্দিষ্ট অংশ তারা নগদ প্রণোদনা হিসেবে পাবেন। অনুমোদিত প্রস্তাব অনুযায়ী কোনো প্রবাসী বাংলাদেশি যদি দেশে ইকুইটি বিনিয়োগ আনতে ভূমিকা রাখেন, তাহলে সেই বিনিয়োগের ওপর ১.২৫ শতাংশ নগদ প্রণোদনা পাবেন। এটি প্রবাসীদের জন্য একটি স্বীকৃতিস্বরূপ প্রণোদনা, যা প্রবাসী আয়ের বিদ্যমান ক্যাশ ইনসেনটিভ ব্যবস্থার মতোই কাজ করবে। এ ছাড়া বিদেশে বিডার অফিস স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রথম পর্যায়ে চীনে অফিস খোলা হবে। এরপর দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি দেশে অফিস স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
২০২৩-২৪ অর্থবছর জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের হার ছিল ২৩.৫১ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সেটি ২২.৪৮ শতাংশে নেমেছে। আলোচ্য বছরে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি হয়েছিল ২৮১ কোটি ডলারের, যা আগের বছরের তুলনায় ১৯ শতাংশ কম। বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহও ছয় মাস ধরে ৭ শতাংশের নিচে।
ব্যবসায়ীরা জানান, বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নতির জন্য গত দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকার বড় কোনো সংস্কার করতে পারেনি। তাছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সন্তোষজনক পর্যায়ে উন্নতি না হওয়া, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, উচ্চ সুদহারসহ বিভিন্ন কারণে চলমান ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি নেই।
রাষ্ট্রায়ত্ত একমাত্র বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ আমাদের সময়কে বলেন, বিনিয়োগ ছাড়া কোনো দেশের অর্থনীতি গতিশীল হতে পারে না। বিনিয়োগ বাড়েনি। তবে বেশকিছু সংস্কারকাজ হয়েছে। ফলে নতুন নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে সরাসরি বিদেশি এবং দেশি বিনিয়োগে গতি আসবে। নতুন নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। বাড়বে রাজস্ব আহরণ এবং কমবে দারিদ্র্য। মানুষ রাজনৈতিক সরকারের অপেক্ষায় আছে। রাজনৈতিক সরকার এলে বিনিয়োগে গতি পাবে।
জানা গেছে, প্রতিযোগী দেশগুলোর চেয়ে এফডিআই আনায় পিছিয়ে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ না পারলেও প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ এফডিআই পাচ্ছে ভারত, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়া। এমনকি পাকিস্তানও বাংলাদেশের চেয়ে বেশি পাচ্ছে। যদিও দুই বছর আগেও এফডিআই আনায় দেশটি বাংলাদেশের পেছনে ছিল।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ৬৬ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব বিডায় নিবন্ধন হয়, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫৮ শতাংশ কম। করোনাকালে অর্থাৎ ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধন হয়েছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৪ হাজার কোটি টাকার বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধন হয়েছে। তার আগের বছর ৩২ হাজার কোটি টাকার নিবন্ধন হয়েছিল। তার মানে বিদায়ী অর্থবছরে বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব কমেছে প্রায় ৫৬ শতাংশ। অন্যদিকে গত অর্থবছরে ৫২ হাজার কোটি টাকার দেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধন হয়েছে। তার আগের বছর নিবন্ধন হয়েছিল ১ লাখ ২৪ হাজার কোটি টাকার দেশি বিনিয়োগ।
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ১.৫৩ বিলিয়ন ডলারের এফডিআই পেয়েছে। সে বছর ভারত ২৭ বিলিয়ন, ইন্দোনেশিয়া ২১ ও ভিয়েতনাম ২০ বিলিয়ন ডলারের এফডিআই এনেছে। দেশগুলোর মধ্যে ভিয়েতনামের এফডিআই তিন বছর ধরে বেড়েছে। এদিকে ২০২২ সালে বাংলাদেশ এফডিআই পেয়েছিল ১.৬৩ বিলিয়ন ডলার। আর পাকিস্তান ১.৪৬ বিলিয়ন ডলার। পরের বছরই বাংলাদেশকে টপকে যায় পাকিস্তান। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ দেড় বিলিয়ন ডলারের এফডিআই পেয়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তান এফডিআই পেয়েছে বাংলাদেশের চেয়ে ১ বিলিয়ন ডলার বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৪২ কোটি ডলারের নিট বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা ১৯ শতাংশ বেড়ে ১৬৯ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। মূলত বিদেশি কোম্পানির বিদ্যমান ব্যবসা থেকে অর্জিত মুনাফা আবার বিনিয়োগ এবং সহযোগী কোম্পানি থেকে ঋণ নেওয়া বৃদ্ধির কারণে নিট এফডিআই বেড়েছে। অন্যদিকে নতুন বিনিয়োগ বা ইকুইটি ক্যাপিটাল কমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৫৫ কোটি ডলারের নতুন বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। নতুন এ বিনিয়োগ তার আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৭ শতাংশ কম। করোনাকালে ২০২০-২১ অর্থবছরে নতুন বিনিয়োগ এসেছিল ৭২ কোটি ডলার। পরের বছর তা বেড়ে হয় ১১৪ কোটি ডলার। ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নতুন বিনিয়োগ আসে যথাক্রমে ৭১ ও ৬৭ কোটি ডলার।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আইনুল ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সুদের উচ্চহার এবং আর্থিক খাতের দীর্ঘমেয়াদি সুশাসনের অভাব এক বিষচক্র তৈরি করেছে। বিশেষ করে বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের (এফডিআই) ক্ষেত্রে যে চিত্রটি ফুটে উঠেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।





