বিএনপির বাক্সেই যাচ্ছে হেফাজতের ভোট

২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার শাপলা চত্বরে সমাবেশের মাধ্যমে পরিচিতি পাওয়া হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ নিজেদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন বলে দাবি করে আসছে। সে কারণেই কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে জোটে না যাওয়ার অবস্থানে রয়েছে সংগঠনটি। তবে ভোটের রাজনীতিতে তাদের অবস্থান ও নির্দেশনা ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

ইসলামের নামে ভোট চাওয়া হলেও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীকে ভোট দিতে নারাজ হেফাজতে ইসলাম অনুসারীরা। সংগঠনের আমিরের স্পষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী তারা ভোট দেবেন বলে জানিয়েছেন নেতাকর্মীরা। প্রকাশ্যেই জামায়াতের প্রার্থীকে ভোট না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী। এতে করে হেফাজতের ভোট বিএনপির ভোটব্যাংকেই যাবে- এমন ধারণা রাজনৈতিক মহলে জোরালো হচ্ছে।

জামায়াতে ইসলামীকে ভোট না দেওয়ার পেছনের যুক্তি তুলে ধরে আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী বলেন, ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আর সহিহ ইসলাম এক নয়। জামায়াতের ইসলাম আর আমাদের ইসলাম এক নয়। আমরা মদিনার ইসলাম পালন করি, তারা মওদুদির ইসলাম পালন করে। মওদুদির ফেতনা কাদিয়ানিদের ফেতনার চেয়েও ভয়ংকর। কারণ কাদিয়ানিজম ইসলামের বাইরের ফেতনা- যা সহজে চেনা যায়। কিন্তু মওদুদিজম ইসলামের ঘরের ফেতনা, যার ভয়াবহতা সবাই ধরতে পারে না।’

এদিকে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব আল্লামা মামুনুল হক জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট বেঁধেছেন। তবে এটিকে তার একান্ত ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত বলে জানিয়েছে সংগঠনটি। হেফাজতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শুরু থেকেই সংগঠনটি অরাজনৈতিক এবং মামুনুল হকসহ যারা রাজনৈতিক দলে যুক্ত হয়েছেন- এটি সংগঠনের সিদ্ধান্ত নয়।

হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা জানান, হেফাজতের আমিরের নির্দেশনাই চূড়ান্ত। যারা সংগঠনের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে রাজনৈতিক জোটে যুক্ত হয়েছেন, তাদের সঙ্গে হেফাজতের কোনো সাংগঠনিক সম্পর্ক নেই। আমিরের সিদ্ধান্ত ৯৯ শতাংশ নেতাকর্মী মেনে নিয়েছেন বলেও দাবি করেন তারা।

হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র আল্লামা আজিজুল হক ইসলামাবাদী আমাদের সময়কে বলেন, ‘আমাদের আমির সংগঠনের অবস্থান খুব পরিষ্কার করে দিয়েছেন। তার আদেশ সংগঠন ও কওমি শীর্ষ আলেমরা মেনে নিয়েছেন। আমিরের নির্দেশনা অনুযায়ী সারা দেশে আমাদের অবস্থান জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংগঠনের এক নেতা বলেন, হেফাজতে ইসলামের ভোট ধানের শীষের পক্ষেই যাবে। সংগঠনের আমির এরই মধ্যে ধানের শীষের প্রার্থীর প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। আকিদাগত কারণেই হেফাজতের ভোট জামায়াতকে দেওয়া হবে না। মামুনুল হকসহ ১০-১২ জন নেতা জামায়াত জোটের সঙ্গে কাজ করলেও বাকি ৯৯ শতাংশ নেতাকর্মী আমিরের সিদ্ধান্তের পক্ষে রয়েছেন।

জামায়াতকে ভোট দেওয়া হারাম

বিএনপি প্রার্থীকে সমর্থন জানিয়ে জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে ‘জিহাদের’ ঘোষণা দিয়েছেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী। তিনি বলেন, জামায়াতকে ভোট দেওয়া হারাম- কোনোভাবেই জায়েজ নয়। তার এই ঘোষণার পর দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার রাতে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাজীরহাট বড় মাদ্রাসায় বুখারি শরিফ খতম উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে হেফাজত আমির জামায়াতবিরোধী বক্তব্য দেন। সেখানে উপস্থিত বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী মো. সরোয়ার আলমগীরকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানান তিনি। জামায়াতের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াকে ধর্মীয় কর্তব্য হিসেবেও উল্লেখ করেন হেফাজত আমির।

আল্লামা বাবুনগরী বলেন, ‘আমি ইলেকশন-টিলেকশন বুঝি না; এটা জিহাদ। আমরা যদি কঠোরভাবে ভোট থেকে তাদের বঞ্চিত করতে না পারি এবং তারা ক্ষমতায় আসে, তা হলে ইসলামের গোড়া কেটে ফেলবে, মুসলমানের গোড়া কেটে দেবে।’

পাশে থাকা ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী মো. সরোয়ার আলমগীরকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘আমরা ওনাকে ভোট দিচ্ছি তা নয়; ওনাকে সামনে রেখে ওনার মাধ্যমে জিহাদ করছি- মওদুদির জামায়াতের বিরুদ্ধে।’

৫ আগস্টের পর বিভিন্ন মাহফিল, সভা ও সেমিনারেও ধারাবাহিকভাবে জামায়াতবিরোধী বক্তব্য দিয়ে আসছেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির। জামায়াতের জোট ছেড়ে দেওয়ায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও দলটির আমির মুফতি সৈয়দ রেজাউল করীমকে অভিনন্দনও জানান তিনি। গত ২১ জানুয়ারি সংগঠনের পক্ষ থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ! জামায়াতের খপ্পর থেকে বের হয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এককভাবে রাজনৈতিক পথচলা শুরু করতে পারায় বিশেষ মুবারকবাদ জানাই।’

  • Related Posts

    চট্টগ্রামে চার আসনে লড়াই ধানের শীষের ৪ তরুণের

    ধানের শীষ প্রতীকে বিজয়ী হয়ে মন্ত্রী হয়েছিলেন বিএনপি নেতা আবদুল্লাহ আল নোমান। দক্ষিণ চট্টগ্রামের উপকূলীয় উপজেলা বাঁশখালী থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে মন্ত্রী হয়েছিলেন জাফরুল ইসলাম চৌধুরী। একইভাবে চট্টগ্রামের রাউজান,…

    জামায়াত আমিরের জনসভা, কানায় কানায় পূর্ণ মাঠ

    বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের জনসভাকে ঘিরে পটুয়াখালীর বাউফলে জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে বাউফল পাবলিক মাঠ। জনসভা শুরুর আগেই জামায়াতের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের উপস্থিতিতে মাঠটি কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *