ঘরের কিশোর ছেলেটি তার ফুটবল বা ক্রিকেট ব্যাট হাতে বিকালবেলায় মাঠে খেলতে যাচ্ছে। খুবই সাধারণ একটি দৃশ্য এটি। কিন্তু বাংলাদেশে মেয়েরাও কি এভাবেই খেলার সুযোগ পায়? এর উত্তর হচ্ছে- ‘না’। বয়ঃসন্ধিকালে পৌঁছতে না পৌঁছতেই মেয়েদের প্রায় বন্দি করে ফেলা হয়। রক্ষণশীল সমাজে মেয়েদের খেলাধুলা করাকে নেতিবাচক চোখে দেখা হয়ে থাকে। অথচ শারীরিক, মানসিক বিকাশ ও সুস্থ-সুন্দর জীবনের জন্য নারী-পুরুষ-শিশু-বৃদ্ধ-নির্বিশেষে সবারই খেলাধুলা কিংবা শরীর চর্চা করা অত্যন্ত দরকার। কিন্তু নারীর খেলাধুলাচর্চার জন্য নেই কোনো উপযুক্ত ও নিরাপদ মাঠ। তার পরও মেয়েরা খেলতে এলে প্রথমেই বাধার শিকার হয় পোশাক বা জার্সি নিয়ে তীর্যক মন্তব্যে। অথচ প্রতিদিনের আটপৌরে শাড়ি, বোরকা, সালোয়ার-কামিজ, স্কার্ট বা জিন্স ইত্যাদি খেলার জন্য মোটেও উপযুক্ত নয়। এমনই নানা কারণে নারীরা খেলাধুলা ও শরীরচর্চা থেকে পিছিয়ে থাকে। এত প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও দেশের নারী খেলোয়াড়রা ঠিকই খেলে যাচ্ছেন এবং দেশের পতাকাকে শীর্ষে তুলে ধরছেন বারবার। এমনকি পুরুষ খেলোয়াড়দের তুলনায় নারী দলই বারবার দেশের নাম উজ্জ্বল করেছে। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে গত এক দশকে সবচেয়ে বড় সাফল্যগুলো এসেছে নারীদের হাত ধরে। ফুটবল, ক্রিকেট, আর্চারি, শ্যুটিং, ভারোত্তোলন, সাঁতার, দাবা- প্রায় সব ধরনের খেলায় রয়েছে আমাদের বাঘিনীদের সফল পদচারণ। কিন্তু এর বিনিময়ে তারা কী পাচ্ছেন?
২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্য- ‘অধিকার, ন্যায়বিচার, সক্রিয় পদক্ষেপ- সকল নারী ও কন্যাদের জন্য’। প্রতিপাদ্যটি নিয়ে অনেক ব্যানার তৈরি করা হবে, লেখা হবে অনেক কলাম, নারীর অধিকার, ন্যায়বিচার নিয়ে দেওয়া হবে অনেক বক্তৃতা। কিন্তু আমাদের নারী খেলোয়াড়রা, যারা রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, ঘেমে-নেয়ে শুধু দেশের টানে খেলে যাচ্ছেন অবিরত- তাদের অধিকার ও ন্যায়বিচারের কী হবে? তাদের বেতনবৈষম্য, সমাজের ভ্রুকুটি, কখনও শারীরিক আক্রমণের শিকার, কখনও হচ্ছেন সাইবার বুলিংয়ের শিকার, পাচ্ছেন না পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, কখনও হচ্ছেন যৌন হয়রানির শিকার। এত এত বাধার পাহাড় নারী খেলোয়াড়দের সামনে, সেই বাধা দূর করতে কয়টি সক্রিয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে? বারবার বলা হয়, এই খেলোয়াড়দের বেতনবৈষম্য দূর করা হবে, বাস্তবে আসলে কি তা হয়েছে? পুরুষ খেলোয়াড়দের তুলনায় নারী খেলোয়াড়দের বেতন চার গুণ কম হলেও সাফল্যে নারীরা এগিয়ে গেছে আরও বহুগুণ। ছাদখোলা বাসে এই খেলোয়াড়দের সংবর্ধনা দিয়েই যেন সব দায়দায়িত্ব সেরে ফেলা হলো। অথচ ফুটবলার সানজিদা আক্তার আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘ছাদখোলা চ্যাম্পিয়ন বাসে ট্রফি নিয়ে না দাঁড়ালেও চলবে, সমাজের টিপ্পনীকে এক পাশে রেখে যে মানুষগুলো আমাদের সবুজ ঘাস ছোঁয়াতে সাহায্য করেছে, তাদের জন্য এটি জিততে চাই।’ চ্যাম্পিয়ন হয়েও সমাজের টিপ্পনী আর বাঁকা চাহনি থেকে কি রক্ষা পেয়েছেন নারী খেলোয়াড়রা?







