দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ হলে বহুমুখী চাপে পড়বে বাংলাদেশ

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানে মার্কিন-ইসরায়েল হামলা ও পাল্টা হামলার প্রেক্ষাপটে আবার অস্থির হয়ে উঠছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কা এখনও পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি বাংলাদেশ; এলএনজি ও জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য, বিদ্যুৎ উৎপাদনে বাড়তি ব্যয় এবং ভর্তুকির চাপ- সব মিলিয়ে অর্থনীতি বেশ চাপের মধ্যে আছে। এমন অবস্থায় নতুন করে দীর্ঘমেয়াদি কোনো আঞ্চলিক যুদ্ধ শুরু হলে তার সরাসরি ও পরোক্ষ চাপ পড়বে আমদানিনির্ভর জ্বালানি কাঠামোর ওপর।

বাংলাদেশের জ্বালানির প্রায় ৮০ শতাংশই আমদানিনির্ভর। অপরিশোধিত ও পরিশোধিত তেল, এলএনজি, এলপিজি এবং কয়লার বড় অংশই আসে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে, যার বড় অংশই আসে সমুদ্রপথে। বিশেষত কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি ঘিরে। এই রুটে সামান্য বিঘ্ন বা ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি হলেই আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। এ অবস্থায় যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি সরবরাহ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, ভর্তুকি ব্যয় এবং অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতির ওপর সমন্বিত চাপ তৈরি হতে পারে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সামনের গ্রীষ্মকালীন চাহিদার উচ্চ সময়ে বাংলাদেশের জন্য যে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে তা কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে।

নাম গোপন রাখার শর্তে বাংলাদেশ তেল গ্যাস খনিজ সম্পদ করপোরেশন এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করোপোরেশনের একাধিক কর্মকর্তা গতকাল আমাদের সময়কে বলেন, দেশের জ¦ালানির জোগানের প্রায় ৮০ শতাংশই আমদানিনির্ভর। বাংলাদেশকে আমদানি করতে হয় লিকুইড ন্যাচারাল গ্যাস (এলএনজি), লিকুইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি), কয়েকটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য শতভাগ কয়লা। পরিশোধিত এবং অপরিশোধিত জ¦ালানি তেল আমদানির পুরো বিষয়টি বিশ্বব্যবস্থার স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল। কোথাও যুদ্ধবিগ্রহ দেখা দিলে জ¦ালানির দাম বেড়ে যায়, নিরাপত্তার কারণে পরিবহন কার্গো বা জাহাজ পাওয়া যায় না। নির্দিষ্ট কিছু সমুদ্রপথে এসব জাহাজ বন্দরে আসে। পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলে সংকট তৈরি হয়। কর্মকর্তারা বলেন, কোনো কারণে একদিন এলএনজি সরবরাহ বন্ধ থাকলে দেশ ভয়াবহ গ্যাসের সংকটে পড়ে। সবকিছুর বাইরে আরও রয়েছে দেশের আর্থিক সংকট। এ অবস্থায় ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল-মার্কিন যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশ সংকটে পড়বে। সবচেয়ে বড় বিষয়, বাংলাদেশের জন্য আগামী দুই-তিন মাস বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এ সময় বিদ্যুতের চাহিদা থাকবে সবচেয়ে বেশি। ফলে এই যুদ্ধ অবশ্যই উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ।

রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বলছে, স্বল্পমেয়াদে এ সংঘাতে তেমন উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। কারণ বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই সরকার-টু-সরকার চুক্তি এবং টেন্ডার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত পরিশোধিত তেল আমদানির জন্য সরবরাহকারীদের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করেছে। তা ছাড়া চলমান ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলেও জ্বালানি সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে। কারণ গত বছরের উত্তেজনার পর থেকে দেশটি এই রুট এড়িয়ে চলেছে। সংঘাত দীর্ঘমেয়াদি হলে অবশ্যই সমস্যা তৈরি হবে বলে জানান তারা।

ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘জুন পর্যন্ত প্রয়োজনীয় পেট্রোলিয়াম জ্বালানি আমদানির জন্য হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে বাংলাদেশে পৌঁছার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন চীন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং সিঙ্গাপুর- এই চারটি দেশ থেকে সরকারের পরিশোধিত তেল সংগ্রহ সংঘাতের দ্বারা প্রভাবিত হবে না। তবে সৌদি আরব এবং আবুধাবি থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি চালিয়ে যাবে বাংলাদেশ; হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে যাওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। আপাতত জ¦ালানি সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার প্রত্যাশা থাকলেও যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, আমরা ইতোমধ্যেই জ্বালানি আমদানির প্রিমিয়াম নিষ্পত্তি করেছি, তবে যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে জ্বালানি দাম বা আনুষঙ্গিক খরচ বাড়তে পারে। বিপিসির কাছে বর্তমানে প্রায় এক মাসের বিভিন্ন জ্বালানি মজুদ রয়েছে।

পরিচালক (পরিচালন ও পরিকল্পনা) এবং যুগ্ম সচিব ড. একেএম আজাদুর রহমান বলেছেন, ২০২৬ সালে বাংলাদেশ প্রায় ৬ দশমিক ৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন জ্বালানি ব্যবহার করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। তবে উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনায় পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বিপিসি বলছে, ২০২৫ সালে বিপিসি আবুধাবির ফুজাইরা টার্মিনালের মাধ্যমে একটি বিকল্প সরবরাহ রুট চিহ্নিত করেছে। হরমুজ প্রণালি দুর্গম হয়ে পড়লে করপোরেশন ফুজাইরা রুট দিয়ে বার্ষিক ১ দশমিক ৪ থেকে ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন অপরিশোধিত তেল আমদানির পরিকল্পনা করেছে।

সৌদি আরব এবং আবুধাবি থেকে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। পরিবহনে হরমুজ প্রণালি একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে কাজ করে।

বিপিসি কর্মকর্তারা বিকল্পও ভাবছেন। যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে অভ্যন্তরীণ জ্বালানি শুল্ক সংশোধন করা হতে পারে। বর্তমানে করপোরেশন পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি ও পরিশোধনে প্রতি মাসে ৪৫০ মিলিয়ন থেকে ৫০ কোটি ডলার ব্যয় করে।

এদিকে ইসরায়েল-ইরান পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু হওয়ার পর আবার আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে হরমুজ প্রণালি। ভারতের ইকুইরাস সিকিউরিটিজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরান যদি প্রতিশোধ হিসেবে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ বন্ধ করে দেয়, তা হলে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৫ থেকে ১১০ ডলারে উঠে যেতে পারে।

বর্তমানে ইরানের দৈনিক তেল উৎপাদন প্রায় ৩৩ লাখ ব্যারেল, যা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ৩ শতাংশ। প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, চলমান উত্তেজনার মূল বিষয় হচ্ছে এই তেল। হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ১ শতাংশ সরবরাহ ব্যাহত হলে তেলের দাম সাধারণত ৩ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। সে হিসাবে শুধু ইরানের তেল সরবরাহই যদি ব্যাহত হয়, তা হলে অপরিশোধিত তেলের দাম ৯ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।

বর্তমান ভিত্তিমূল্য যদি ব্যারেলপ্রতি ৭০ ডলার ধরা হয়, তা হলে শুধু প্রত্যক্ষ সরবরাহ কমার কারণেই তেলের দাম প্রায় ৬ থেকে ১১ ডলার বাড়তে পারে। এতে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭৬ থেকে ৮১ ডলারের মধ্যে উঠতে পারে।

প্রাপ্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংঘাতের প্রভাব বাজারে কতটা পড়বে, তা সব সময় সরল গাণিতিক নিয়মে নির্ধারিত হয় না। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল হুমকির মুখে পড়লে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব হয়ে ওঠে কাঠামোগত। এমনকি আংশিক বিঘ্ন ঘটার ঝুঁকি থাকলেও ব্যারেলপ্রতি ২০ থেকে ৪০ ডলারের ‘ভূরাজনৈতিক প্রিমিয়াম’ যুক্ত হতে পারে। ফলে তেলের দাম আবার ৯৫ থেকে ১১০ ডলার বা তারও বেশি হতে পারে। এমন শঙ্কার কথা বলা হচ্ছে।

এর আগে বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকস জানায়, ইরান হরমুজ প্রণালি অবরোধ করলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়াতে পারে। এতে বিশ্বজুড়ে উৎপাদন খরচ বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তামূল্যে বড় প্রভাব পড়বে- বিশেষ করে খাদ্য, পোশাক ও রাসায়নিকের মতো পণ্যে।

কয়েক দিন ধরেই তেলের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ইরানে আবার যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালাবে- তা এক রকম অনুমেয়ই ছিল। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা ও যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন বৃদ্ধি শুরু হওয়ার পরই তেলের দামে তার প্রভাব পড়তে শুরু করে। অপরিশোধিত তেলের দাম ইতোমধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটি ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির প্রতিফলন।

সারাবিশ্বে সমুদ্রপথে যে পরিমাণ তেল ও এলএনজি পরিবহন হয়, তার বড় অংশই হয় এই প্রণালি দিয়ে। প্রতিদিন বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ অর্থাৎ প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল ও বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত গ্যাস পরিবহন হয় এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে। এটি পারস্য উপসাগরে যাওয়ার একমাত্র সামুদ্রিক পথ। এর একপাশে ইরান, অন্যপাশে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। ফলে ইরানকে ঘিরে যে কোনো সংঘাতে এই প্রণালি কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

  • Related Posts

    মার্চ মাসের জন্য জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসের মতো এবারও প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১০০ টাকা, অকটেনের দাম ১২০ টাকা, পেট্রোলের দাম ১১৬ টাকা ও কেরোসিনের দাম ১১২…

    ৬ দেশে বাংলাদেশিদের সতর্ক থাকার পরামর্শ, হটলাইন চালু

    ইরান যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে হামলা, পাল্টা হামলার প্রেক্ষাপটে প্রবাসীদের বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন এবং সামরিক স্থাপনা থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছে ৬ দেশের বাংলাদেশ দূতাবাস। গতকাল শনিবার প্রকাশ করা পৃথক…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *