অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র ২০ দিন বাকি। তবে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে জ্বালানি সংকট; বিশেষ করে বিদ্যুৎ বিভ্রাট বা লোডশেডিং নিয়ন্ত্রণ। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) হিসাব অনুযায়ী, আসন্ন গ্রীষ্মকাল, সেচ মৌসুম ও রমজান মাসে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে এক থেকে দেড় হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হতে পারে। আবহাওয়া সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোও জানিয়েছে, চলতি বছর অন্যান্য বছরের তুলনায় তাপমাত্রা বেশি থাকতে পারে। ফলে নির্বাচন শেষে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট সামাল দেওয়া নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। রমজান মাসে এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে বুধবার বিকেলে রাজধানীর বিদ্যুৎ ভবনে ‘আসন্ন রমজান মাস, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট এবং গ্রীষ্মকালীন সময়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি’ শীর্ষক এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিদ্যমান সংকট ও সম্ভাব্য উত্তরণের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়।
সভায় অনলাইনে যুক্ত হয়ে জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, নির্বাচনকালীন সময়সহ রমজান, সেচ ও গ্রীষ্ম মৌসুমে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে হবে। তিনি বলেন, ‘তখন হয়তো আমি দায়িত্বে থাকব না, তবে গত বছর যেমন বিদ্যুৎ সরবরাহে স্বস্তিদায়ক পরিস্থিতি ছিল, চলতি বছরও তেমন ব্যবস্থা নিতে হবে।’
সভায় সভাপতিত্ব করার কথা থাকলেও অন্য বৈঠকে ব্যস্ত থাকায় জ্বালানি সচিব উপস্থিত থাকতে পারেননি। সভাটি পরিচালনা করেন বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব ফারজানা মমতাজ।
সভায় বিপিডিবির উপস্থাপনায় জানানো হয়, বর্তমানে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার ৫০৪ মেগাওয়াট। এর মধ্যে জলবিদ্যুৎ থেকে ২৩০ মেগাওয়াট, আমদানি করা বিদ্যুৎ ২ হাজার ৬৩৬ মেগাওয়াট, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ ৬ হাজার ২০৩
মেগাওয়াট, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ৮২৯ মেগাওয়াট, ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎ ৭৬৮ মেগাওয়াট এবং গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা ১২ হাজার ২০৪ মেগাওয়াট।
তবে বাস্তবে এই সক্ষমতার অর্ধেক উৎপাদন করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে বিপিডিবিকে। কোনো জ্বালানি উৎস থেকেই পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে কয়লা ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেই সবচেয়ে বেশি জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে, যার মধ্যে গ্যাস সংকট সবচেয়ে প্রকট।
বিপিডিবির তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি, মার্চ ও এপ্রিল মাস সেচ, রমজান ও গ্রীষ্মকাল সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদার সময়। এই সময়ে গ্যাসের সরবরাহ কমে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন হ্রাস পাবে এবং লোডশেডিং অনিবার্য হয়ে উঠবে। প্রায় প্রতি বছরই গ্রীষ্ম মৌসুমে পেট্রোবাংলা চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয় বলে জানিয়েছে বিপিডিবি।
বিপিডিবির হিসাবে জানুয়ারিতে বিদ্যুতের চাহিদা ১২ হাজার মেগাওয়াট, ফেব্রুয়ারিতে ১৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট, মার্চে ১৬ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট এবং এপ্রিল-মে মাসে তা বেড়ে দাঁড়াবে ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটে। চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ না পেলে এক থেকে দেড় হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন কর্মকর্তারা।
এ সময় এপ্রিল-মে মাসে দৈনিক অন্তত ১২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি পায়রা, রামপাল, মাতারবাড়ী, বড়পুকুরিয়া ও এস আলমসহ বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ উৎপাদনে রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এসব কেন্দ্রের কোনো একটি বন্ধ থাকলে বা উৎপাদন কমলে লোডশেডিং আরও বাড়বে বলে জানানো হয়।
বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, ১২ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকলেও গ্যাসের অভাবে সবগুলো চালানো যাচ্ছে না। গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পেট্রোবাংলা থেকে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো জরুরি।
অন্যদিকে পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন) প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে। জানুয়ারি-মার্চ সময়ে গ্যাস উৎপাদন ধরা হয়েছে ১ হাজার ৭৫৪ মিলিয়ন ঘনফুট, এপ্রিল-জুনে ১ হাজার ৭৩১ মিলিয়ন ঘনফুট এবং জুলাই-ডিসেম্বরে ১ হাজার ৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। গত বছর একই সময়ে উৎপাদন ছিল ১ হাজার ৮০৯ মিলিয়ন ঘনফুট।
তিনি জানান, আন্তর্জাতিক কোম্পানি শেভরনের গ্যাস উৎপাদনও কমছে। যদিও গত বছর ১০৯টি এলএনজি কার্গো আমদানি করা হয়েছে এবং চলতি বছর আরও ছয়টি কার্গো বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে, তবুও বিপিডিবির চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা কঠিন হতে পারে। গ্রীষ্মকালীন সময়ে গ্যাসের যোগান বাড়াতে পাঁচটি সারকারখানার মধ্যে অন্তত একটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার প্রস্তাবও দেওয়া হয়।
সভায় বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি বলেন, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। রমজান ও ঈদের আগে কিছুটা বেচাকেনা হলেও এ সময় অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপ করা হলে ব্যবসায়ীরা আরও সংকটে পড়বেন।
এদিকে বৈঠকে বিদ্যুৎ সচিব ফারজানা মমতাজ কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে বলেন, আসন্ন সেচ, গ্রীষ্মকালীন সময় এবং রমজানে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করতে হবে। জ¦ালানি সচিব সাইফুল ইসলাম বলেন, সকলের চেষ্টা করা উচিত যাতে রমজান ও গ্রীষ্মে বিদ্যুতের সববরাহ স্বাভাবিক থাকে। বৈঠকে বিপিসির চেয়ারম্যান আমিনুল উল আহসান বলেন, জ¦ালানি তেল সরবরাহে বিপিসির সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। বিপিসির কোন সংকট নেই। বরং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বিপিসিকে যে পরিমান ফার্নেস অয়েল আমদানির চাহিদাপত্র দিয়েছে সেটা এখন সময়মতো গ্রহন না করায় বিপিসি সংকটের মধ্যে রয়েছে। তিনি পিডিবিকে সেগুলো সময়মতো গ্রহণের অনুরোধ করেন।





