সহজলভ্য মাদকের ছোবলে বিপর্যস্ত পরিবার-দেশ – Rupantor Television

সহজলভ্য মাদকের ছোবলে বিপর্যস্ত পরিবার-দেশ

মাদকের ছোবলে নীরবে বদলে যাচ্ছে দেশের সামাজিক বাস্তবতা। রাজধানী থেকে গ্রামÑ সবখানেই ছড়িয়ে পড়েছে এ

ভয়াবহ মরণনেশা। জড়িয়ে পড়ছে তরুণ সমাজ। এর প্রভাব পড়ছে পরিবারে, বাড়ছে সহিংসতা, অর্থনৈতিক সংকট ও

সম্পর্কের ভাঙন। মাদকের আদ্যোপান্ত নিয়ে পাঁচ পর্বের প্রথম কিস্তি আজ

‘রিকশা চালায়ে প্রতিদিন ১৫শ টাকার মতো ভাড়া মারি। ৪শ টাকা দিই মালিকরে; ৯শ টাকায় ৩টা গুটি (ইয়াবা) কিনি খাই। দুই-তিনশ টাকার মধ্যেই ঘরভাড়া, বাজার, বাচ্চার ওষুধ। পরিবারের মুখের দিকে তাকাইয়্যা অনেকবার ছাড়তে চাইছি, কিন্তু সঙ্গ দোষে পারি না,। আমি নেশা থেইক্যা বাঁচতে চাই ভাই’ আকুতি জানিয়ে গতকাল মঙ্গলবার অশ্রুশিক্ত চোখে কথাগুলো বলছিলেন ২৩ বছরের টগবগে যুবক ফয়সাল বাবু। তিনি রিকশা চালান রাজধানীর বাড্ডা থানার সাততলা বস্তি এলাকায়।

শুধু এই যুবকই নয়, রাজধানীসহ সারাদেশে হতদরিদ্র থেকে শুরু করে ধনীর দুলালরাও এখন ইয়াবার করাল গ্রাসে আচ্ছন্ন। শহর থেকে গ্রাম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে কর্মক্ষেত্রÑ সবখানেই স্পষ্টত মাদকের ছোবল। ইয়াবা ছাড়াও হেরোইন, গাঁজা, প্যাথেড্রিন, এলএসডি, আইস (ক্রিস্টাল মেথ), কোকেইনের মতো দামি মাদকও মিলছে হাত বাড়ালে।

সহজলভ্য এ মাদকের নীরব মহামারীতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে পরিবার ও দেশ। ইয়াবা, হেরোইন, গাঁজার পাশাপাশি এখন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে হাইড্রিল ও

স্কার্ফ লেমন সিরাপের মতো সস্তা ও সহজপ্রাপ্য মাদক; এমনকি কিটামিনের মতো ভয়ংকর সিনথেটিক ড্রাগও ঢুকে পড়েছে নতুন করে। সীমান্তপথ, সমুদ্রবন্দর ও আন্তর্জাতিক কুরিয়ারÑ সব রুট ব্যবহার করে সক্রিয় দেশি-বিদেশি সিন্ডিকেট মাদক সরবরাহ বজায় রাখছে, ফলে নিয়ন্ত্রণে বারবার হোঁচট খাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

মাদকে সবচেয়ে বেশি আঘাত হানছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারে। অল্প আয়ের মানুষও নেশার খরচ জোগাতে দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজন কাটছাঁট করছে; অনেক ক্ষেত্রে জড়িয়ে পড়ছে ছিনতাই, চুরি ও সহিংস অপরাধে। পরিবারে বাড়ছে কলহ, ভাঙছে সম্পর্ক, এমনকি মাদককে কেন্দ্র করে খুনের ঘটনাও ঘটছে বিভিন্ন জেলায়। তরুণ সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমনকি কর্মক্ষেত্রও এর বাইরে থাকছে নাÑ বন্ধুবৃত্ত, হতাশা ও কৌতূহল থেকে শুরু হওয়া নেশা দ্রুতই রূপ নিচ্ছে আসক্তিতে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেকারত্ব, সামাজিক অস্থিরতা, দুর্বল নজরদারি এবং সহজলভ্যতাÑ এই চার কারণে মাদক পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলেছে। কুরিয়ার সার্ভিস, ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতা, ডার্ক ওয়েব ও ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো আধুনিক মাধ্যম ব্যবহার করে পাচারকারীরা তাদের নেটওয়ার্ক আরও জটিল করে তুলছে।

ফলে শুধু আইন সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো এবং ধারাবাহিক অভিযানের কারণে ভারত থেকে আসা মাদক ফেনসিডিলের সরবরাহ কমেছে। তার স্থান দখল করেছে হাইড্রিল ও স্কার্ফ লেমন নামে সিরাপভিত্তিক মাদক। মাদক ব্যবসায়ীরা বিকল্প হিসেবে সহজলভ্য ও তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ নতুন এই মাদক বাজারে ছড়িয়ে দিচ্ছে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশাসনের দুর্বল নজরদারির কারণে সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলো দিয়ে অবৈধভাবে প্রবেশ করা এসব মাদকের সরবরাহ বন্ধ করা যাচ্ছে না। কুরিয়ার ও ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে নতুন নতুন কৌশলে পাচারকারীরা তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। মাদকের টাকা জোগাতে কেউ হয়ে পড়ছেন সর্বস্বান্ত, কেউ জড়িয়ে পড়ছেন ছিনতাই-ডাকাতির মতো ভয়ংকর কর্মকাণ্ডে। দেশি ও আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত মাদকের এই নীরব মহামারী সমাজের প্রতিটি স্তরকে গ্রাস করছে, যার প্রভাব পড়ছে ব্যক্তি, পরিবার এবং রাষ্ট্রের ওপর।

সম্প্রতি দেশে ঢুকে পড়েছে কিটামিন নামে ভয়াবহ একটি মাদক। খোদ রাজধানীতে সম্প্রতি গোপনে কিটামিন প্রক্রিয়াজাতকরণ ল্যাব স্থাপন করে আন্তর্জাতিকভাবে মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত একটি চক্রের সন্ধান পেয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। ডিএনসির তদন্তে উঠে আসেÑ চক্রটি ডার্ক ওয়েব ও ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করে শ্রীলংকাসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মাদক বাণিজ্য পরিচালনা করছিল। আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে অভিনব কৌশলে এসব মাদক পাচারের চেষ্টা চালাচ্ছিল। শুধু কেটামিনই নয়, গত এক মাসে রাজধানীর ৫০ থানায় ১০ হাজারের বেশি ইয়াবা ছাড়াও বিপুল হেরোইন, গাঁজা, প্যাথেড্রিন, এলএসডি, আইস (ক্রিস্টাল মেথ), কোকেইন জব্দ করে র‌্যাব, ডিবি, পুলিশ ও ডিএনসি।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) মহাপরিচালক (ডিজি) মো. হাসান মারুফ গতকাল বলেন, ডিএনসির গোয়েন্দা বিভাগ দীর্ঘদিন কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবহার করে মাদক পাচারের বিষয়ে নজরদারি করে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ২৫ মার্চ ঢাকার একটি আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিস অফিসে অভিযান চালিয়ে একটি ব্লুটুথ সাউন্ড স্পিকারের ভিতরে বিশেষ কৌশলে লুকানো অবস্থায় ৫০ গ্রাম কিটামিন উদ্ধার করা হয়। পরে একই দিন রাতে উত্তরা পশ্চিম থানার একটি আবাসিক ভবনের ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে তিন চীনা নাগরিকÑ লি বিন, ইয়াং চুনশেং ও ইউ ঝে’কে আটক করা হয়। অভিযানে ফ্ল্যাটটির একটি কক্ষে গড়ে তোলা অস্থায়ী ল্যাব থেকে ৬ কেজি ৩০০ গ্রাম কিটামিন, বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক দ্রব্য, মাদক তৈরির সরঞ্জাম ও দেশি-বিদেশি মুদ্রা উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতরা তরল কিটামিন সংগ্রহ করে ফ্ল্যাটের ভেতরে ল্যাব স্থাপন করে তা পাউডার আকারে প্রক্রিয়াজাত করত এবং পরবর্তী সময়ে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করত।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আসামিরা এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার, নিয়মিত ডিজিটাল তথ্য মুছে ফেলা, মোবাইল ফোন ও সিম পরিবর্তন এবং ভুয়া পরিচয়পত্র ব্যবহারসহ বিভিন্ন কৌশলের মাধ্যমে নিজেদের কার্যক্রম গোপন রাখে। ফলে গোয়েন্দা নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম জটিল হয়ে ওঠে। তবে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণ ও ধারাবাহিক গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে এই নেটওয়ার্কের কার্যক্রম ধাপে ধাপে উন্মোচিত হচ্ছে।

ডিএনসির ডিজি মো. হাসান মারুফ বলেন, কিটামিন একটি শক্তিশালী ডিসোসিয়েটিভ ড্রাগ, যা স্বল্পমেয়াদে বিভ্রান্তি, হ্যালুসিনেশন ও শারীরিক নিয়ন্ত্রণহীনতা সৃষ্টি করে। দীর্ঘমেয়াদে এটি কিডনি ও মূত্রথলির মারাত্মক ক্ষতি, মানসিক সমস্যা এবং আসক্তির ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। নিয়মিত সেবনে সহনশীলতা তৈরি হয়ে ডোজ বাড়ানোর প্রবণতা দেখা দেয়, যা প্রাণঘাতী ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। এই আন্তর্জাতিক মাদক চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্য ব্যক্তি ও নেটওয়ার্ক শনাক্তে তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

গত সোমবার রাতে চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশ হিলভিউ আবাসিক এলাকায় অভিযান চালিয়ে সাড়ে ১০ হাজার ইয়াবাসহ একই পরিবারের ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সিএমপির উত্তর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার আমিরুল ইসলাম জানান, গ্রেপ্তাররা দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে ইয়াবা সংগ্রহ করে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করছিলেন। তারা কক্সবাজার সীমান্তবর্তী এলাকা ও রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে কম দামে ইয়াবা সংগ্রহ করে কুরিয়ারের মাধ্যমেও দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠাতেন।

তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা জানায়, বাংলাদেশে যেসব মাদকদ্রব্য পাওয়া যায়Ñ এর মধ্যে কিছু দেশীয়ভাবে উৎপাদিত, আবার অনেকগুলো পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে পাচার হয়ে আসে। বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে ইয়াবা, হেরোইন, গাঁজা, ফেনসিডিল, কোকেইন, নতুন ও বেশি বিপজ্জনক আইস, এলএসডির বিস্তৃতি বেশি। এগুলোর বড় অংশ আসে সীমান্ত দিয়ে পাচারের মাধ্যমে। ইয়াবার প্রধান উৎস মিয়ানমার সীমান্ত (টেকনাফ-কক্সবাজার এলাকা), ফেনসিডিল, গাঁজা ও হেরোইন ভারত সীমান্ত দিয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক রুট (এয়ারপোর্ট/সমুদ্রবন্দর) দিয়ে আসে কোকেইন, এলএসডি, এমডিএমএ ইত্যাদি। ঢাকা, চট্টগ্রাম, কিছু সীমান্তবর্তী জেলার নির্দিষ্ট অপরাধপ্রবণ এলাকায় গোপন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এসব মাদক বিতরণ হয়।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকাÑ মিরপুর, যাত্রাবাড়ী, রামপুরা, বাড্ডা, মোহাম্মদপুর ও পুরান ঢাকায় অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা যায়, ফেনসিডিলের দাম বর্তমানে প্রতি পিস ৮ হাজার টাকার বেশি। দামে বেশি এবং চালান কম আসায় ফেনসিডিলের পরিবর্তে এখন তরুণদের হাতে বেশি দেখা যাচ্ছে হাইড্রিল ও স্কার্ফ লেমন সিরাপের বোতল। কারণ, ফেনসিডিলের মতোই এগুলো মারাত্মক আসক্তি তৈরি করে, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে। তাছাড়া এসব সিরাপ তুলনামূলকভাবে সস্তা হওয়ায় নিম্ন আয়ের মানুষও সহজেই এর নাগাল পাচ্ছে। অনেক ফার্মেসি ও পাইকারি ওষুধ ব্যবসার আড়ালেও এসব বিক্রি হচ্ছে।

মাদকের ভয়ানক ছোবলে সংসার ধ্বংস হচ্ছে। সেই সঙ্গে আপনজন শিকার হচ্ছে খুনের। গত ৮ মার্চ কুষ্টিয়ায় বন্ধুর হাতে বন্ধু সাগর (২৬) নিহত হয়েছেন। মাদক নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করা হয়। গত ১ ফেব্রুয়ারি রাজশাহীতে চন্দ্রিমা থানার খড়খড়ি এলাকায় সোহাগী খাতুন (৫৫) খুন হন তার মাদকাসক্ত সন্তান সুমনের হাতে। গত বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে মাদকাসক্ত ছেলে আসলামের (৩৫) হাতে খুন হয়েছেন আরশেদ আলী (৮০) নামের এক বৃদ্ধ। গত ৫ এপ্রিল ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে মাদকাসক্ত চাচা মনিরের দায়ের কোপে রিফাত (২০) নামে এক তরুণ নিহত হয়েছেন। গত ১ ফেব্রুয়ারি ঝালকাঠি সদরে সেফালী বেগম (৬২) খুন হন তার সন্তান সাগর খানের হাতে। দীর্ঘদিন মাদক সেবন করা সাগর এক পর্যায়ে মানসিক ভারসম্যহীনও হয়ে পড়েছিলেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছে।

জানা গেছে, বাংলাদেশে মাদক সবচেয়ে বেশি আসে মিয়ানমার ও ভারতের সীমান্ত দিয়ে। এর মধ্যে কক্সবাজার-টেকনাফ-উখিয়া (সবচেয়ে বড় হটস্পট বিক্রয় কেন্দ্র)। এখানে ৬০টির বেশি ইয়াবা হটস্পট রয়েছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতেও শতাধিক স্পট তৈরি হয়েছে। নাফ নদী, সমুদ্র ও পাহাড়ি রুট ব্যবহার হয়; এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মাদক করিডর। হেরোইন ও অন্য মাদক প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ পথ বান্দরবান সীমান্ত। ফেনসিডিল ও হেরোইনের বড় প্রবেশপথ রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ-সাতক্ষীরা। দীর্ঘ অরক্ষিত সীমান্তের কারণে এখন মাদক পাচারের বড় হটস্পট লালমনিরহাট সীমান্ত। ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল প্রবেশ করে সিলেট সীমান্ত (মেঘালয় সংলগ্ন) দিয়ে; কোকেনসহ সিনথেটিক ড্রাগ আসে চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে। আন্তর্জাতিক মাদক প্রবেশ করে মোংলা বন্দর দিয়ে। ঢাকার ভেতরের বড় হটস্পট মোহাম্মদপুর (জেনেভা ক্যাম্প); ২৪ ঘণ্টা খোলা বাজারের মতো এখানে ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইন বিক্রি হয়। এ ছাড়া কারওয়ান বাজার (রেললাইন এলাকা), মিরপুরের বিভিন্ন বিহারি ক্যাম্পে মাদক চক্র সক্রিয়। ট্রানজিট ও পাইকারি জোন হলো যাত্রাবাড়ী-ডেমরার ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ে। ট্রাক ও কভার্ড ভ্যান ব্যবহার করে আনা হয় মাদকের বড় চালান। পরে ছোট ছোট ভাগে ভাগ হয়ে ছড়িয়ে পড়ে রাজধানীতে। কেরানীগঞ্জের বুড়িগঙ্গা নদী রুট লুকানো গুদাম টাইপ ব্যবহার করা হয়।

বাংলাদেশের মাদক প্রবেশের প্রধান গেটওয়ে টেকনাফ (নাফ নদী এলাকা, শাহপরীর দ্বীপ, সাবরাং, হ্নীলা); ইয়াবার সবচেয়ে বড় রুট উখিয়া, কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প, বালুখালী ক্যাম্প। এ ছাড়া ক্যাম্পভিত্তিক শতাধিক স্পট; কক্সবাজার সদরের হোটেল জোন, কলাতলী-লাবণী পয়েন্ট; চট্টগ্রামের বন্দর এলাকা, পতেঙ্গা, আকবরশাহ-হালিশহর। পাহাড়ি রুট হলোÑ বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি, রুমা-থানচি সীমান্ত। হেরোইন ও ফেনসিডিল আসে রাজশাহী পশ্চিম সীমান্ত (ভারত সংলগ্ন) চাঁপাইনবাবগঞ্জ, শিবগঞ্জ, গোমস্তাপুর; রাজশাহীর পবা, গোদাগাড়ী; নওগাঁর ধামইরহাট, খুলনা-সাতক্ষীরা অঞ্চলের কলারোয়া, দেবহাটা, শ্যামনগর, বেনাপোল স্থলবন্দর হলো ফেনসিডিলের রুট; উত্তরাঞ্চলের লালমনিরহাট, পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা, কুড়িগ্রাম, ফুলবাড়ী, ভূরুঙ্গামারী ও ছিটমহল এলাকা। সিলেটের জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট, মৌলভীবাজার, কুলাউড়া ভারত (মেঘালয়) সীমান্ত দিয়ে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তৌহিদুল হক আমাদের সময়কে বলেন, প্রথমত, বেকারত্ব এবং হতাশা তরুণ সমাজকে মাদকের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। জীবনের প্রতি অনাগ্রহ, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক চাপ অনেককে মাদক গ্রহণে প্ররোচিত করছে। দ্বিতীয়ত, পারিবারিক অস্থিরতা ও অবহেলা কিশোর-কিশোরীদের বিপথে নিয়ে যাচ্ছে। তৃতীয়ত, অপরাধচক্রের সক্রিয়তা এবং সহজলভ্যতা মাদককে আরও বিস্তৃত করছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও এখন আর নিরাপদ নয়। অনেক শিক্ষার্থী কৌতূহলবশত বা বন্ধুবান্ধবের প্রভাবে মাদক গ্রহণ শুরু করে, যা পরে আসক্তিতে রূপ নেয়। এর ফলে পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটে, বাড়ে অপরাধপ্রবণতা এবং মানসিক অবক্ষয়। অনেক ক্ষেত্রে মাদকাসক্ত শিক্ষার্থীরা চুরি, ছিনতাই এমনকি সহিংস অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছে। মাদকাসক্তির প্রভাব শুধু ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা পরিবার ও সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। একটি পরিবারে একজন মাদকাসক্ত সদস্য পুরো পরিবারের শান্তি নষ্ট করে দিতে পারে। আর্থিক সংকট, পারিবারিক কলহ, সামাজিক অপমানÑ সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। অনেক পরিবার ভেঙে যাচ্ছে শুধুমাত্র মাদকাসক্তির কারণে। স্বাস্থ্যগত দিক থেকেও মাদক একটি মারাত্মক হুমকি। দীর্ঘদিন মাদক গ্রহণের ফলে শরীরে নানা ধরনের জটিল রোগ দেখা দেয়। লিভার, কিডনি, হৃদরোগসহ মানসিক রোগের ঝুঁকি বাড়ে।

তিনি আরও বলেন, মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া মাদকের মতো অপরাধ নির্মূল করা কঠিন। শুধুমাত্র আইন প্রয়োগের মাধ্যমে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা, পারিবারিক নজরদারি এবং তরুণদের জন্য বিকল্প ইতিবাচক সুযোগ সৃষ্টি। মাদকবিরোধী আন্দোলনে সমাজের সব স্তরের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের প্রতি আরও যত্নশীল হওয়া এবং তাদের চলাফেরা ও বন্ধুবান্ধব সম্পর্কে সচেতন থাকা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং এবং সচেতনতা কার্যক্রম চালানো জরুরি। পাশাপাশি ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনগুলোও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

  • Related Posts

    নববর্ষ উদযাপনে কোনো হুমকি নেই : র‍্যাব ডিজি

    বাংলা নববর্ষ-১৪৩৩ উৎসব উদযাপনে কোনো ধরনের হুমকি নেই বলে জানিয়েছেন র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) এর মহাপরিচালক (অতিরিক্ত আইজিপি) মো. আহসান হাবীব পলাশ। সোমবার (১৩ এপ্রিল) সকালে রাজধানীর রমনার বটমূলে র‍্যাবের…

    আজ যে দামে বিক্রি হচ্ছে স্বর্ণ

    দেশের বাজারে স্বর্ণের দামে সাম্প্রতিক সময়ে বড় ধরনের সমন্বয় এসেছে। বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) দাম কমানোর পর আজ সোমবার পর্যন্ত সেই কম দামে স্বর্ণ বিক্রি হচ্ছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) এক…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *