অর্থ ব্যয়ে ধীরগতি

চলমান করোনার প্রভাব পড়েছে চলতি বাজেটে (২০২০-২১)। ব্যাহত হচ্ছে অর্থ ব্যয়ের স্বাভাবিক গতি। এতে এক ধরনের অনিশ্চয়তা পড়েছে শতভাগ বাজেট বাস্তবায়নে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব পড়ায় এডিপিতে কমেছে অর্থ ব্যয়। একইভাবে পরিচালনা খাতেও কমছে ব্যয়। গত জুলাই-নভেম্বর এই ৫ মাসে বাজেট থেকে ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ১৫ হাজার ১৫৪ কোটি টাকা। এমন পরিস্থিতিতে জুনের মধ্যে ব্যয় করতে হবে ৪ লাখ ৫২ হাজার কোটি টাকা। ওই হিসাবে প্রতি মাসে অর্থ ব্যয়ের আকার হবে ৬৪ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা। যা সক্ষমতার বিবেচনায় অসম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবিএম মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম   শুরুতে বাজেটের যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় এর সঙ্গে বাস্তবতার কোনো সম্পর্ক থাকে না। প্রতি বছরই একটি উচ্চাভিলাষী বাজেট ঘোষণা দেয়া হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাজস্ব আহরণ ও ব্যয় বাস্তবায়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হয় না। এটি চিরন্তন রোগ। অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে যে টাকা খরচ করা হয়েছে বাকি অর্থ নির্ধারিত সময়ে ব্যয় সম্ভব হবে না। তবে এখন রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে। কারণ কর আহরণ জিডিপির অনুপাতের তুলনা করলে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন বাংলাদেশ। নেপালেও আমাদের চেয়ে বেশি জিডিপির অনুপাতে কর অনুপাত বেশি।

সূত্র মতে, জাতীয় সংসদে চলতি অর্থবছরে ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এবার বাজেট ঘোষণাকালীন করোনার প্রাদুর্ভাব ছিল। ফলে শতভাগ বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে এক ধরনের আশঙ্কা থাকছে। অর্থবছরের জুলাই থেকে নভেম্বর এই পাঁচ মাসে বাজেট বাস্তবায়ন অগ্রগতি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয় অর্থ ব্যয় হয় দুটি বড় খাতে। প্রথমটি সরকারের পরিচালনা খাত এবং দ্বিতীয় হচ্ছে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি)। এ বছর সরকারের পরিচালনা খাতে ব্যয় ধরা হয় ৩ লাখ ৪৮ হাজার ১৮০ কোটি টাকা। তবে জুলাই থেকে নভেম্বর এ ৫ মাসে ব্যয় হয়েছে মাত্র ৮৮ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা। এটি লক্ষ্যমাত্রার ২৫ দশমিক ৪ শতাংশ।

ওই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সরকারের পরিচালনা খাতের মোট ব্যয় ৫টি সাব খাতের মাধ্যমে ব্যয় করা হয়। এরমধ্যে একটি হচ্ছে প্রশাসনিক খাত। যেখানে ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ১ লাখ ৫৮ হাজার ৪২২ কোটি টাকা। প্রশাসনিক খাতে মূলত সরকারি চাকরিজীবী, ডিফেন্স এবং পাবলিক অর্ডার অ্যান্ড সেফটি রয়েছে। এই খাতে জুলাই-নভেম্বর ব্যয় হয়েছে ৩২ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা। এটি মোট লক্ষ্যমাত্রার ৩৭ দশমিক ৩ শতাংশ।

ব্যয়ের দ্বিতীয় খাত হচ্ছে সামাজিক অবকাঠামো। এই খাতের মধ্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা, স্থানীয় সরকার বিভাগ। অর্থবছরে এ খাতে মোট ব্যয় ধরা আছে ৯৩ হাজার ৩১২ কোটি টাকা। এরমধ্যে ৫ মাসে ব্যয় হয়েছে ২৫ হাজার ৯০৬ কোটি টাকা। এটি মোট লক্ষ্যমাত্রার ২৯ দশমিক ৩ শতাংশ। এছাড়া ফিজিক্যাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার খাতে বরাদ্দ আছে ১০ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা। ফিজিক্যাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার খাতে রয়েছে জ্বালানি, পরিবহণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা। গত ৫ মাসে এ খাতে ব্যয় হয় ১ হাজার ৫৯২ কোটি টাকা হয়েছে। কৃষি খাতে ১৮ হাজার ১০৫ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলে প্রথম ৫ মাসে ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৮৯২ কোটি টাকা। এখাতে মোট ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রার ৩ দশমিক ২ শতাংশ। এছাড়া এ ৫ মাসে সুদ খাতে ২ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা ও অন্যান্য খাতে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ১৪৯ কোটি টাকা।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, করোনার কারণে বাজেট বাস্তবায়নে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। পাশাপাশি অর্থ ব্যয়ের জন্য প্রয়োজন রাজস্ব। কিন্তু ব্যবসা বাণিজ্য ও অর্থনীতির গতি ফিরে না আসায় রাজস্ব আদায় ঠিকমতো হচ্ছে না। ফলে সবদিক বিবেচনা করেই অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

সূত্র আরও জানায়, চলতি অর্থবছরে উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ লাখ ১৫ হাজার ৪৫ কোটি টাকা। কিন্তু করোনার কারণে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ব্যাহত হয়েছে। অনেক নিম্ন মানের প্রকল্পের অর্থ ব্যয় স্থগিত করা হয়। যদিও ৩ মাস পর সেগুলোতে অর্থায়ন শুরু করা হয়েছে। এছাড়া এখন পর্যন্ত প্রকল্পের মোট ব্যয়ের ২৫ শতাংশ অর্থ ব্যয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এসব কারণে উন্নয়ন ব্যয়ে ধীর গতি দেখা গেছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র মতে, জুলাই থেকে নভেম্বর এ ৫ মাসে উন্নয়ন খাতে ব্যয় হয়েছে ২৬ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা। এটি লক্ষ্যমাত্রার ১২ দশমিক ৪৪ শতাংশ। তবে গত বছরের একই সময়ে এ অর্থের ব্যয়ের হার ছিল ১৭ দশমিক ১৬ শতাংশ। করোনার উন্নয়ন খাতে ব্যয় করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় আছে জাতীয় সংসদ, পাবলিক সার্ভিস কমিশন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, রেল মন্ত্রণালয়। এসব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ বরাদ্দের টাকা এখন ব্যয় করতে পারেনি।

Rupantor Television

A IP Television Channel

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »