বিজিএমইএ নয়, ২১ ট্রাস্টির দখলে বিইউএফটি!

সারা দেশের গার্মেন্টস মালিকদের টাকা দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন টেকনোলজি (বিইউএফটি)। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকানা সংগঠনের সাধারণ সদস্যদের থাকার কথা থাকলেও এখন এটির দখল নিয়েছে একটি গোষ্ঠী! তারা সবাই তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর প্রভাবশালী সদস্য। অথচ সাধারণ সদস্যরা জানে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকানা বিজিএমইএর হাতে রয়েছে। বর্তমানে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদের পরিমাণ কয়েক শ কোটি টাকা।

বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পখাতের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এ খাতে দক্ষ জনশক্তি তৈরির প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। এ তাগিদ থেকে ১৯৯৯ সালে বিজিএমইএর তত্কালীন সভাপতি আনিসুর রহমান সিনহা এ খাতের জন্য একটি ইনস্টিটিউট গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা জানান। এ তাগিদ থেকে সে বছর উত্তরাতে একটি ভবনের ফ্লোর ভাড়া নিয়ে ইনস্টিটিউটটি চালু করা হয়। প্রথম দিকে বিভিন্ন কারাখানা মালিক এ প্রতিষ্ঠানে নানা ধরনের মেশিনপত্র সরবরাহ করেন। পোশাক খাতের বড় উদ্যোক্ত হারুন অর রশিদকে এ প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয়। স্টকল্যান্ডের একজন ফ্যাশন ডিজাইনার এ প্রতিষ্ঠানের প্রিন্সিপাল নিযুক্ত হন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বিইউএফটি প্রতিষ্ঠার সময় বলা হয়েছিল—বিজিএমইএতে যখন যারা নেতৃত্বে আসবেন তারাই এ প্রতিষ্ঠানের ট্রাস্টি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। কিন্তু একটি স্বার্থান্বেষী প্রভাবশালী মহল এ সিদ্ধান্তকে পাশ কাটিয়ে নিজেরাই ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য হয়ে যান। রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানি এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১১ সালে বিজিএমইএকে না জানিয়ে অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে নয় জন ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য হন। এরা হলেন—মুজাফফর উদ্দিন সিদ্দিক (চেয়ারম্যান), আব্দুস সালম মুর্শেদী, টিপু মুন্সি, নাসির উদ্দিন চৌধুরী, শফিউল ইসলাম (মহিউদ্দিন), ফারুক হাসান, সিদ্দিকুর রহমান, এস এম মান্নান (কচি) ও রিয়াজ-বিন -মাহমুদ। পরবর্তীকালে ট্রাস্টি বোর্ডে আরো ১২ জনকে যুক্ত করা হয়। এরা হলেন- সালাহউদ্দিন আহমেদ, মো. আতিকুল ইসলাম, মোহাম্মদ নাসির, কুতুবুদ্দিন আহমেদ, আরশাদ জামাল (দিপু), খোন্দকার রফিকুল ইসলাম, মশিউল আযম (সজল), রফিকুল ইসলাম, মো. মহিদুল ইসলাম খান, মো. সাজ্জাদুর রহমান মৃধা, মো. জাকির হোসেন ও আবদুল্লাহ হিল রাকিব। বিইউএফটি পরিচালনায় এদের সমন্বয়ে যে ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করা হয়েছে তা সোসাইটি রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট-১৮৬০ অনুযায়ী রেজিস্ট্রেশন করা।

বিজিএমইএর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, নিয়ম অনুযায়ী সংগঠনের নেতৃত্বে যখন যারা আসবেন তারা ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য হবেন। অথচ বাস্তবে উল্লিখিত ২১ জন ট্রাস্টি নিজেরাই বিশ্ববিদ্যালয়টির একচ্ছত্র মালিক বনে গেছেন। যার ফলে বিইউএফটিতে বিজিএমইএর মালিকানার কোনো অস্তিত্ব নেই। যে কারণে গত কয়েক বছর ধরে সংশ্লিষ্টরা বিইউএফটির আয়-ব্যয় কিংবা অন্যান্য বিষয়াদির বিষয়ে বিজিএমইএ-কে অবহিতও করেন না।

জানা গেছে, ২০১৯ সালে বিজিএমইএর তত্কালীন সেক্রেটারি এ কে এম ফজলুর রহমান বিইউএফটির রেজিস্ট্রারের কাছে এ সংক্রান্ত একটি চিঠি দেন। এতে তিনি কয়েকটি বিষয়ে তথ্য জানতে চান। এগুলোর মধ্যে রয়েছে, বিইউএফটির মেমোরেন্ডাম অব আর্টিকেলস অব অ্যাসোসিয়েশন, ট্রাস্ট্রি বোর্ডের সদস্যদের সঙ্গে বিইউএফটির চুক্তির কপি এবং বিইউএফটি ট্রাস্ট্রের সদস্যদের নামের তালিকা। অভিযোগ রয়েছে, এ চিঠি বিইউএফটিতে যাবার পর ট্রাস্ট্রি বোর্ডের একজন সদস্য বিজিএমইএ কর্মকর্তাদের হুমকি দেন এবং বলেন যে ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রচেষ্টা নিলে দেখে নেওয়া হবে।

বিজিএমইএর একজন সাধারণ সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইত্তেফাককে বলেন, ‘সাধারণ সদস্যদের চাঁদার টাকা দিয়ে এ প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলা হয়েছিল। এত দিন আমরা নিজেদের এ প্রতিষ্ঠানের মালিক ভেবেছিলাম। কিন্তু এখন দেখি বিষয়টি উলটো।’ অপর একজন সদস্য বলেন, ‘ট্রাস্ট্রি বোর্ডের অনেক সদস্য এ ইউনিভার্সিটির মাধ্যমে তাদের নিজেদের অবস্থার উন্নতি করেছেন। কিন্তু সাধারণ সদস্যদের কথা একবারও ভাবেননি।’

উল্লেখ্য, বর্তমানে সারা দেশে বিজিএমইএর সদস্য সংখ্যা ২ হাজার ৩১৪ জন। কারখানার মান অনুসারে প্রতি কারখানা বিজএমইএকে বছরে পাঁচ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিয়ে থাকে। মূলত এ চাঁদার টাকা দিয়েই বিইউএফটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।

এ বিষয়ে বিইউএফটির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান মুজাফফর উদ্দিন সিদ্দিকের সঙ্গে কথা বলতে তার অফিসে যোগাযোগ করা হলে সেখান থেকে জানানো হয়, তিনি দেশের বাইরে আছেন। তবে ট্রাস্টি বোর্ডের অন্যতম সদস্য এস এম মান্নান (কচি) ইত্তেফাককে বলেন, ‘ইউজিসির নিয়মনীতি অনুযায়ী বিইউএফটি পরিচালিত হয়ে থাকে। এটি কারো কোন ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান নয়।’ তার মতে, বিইউএফটি দখল করা হয়েছে, এটি অপপ্রচার ছাড়া আর কিছুই নয়।

তবে বিজিএমইএর বর্তমান পর্ষদের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইত্তেফাককে বলেন, ‘বিইউএফটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল সদস্যদের টাকায়। কিন্তু এখন এর ফল ভোগ করছে কিছু স্বার্থান্বেষী মহল। এটির মালিকানা এখন বিজিএমইএর হাতে নেই। এমনকি এ প্রতিষ্ঠানের কোনো কর্মকাণ্ড আমাদের সঙ্গে শেয়ার করা হয় না।’

প্রসঙ্গত, বর্তমানে বিইউএফটির কার্যক্রম তুরাগের নিশাতনগরে নিজস্ব ভবনে পরিচালিত হচ্ছে। এখানে ফ্যাশন, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং, বিবিএ, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স-এর ওপর ব্যাচেলর ডিগ্রি দেওয়া হয়। এছাড়া ছয় মাস, চার মাস এবং তিন মাসের বিভিন্ন শর্ট কোর্সের ব্যবস্থাও রয়েছে এখানে।

Rupantor Television

A IP Television Channel

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »