পৌর মেয়র হত্যা মামলার আসামি পেলেন নৌকা!

পৌর মেয়র নির্বাচনে এবার নৌকা প্রতীকে টিকিট পেয়েছেন হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি। নাম আশরাফ হোসেন সরকার। যিনি নরসিংদী পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান লোকমান হোসেন হত্যা মামলার অন্যতম আসামি।

আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন। এক যুগ ধরে দলে তার কোনো পদপদবিও নেই। তাকে মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়ে জেলা পর্যায় থেকে কোনো সুপারিশও করা হয়নি। এ অবস্থায় হত্যা মামলার আসামিকে পৌর মেয়র পদে মনোনয়ন দেওয়ায় নরসিংদী জেলাজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আশরাফের এই মনোনয়নকে পাপিয়ার উত্থানের সঙ্গে তুলনা করেছেন। নরসিংদী জেলা মহিলা যুবলীগের বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক শামীমা নূর পাপিয়াকে যেভাবে যারা রাতারাতি উপরে ওঠার সিঁড়ি করে দিয়েছিল, ঠিক তেমনি আশরাফকেও প্রভাবশালী কেউ আশ্রয়প্রশ্রয় দিচ্ছেন। ফলে তিনি সবাইকে হতবাক করে রাতারাতি নৌকার টিকিট ছিনিয়ে নিয়েছেন। তবে এতে এক পাপিয়া-কাণ্ডে সরকারি দল যেমন বিব্রত হয়েছে, আশরাফের ক্ষেত্রেও তেমনটি ঘটতে যাচ্ছে।

আশরাফের দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়টি বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে নিশ্চিত করেছেন জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জিএম তালেব হোসেন। একই সঙ্গে তিনি তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘নরসিংদীর পৌর মেয়র নির্বাচনে দলীয় প্রতীক বরাদ্দের বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য দলীয় হাইকমান্ডের কাছে আবেদন করেছে জেলা আওয়ামী লীগ। মনে হচ্ছে, লোকমান হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি দলীয় হাইকমান্ডের কাছে গোপন করা হয়েছে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মেয়র পদে আওয়ামী লীগের যে দুই গ্রুপ থেকে মনোনয়ন দেওয়ার তালিকা দেওয়া হয়েছে, সেখানে আশরাফ সরকারের নাম নেই। ফলে দুই তালিকায় নাম না থাকা সত্ত্বেও তার মনোনয়নটি নতুন করে রহস্যের জন্ম দিয়েছে।’

জেলা আওয়ামী লীগের এ বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানতে আশরাফ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। বারবার ফোন করা হলেও তিনি মোবাইল ফোন রিসিভ করেননি। পরে বক্তব্য চেয়ে খুদেবার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।

প্রসঙ্গত, ২০১১ সালের ১ নভেম্বর তৎকালীন পৌর মেয়র লোকমান হোসেনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় লোকমানের ছোট ভাই বর্তমান পৌর মেয়র কামরুজ্জামান কামরুল বাদী হয়ে ওই বছরের ৩ নভেম্বর সাবেক টেলিযোগাযোগমন্ত্রী রাজি উদ্দিন রাজুর ছোট ভাই ও আশরাফ সরকারসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তৎকালীন জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ওসি মামুনুর রশীদ মণ্ডল প্রায় ৮ মাস তদন্ত শেষে ২০১২ সালের ২৪ জুন সালাহউদ্দিনসহ এজাহারভুক্ত ১১ আসামিকে বাদ দিয়ে এজাহারবহির্ভূত ১২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেন।

মামলার নথি থেকে জানা যায়, এজাহারভুক্ত তিন নম্বর আসামি শহর আওয়ামী লীগের সাবেক কোষাধ্যক্ষ মোবারক হোসেন, এজাহারভুক্ত দুই নম্বর আসামি নরসিংদী পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি আবদুল মতিন সরকার, তার ছোট ভাই শহর যুবলীগের সাবেক সভাপতি আশরাফুল ইসলাম সরকারসহ ১২ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। অভিযোগপত্র দাখিলের আগেই মোবারক হোসেন মোবা ছাড়া সবাই আদালতের মাধ্যমে জামিনে মুক্ত হয়ে যান। দীর্ঘ ৭ বছর পর ২০১৮ সালের ২৯ অক্টোবর মোবারক হোসেন মোবাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তিনিও বর্তমানে জামিনে মুক্ত রয়েছেন।

এদিকে পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে ২০১২ সালের ২৪ জুলাই নরসিংদীর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে নারাজি দেন মামলার বাদী। আদালত ২৫ জুলাই নারাজি আবেদন খারিজ করে অভিযোগপত্র বহাল রাখেন। পরে ওই বছরের ২৮ আগস্ট নারাজি আবেদন খারিজের বিরুদ্ধে জেলা ও দায়রা জজ আদালতে আপিল করা হয়। আদালত ২ সেপ্টেম্বর সেই আবেদন গ্রহণ করে ৪ নভেম্বর শুনানি শেষে ফের নারাজি আবেদন খারিজ করেন। এরপর উচ্চ আদালতে যান বাদী। তিনি ওই অভিযোগপত্র বাতিল করে বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়ে নিম্ন আদালতে বিচারকার্য স্থগিত রাখতে রিট পিটিশন দাখিল করেন। আদালত বাদীর আবেদনটি আমলে নিয়ে নিম্ন আদালতে বিচারকার্য স্থগিত করে দেন। এ ঘটনায় জামিনে বের হয়ে আসামিরা সুপ্রিমকোর্টের আপিল ডিভিশনে মামলার কার্যক্রম স্থগিত রাখতে রিট পিটিশন দাখিল করেন। এরই ধারাবাহিকতায় কয়েক বছর ধরে শুনানির অপেক্ষায় থাকার পর আদালত ২০১৯ সালের ১৪ জানুয়ারিতে আসামিদের করা রিট পিটিশনটি নিষ্পত্তি করে বাদীর নারাজি আবেদন গ্রহণ এবং বাদী ও সাক্ষীদের জবানবন্দি নিয়ে মামলাটি পুনঃতদন্তের নির্দেশ দেন। পরে ২৫ জুন দুপুরে নরসিংদী জজ আদালতের মুখ্য বিচারিক হাকিম মো. রকিবুল ইসলাম শুধু বাদী কামরুজ্জামানের জবানবন্দি গ্রহণ করে তদন্ত শেষ করেন। এ ঘটনায় বাদী জেলা ও দায়রা জজ আদালতে রিভিশন আবেদন করেন।

জানা যায়, স্থানীয় আওয়ামী লীগের গৃহবিবাদকে কেন্দ্র করে এমনটি হতে পারে বলে মনে করছেন কেউ কেউ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলা আওয়ামী লীগের এক নেতা যুগান্তরকে বলেন, প্রকাশ্যে দুই গ্রুপ একে-অপরকে কোণঠাসা করতে মরিয়া। সাবেক পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নরসিংদী সদর আসনের সংসদ সদস্য লে. কর্নেল (অব) নজরুল ইসলাম হিরু বীরপ্রতীক এবং নরসিংদী পৌর মেয়র ও শহর আওয়ামী লীগ সভাপতি কামরুল ইসলাম প্রকাশ্যে দলীয় কোন্দলে জড়িয়ে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছেন বলে অনেকে মনে করেন। বিষয়টি বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা এ নিয়ে প্রতিবেদনও দেয়। ১৯ নভেম্বর অনেকটা আকস্মিকভাবেই নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নজরুল ইসলাম হিরু এমপি ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মতিন ভূঁইয়াকে দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। একই সঙ্গে জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি জিএম তালেবকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক পীরজাদা কাজী মো. আলীকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। দলের নীতিনির্ধারকদের হঠাৎ এমন সিদ্ধান্তে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন নজরুল ইসলাম হিরু বীরপ্রতীক সমর্থকরা। অন্যদিকে বেশ উৎফুল্ল ছিলেন মেয়র কামরুল ইসলামের অনুসারীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নরসিংদী পৌর মেয়র ও শহর আওয়ামী লীগ সভাপতি কামরুল ইসলামের সঙ্গে আছেন জেলার ডাকসাইটে সব নেতা। এর মধ্যে মনোহরদী-বেলাব আসনের সংসদ সদস্য শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন, পলাশের এমপি ডা. কামরুল আশরাফ খান দিলীপ, শিবপুরের এমপি জহুরুল হক ভূঁইয়া মোহনসহ জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা। তবে পৌর নির্বাচনে কামরুল ইসলাম মনোনয়নবঞ্চিত হওয়ায় তারা হতাশ হয়েছেন।

Rupantor Television

A IP Television Channel

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »