সিএমএম’র আদেশ মানছেন না ম্যাজিস্ট্রেট

নকশাবহির্ভূত দোকান বরাদ্দের অভিযোগে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সাবেক মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকনসহ সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। মামলায় ফুলবাড়িয়া সিটি সুপার মার্কেট-২-এর মূল বিল্ডিংয়ের নকশাবহির্ভূত স্থাপনা তৈরি ও দোকান বরাদ্দ দেওয়ার নামে মোটা অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়।

গত ২৯ ডিসেম্বর জাকের সুপার মার্কেট ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি দোলোয়ার হোসেন বাদী হয়ে আদালতে মামলাটির আবেদন করেন। পরদিন ঢাকার এক ম্যাজিস্ট্রেট মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) তদন্তের নির্দেশ দেন। একইসঙ্গে আগামী ৩১ জানুয়ারি মামলার প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য করা হয়।

মামলায় সাঈদ খোকন ছাড়াও ডিএসসিসির সাবেক প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা ইউসুফ আলী সরদার, সাবেক উপসহকারী প্রকৌশলী মাজেদ, নোয়াখালীর কামরুল হাসান, হেলেনা আক্তার, আতিকুর রহমান স্বপন ও ওয়ালিদকে আসামি করা হয়। মামলার অভিযোগে বলা হয়, সাবেক মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন, সাবেক প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা ইউসুফ আলী সরদার ও উপসহকারী প্রকৌশলী মাজেদ পরস্পর যোগসাজশে ফুলবাড়িয়া সিটি সুপার মার্কেট-২-এর মূল বিল্ডিংয়ের নকশাবহির্ভূত অংশ হিসেবে স্থাপনা তৈরি করে দোকান বরাদ্দ দেওয়ার ঘোষণা দেন। পরবর্তী সময়ে আসামিদের যোগসাজশে বিনা রসিদে বা কোনো প্রকার ডকুমেন্ট ছাড়াই বিপুল অঙ্কের অর্থ নগদে গ্রহণ করা হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় ৩৪ কোটি ৮৯ লাখ ৭০ হাজার ৫৭৫ টাকা সাঈদ খোকনের নির্দেশে ব্যাংক অ্যাকাউন্টেও জমা দেওয়া হয়। আর বাদীর কাছ থেকে মোট ৭৫ লাখ টাকা বিভিন্ন অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে নেওয়া হয়। এ মামলায় সাঈদ খোকন, ইউসুফ আলী সরদার ও প্রকৌশলী মাজেদ সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় ক্ষমতার অপব্যবহার করে ওই দুর্নীতি করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়। ফলে মামলাটি দুদকের তফসিলভুক্ত অপরাধের হওয়ায় এর তদন্তের এখতিয়ার শুধু দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক)-এমন মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

অপর একটি মামলার এজাহার পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, রাজধানীর কাছাকাছি এলাকায় ১০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্পে শত শত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে গত ১৪ ডিসেম্বর আদালতে মামলা হয়। ‘ঢাকা শহর সন্নিকটবর্তী এলাকায় ১০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্পের’ গবেষণা কর্মকর্তা মো. আব্দুর রাজ্জাক বাদী হয়ে মামলাটি করেন। ঢাকার অপর এক ম্যাজিস্ট্রেট মামলাটি তদন্তের জন্য পিবিআইকে নির্দেশ দেন।

একইসঙ্গে আগামী ২৮ জানুয়ারি প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য করা হয়। মামলায় সহযোগী অধ্যাপক ও সাবেক প্রকল্প পরিচালক ড. মো. আমিরুল ইসলাম, চিফ অ্যাকাউন্স অ্যান্ড ফিন্যান্স অফিসারের কার্যালয়ের নিরীক্ষা ও হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা সরোজিত কুমার ঘোষ, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সদস্যসচিব দিল আফরোজ বিনতে আছির, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রফেসর ড. সৈয়দ মো. গোলাম ফারুককে আসামি করা হয়। মামলার অভিযোগে বলা হয়, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে জাল-জালিয়াতি ও দুর্নীতি করে ঢাকা শহর সন্নিকটবর্তী এলাকায় ১০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের মধ্যে অন্তত ৪৭৮ কোটি টাকা অতিরিক্ত বিল করেন। ৬৭৩ কোটি টাকার প্রকল্প ব্যয় এক হাজার ১২৪ কোটি টাকায় বৃদ্ধি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠান। এভাবে আসামিরা প্রকল্পের জনবল নিয়োগ, জমি চিহ্নিতকরণ ও ক্রয়, ভুয়া বিল করে সরকারি অর্থ উত্তোলনপূর্বক আত্মসাৎ করেন। এ মামলায় আসামিরা সরকারি দায়িত্ব পালনকালে ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে ওই দুর্নীতি করেছেন। ফলে মামলাটি দুদকের তফসিলভুক্ত অপরাধের হওয়ায় এ মামলারও তদন্তের এখতিয়ার শুধু দুদকের।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, উল্লিখিত দুটি মামলার ক্ষেত্রেই আইনের তোয়াক্কা না করে পিবিআইকে এর তদন্তভার দেওয়া হয়েছে। যদিও দুদকের তফসিলভুক্ত অপরাধের ক্ষেত্রে চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) এএম জুলফিকার হায়াত সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা নিয়েছেন। সেখানে দুদক তফসিলের বিধান প্রতিপালনের জন্য ম্যাজিস্ট্রেটদের ‘বিশেষভাবে অভিনিবেশ প্রয়োগ’ এবং সব থানার অফিসার ইনচার্জকে ‘সজাগ দৃষ্টি রাখার’ নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর সেই আদেশের প্রতিপালন করা হয়নি।

তারা আরও জানান, আইন অনুসারে দুদকের তফসিলভুক্ত অপরাধের অনুসন্ধান ও তদন্তের এখতিয়ার শুধু কমিশনের। এরপরও এভাবেই হরহামেশা দুদকের তফসিলভুক্ত অপরাধের মামলার তদন্ত পুলিশ ও অন্যান্য তদন্ত সংস্থাকে করতে দেখা যাচ্ছে। এতে একদিকে যেমন আইনের ব্যত্যয় ঘটছে, অপরদিকে মামলাগুলোর ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। কারণ, এখতিয়ারবহির্ভূত তদন্ত শেষে কোনো আসামির বিরুদ্ধে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দেওয়া হলে তা উচ্চতর আদালতে গিয়ে আইনের লড়াইয়ে হেরে যায়। এখতিয়ারবহির্ভূত এসব তদন্তের সর্বোপরি সুফল পায় আসামিরা।

জানতে চাইলে দুদকের সাবেক মহাপরিচালক (লিগ্যাল) ও সাবেক সিনিয়র জেলা জজ মো. মঈদুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, দুদকের তফসিলভুক্ত অপরাধের মামলার তদন্তভার অন্য কোনো সংস্থাকে দেওয়ার ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিত। এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত কাজ এর আগেও হয়েছে। আর তা ঠেকাতেই থানা পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেটদের ওই আদেশ দিয়েছিলেন সিএমএম। ওই দুই মামলায় আদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দুই ম্যাজিস্টেট সিএমএম-এর আদেশ অবজ্ঞা করেছেন। মামলা দুটির তদন্তভার পিবিআইকে দেওয়া হয়েছে। যা হবে সম্পূর্ণ পণ্ডশ্রম। আলোচ্য ক্ষেত্রে আইনজীবীদের উচিত ছিল দুদকে অভিযোগ দেওয়া। তা না হলে তারা মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজের কাছেও মামলার আবেদন দিতে পারতেন। তিনি আরও বলেন, সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেটদের উচিত ছিল মামলা দুটি পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ না দিয়ে ফেরত দেওয়া। যেহেতু দুই মামলার অভিযোগে সরকারি কর্মকর্তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে দুর্নীতি করেছেন। সেহেতু এ মামলা আমলে নেওয়ার এখতিয়ার ম্যাজিস্ট্রেটের নেই। এটা সম্পূর্ণ বেআইনি। এখন পিবিআই আদালতে প্রতিবেদন দিয়ে বলতে পারে যে, তাদের তদন্তের এখতিয়ার নেই।

ম্যাজিস্ট্রেট ও থানার ওসিদের প্রতি সিএমএম’র নির্দেশনা : গত ২৭ অক্টোবর ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এএম জুলফিকার হায়াত এক অফিস আদেশ জারি করেন। সেখানে বলা হয়, দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর তফসিলের (খ)(আ)-এ উল্লিখিত পেনাল কোডের ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ এবং ৪৭৭এ ধারার অপরাধগুলো সরকারি সম্পদ সম্পর্কিত হলে অথবা সরকারি কর্মচারী বা ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারী বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্তৃক দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনকালে সংঘটিত হলে ওই বিষয়ে মামলা রুজু করা এবং তদন্ত করার এখতিয়ার শুধু দুর্নীতি দমন কমিশনের রয়েছে। কিন্তু ইদানীং লক্ষ করা যাচ্ছে, ওই তফসিলে বর্ণিত অপরাধের ক্ষেত্রেও থানায় মামলা রুজু করা হচ্ছে এবং পুলিশ ও অন্যান্য তদন্ত সংস্থা তদন্ত করছে। এ অবস্থায় পেনাল কোডের ওই প্রকৃতির অপরাধগুলোর কোনো মামলা থানায় রুজু হয়ে থাকলে এবং কোর্টের দায়িত্বপ্রাপ্ত মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটদের কাছে উপস্থাপন করা হলে, তা ওই তফসিলে বর্ণিত ক্ষেত্র এবং ব্যক্তিদের দ্বারা সংঘটিত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিশেষভাবে অভিনিবেশ প্রয়োগ করার জন্য সব মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটকে নির্দেশ দেওয়া হলো। একইসঙ্গে থানায় মামলা রুজু করার আগে উপরিউক্ত তফসিলের বিধান প্রতিপালন হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি রাখার জন্য সব থানার অফিসার ইনচার্জকে (ওসি) নির্দেশ দেওয়া হলো।

Rupantor Television

A IP Television Channel

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »