২০২১ :শিল্পচর্চিত আয়ের নতুন বিপ্লবের বছর হবে

ব্যাপক রদবদলের বছর ২০২০। সেই বদলের প্রতিচ্ছবি দেখা যাবে নতুন বছরে। মহামন্দা বা শিল্পীদের বেকার হওয়ার আলোচনাই শুধু নয়, সবচেয়ে বড় বিষয় নাটক, সিনেমা ও গানে বিকল্প প্লাটফর্মকে কেন্দ্র করে নতুনভাবে জীবিকানির্বাহের পরিকল্পনা করছেন সকলেই। ২০২১-এ হয়তো সেদিকেই সবার মনোযোগ থাকবে। তা নিয়েই কিছু সম্ভাবনার আলোচনা থাকছে ২০২১-এর প্রথম প্রতিবেদনে—

সিনেমার ওটিটি ও অনলাইন ফেস্টিভ্যাল

চলচ্চিত্রে নতুনভাবে বাঁচার পরিকল্পনায় সারাবছর কোনো আলোচনা হয়নি। বরং উল্টো সাংগঠনিক কোন্দল দেখা গিয়েছিল গতবছর। এতে যে ক্ষতিটা হয়েছে তা হলো—সিনেমা শিল্পের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে গেছে ক্রমশ। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ছোটখাটো বাজেটের ছবিগুলো এখন অনলাইনে রিলিজ দিয়ে আয়ের বিকল্প পথ খুঁজছে। কারণ ২০২১ সাল শুধু সিনেমা হল নির্ভর আর থাকবে না চলচ্চিত্র। যা আগেও ছিল না তেমনটা। তবে গতবছর করোনা আক্রান্তের এই পুরো সময়টায় চলচ্চিত্রকে ভাবতে শিখিয়েছে। যদিও এখন অবধি পূর্ণাঙ্গ ভিডিও প্লাটফর্ম বাংলাদেশে চালু হয়নি। তবে এ বছরেই বেশ ক’টি নতুন প্লাটফর্ম থেকে নিয়মিত চলচ্চিত্র, ডকুফিল্ম ও ওয়েব সিরিজ প্রকাশ পাবে বলে জানা যায়। সেক্ষেত্রে মেধার প্রতিযোগিতার পাশাপাশি জনপ্রিয় তারকাদের নতুন সম্ভাবনার বছর হবে এটি। একইসঙ্গে ওটিটি বা ডিজিটাল প্লাটফর্মগুলো যেহেতু থাকবে তরুণদের নিয়ন্ত্রণে, তাই শিল্পচর্চাতেও ব্যাপক বিপ্লব ঘটবে। ক্রেতা-দর্শকদের প্যাটার্ন বদলাবে। এ প্রসঙ্গে নির্মাতা অমিতাভ রেজা চৌধুরী এক সাক্ষাত্কারে প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমাদের সম্ভাবনার কোনো ঘাটতি নেই। সমস্যা হলো আমরা সম্ভাবনাগুলোকে বিকশিত হতে দেবো কি-না সেটা নিয়ে। ওটিটি তো আপনার কোনো আঞ্চলিক দর্শকের জন্য না। এটি সারাবিশ্বের বাংলা ভাষাভাষী বা কিছু বিদেশি দর্শকের জন্য। বাজারটা বিশাল। সম্ভাবনাটাও তাই বিশাল। এ নিয়ে উন্মুক্ত বাজার প্রতিযোগিতার স্বাধীনতাটা জরুরি। আর যদি সেখানে হস্তক্ষেপ করা হয় তাহলে ব্যবসা ঠিকই চলবে, কিন্তু ব্যবসাটা আর আমাদের থাকবে না। অন্যরা বাণিজ্য করে নিয়ে যাবে।’

উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ২০১৯-এ নেটফ্লিক্স প্রায় ২০ কোটি টাকা আয় করেছে বাংলাদেশি সাবস্ক্রিপশন থেকে। ২০২০ পেরিয়ে নতুন বছরে এসে তা কয়গুণ লক্ষ্যমাত্রায় দাঁড়াবে সেটার হিসেবও তারা কষে ফেলেছেন।

পাশাপাশি অনলাইন ফেস্টিভ্যালের যে প্রচলন শুরু হলো, তা করোনা বিদায় নিলেও বন্ধ হবে বলে মনে হয় না। কারণ কম বাজেটে এই কানেক্টিভিটির চেষ্টাটা যে দারুণ কার্যকর তা বুঝিয়ে দিয়েছে গতবছরের করোনা আক্রমণ!

নাটকে নির্মাতা কম, বরং কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের বছর হয়ে উঠবে

এটাকে কেউ অবক্ষয় বলবে। কেউ বলবে যুগের চাহিদা। তবে ক্রিকেটকে যেমন পূর্ণ বাণিজ্যিক করার জন্য টি-টুয়েন্টি চালু হয়েছিল, নাটকে এখন যুগের হাওয়ায় টি-টুয়েন্টির বছর হবে বলে সবাই ধারণা করছেন। সেই টি-টুয়েন্টির নাম ১০/১২ মিনিটের নাটক বা ব্যাপ্তিতে তার কম সময়। এটা একইসঙ্গে আশঙ্কা ও বিশাল সম্ভাবনার। কারণ এমনিতেই ইউটিউব নির্ভর এই ইন্ডাস্ট্রি হবে নতুন কন্টেন্টের বছর। সেক্ষেত্রে অনেকেই সিনেমাকে ভেঙে ওয়েব সিরিজ বানাবে ব্যবসায়িক নিশ্চয়তার জন্য বা নাটককে ভেঙে ছোটখাটো কন্টেন্ট নির্মাণ চলবে। সে প্রস্তুতি এরই ভেতরে নির্মাতা-শিল্পীদের মধ্যে শুরু হয়ে গেছে।

নিজেস্ব ইউটিউব ও সাইট নির্মাণের বছর হবে

গতবছরই তারকাদের বুঝিয়ে দিয়েছে যে, নিজেস্ব মেধা যোগ্যতায় অনলাইন প্লাটফর্মের মর্ম কী! সেই লক্ষ্যে ২০২১-এ অধিকাংশ নির্মাতা-তারকা নিজেদের নিজেস্ব ইউটিউব চ্যানেল, ফেসবুক ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন অ্যাপে চুক্তিবদ্ধ হবেন। দর্শক চাহিদা ও সুদূরপ্রসারি তারকারা এই দৌড়ে এগিয়ে থাকবেন এটা চোখ বুঁজেই বলা যায়। তাই এই রেসের বাজারে কোনো কোনো তারকা খুব অর্থকড়ি উপার্জন করবেন, অধিকাংশ তারকা থাকবেন বিপাকে, হতাশায়, প্রযুক্তির বিমুখতায়!

চ্যানেলগুলো ব্যস্ত হবে কন্টেন্ট ক্রিয়েটর হিসেব থেকে অ্যাপ বাণিজ্যে

দর্শক চাহিদা ও নিজেদের ব্যবসায়িকভাবে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে গতবছর করোনা সংকট থেকেই চ্যানেলগুলো দুটি ফর্মেটে অনুষ্ঠান নির্মাণ করা শুরু করেছে। চ্যানেলের নামে ডিজিটাল শব্দ যোগ করে তা ফেসবুক ও ইউটিউব চ্যানেলকে প্রমোট করেছে। এটিই ২০২১-এর মূল চালিকাশক্তি হবে। এরই ধারাবাহিকতায় নতুন বছরে বেশ ক’টি চ্যানেল নিজেদের পুরনো ভিডিও রসদ নিয়ে অ্যাপভিত্তিক ব্যবসা শুরু করতে পারেন। যা এরই ভেতরে বেশকিছু চ্যানেলে আলোচনা শুরুও হয়ে গেছে। সেটিই হয়তো কার্যকর একটি রূপে দাঁড়াবে নতুন বছরে।

গানে অধিকার সংরক্ষণ ও ক্রিয়েটরদের বছর

সংগীতাঙ্গনে শিল্পীদের নিজেস্ব গানের অধিকার সংরক্ষিত হলে তা অবশ্যই ক্রিয়েটরদের জন্য নতুন সুখের বার্তা তৈরি করবে। তারকা শিল্পীরা বিভিন্ন অ্যাপ বা লেবেল কোম্পানির নামের ইউটিউব চ্যানেলে কাজ করলেও শিল্পীরা এরই ভেতরে নিজেদের ইউটিউব চ্যানেলকে সমৃদ্ধ করার জন্য তত্পর হয়েছেন। মনির খান, হাবিব, হূদয় খান, ইমরান থেকে শুরু করে একাধিক তারকা নিজেদের ইউটিউব প্লাটফর্ম নিয়েও নতুন বছরে মনোযোগ দেবেন। কারণ ২০২০-এর করোনা সংকট অনেককেই এ বিষয়ে সচেতন হতে শিখিয়েছেন। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে, কণ্ঠশিল্পীদের গান প্রচার ও বিপণনের জন্য ইউটিউব নির্ভরতার বাইরে নতুন কোনো অ্যাপ জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারেনি। ফলে গান শুধুমাত্র দৃশ্য নির্ভর হয়ে রয়েছে। উল্লেখ্য যে, ইউটিউবে কোনো গান পোস্ট করলে তার পূর্ণাঙ্গ অডিও কোয়ালিটি পাওয়া সম্ভব না। অথচ গানের একমাত্র বড় প্লাটফর্ম হয়ে আছে এই ইউটিউবই। ২০২১ সালে নতুন মিউজিক অ্যাপ প্রতিষ্ঠা ও এর আত্মর্জাতিক বাণিজ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ নেবে—এমনটাই প্রত্যাশা সকলের। একইসঙ্গে স্টেজ নির্ভরতা কমিয়ে শিল্পীরা নিজেদের মৌলিক গানে মনোযোগ দেবেন এমনটা দেখা যেতে পারে। এর পাশাপাশি বিতর্কিত গান, অশিল্পীদের গান, ভাইরাল দৌড় ও বাণিজ্যিক স্থুল চর্চাও হয়তো বাড়বে উন্মুক্ত গানের কারণে। এটাই হয়তো সময়ের নিষ্ঠুরতা!

নতুনের গর্জনে

২০২০ সালকে নিজেদের প্রমাণের বছর রেখে ২০২১-এ এসে পরিণত তারকা হয়ে রাজত্ব দখল করেছে কেউ কেউ। যাদের হয়তো ২০১৯-এ তেমন একটা ব্যস্ততায় দেখা যায়নি। কিন্তু নিজেরা সচেতন হলে ২০২১ সালটা তারা হাতের মুঠোয় নিয়ে আসতে পারবে। তাদের ভেতরে রয়েছে অভিনেতা ও আর জে ফারহান, সারিকা সাবাহ, তাসনিয়া ফারিন, গানে নোবেল, চলচ্চিত্রে সুনেহরা। এর ভেতরে নোবেল বিগত সময়ে নানা অনুসঙ্গে বিতর্কের জন্ম দিলেও তার গায়কীশক্তি ও পরবর্তীতে শীর্ষ অডিও কোম্পানি সাউন্ডটেকের সঙ্গে চুক্তি গড়াকে মূল্যায়ন করলে ২০২১-এর নতুন রাজত্ব হতে পারে তার, যদি পুরনো ভুল শুধরে শুধু গানটাকেই যাপনে নেন তিনি! অন্যদিকে দুঃখজনক হলেও সত্য চলচ্চিত্রে কোনো তারকা তৈরি হয়নি ২০২০-এ। খরার এই বছরে এ ব্যর্থতার দায় করোনা ও নির্মাতা উভয়েরই। কারণ ছবি নির্মাণের গল্প কমে এসেছে, পাশাপাশি তা প্রজেকশনের পথ যেহেতু বন্ধ ছিল তাই নতুন তারকা আর আসবে কোত্থেকে? তবে প্রথম ছবিতেই জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রাপ্ত ন ডরাইয়ের সুনেহরাকে নিয়ে সম্ভাবনা দেখা যেতেই পারে, যদি তিনি পেশাদার হিসেবে চলচ্চিত্রে অভিনয়ের কাজটি নিয়মিত করার পণ করেন!

Rupantor Television

A IP Television Channel

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »