বছরজুড়ে আলোচনায় র‌্যাব পুলিশের ৯ অভিযান

করোনাভাইরাস মহামারীর বছর ২০২০। থমকে ছিল সবকিছু। তবে সক্রিয় ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। করোনা চিকিৎসা ও সুরক্ষা সামগ্রী সরবরাহ নিয়ে প্রতারণার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ছিল তাদের।

এ বছর অপরাধ ও অনিয়মে জড়িত থাকায় সরকারি দলের এমপি থেকে শুরু করে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রভাবশালী বিভিন্ন ব্যক্তির বাড়ি এবং প্রতিষ্ঠানে একাধিক অভিযান হয়েছে। বছরজুড়ে এমন নয়টি অভিযান ছিল ব্যাপক আলোচনায়।

বছরের শুরুতে সবচেয়ে আলোচিত ছিল ক্যাসিনোকাণ্ডের হোতা গেণ্ডারিয়ার আওয়ামী লীগ নেতা এনামুল হক এনু ও রুপন ভূঁইয়াকে সিআইডি’র গ্রেফতার অভিযান। ছোট লোহা-লক্করের দোকানি থেকে অবৈধ উপায়ে এই দুই সহদোর ১২০টি বাড়ির মালিক হন।

এরপরেই দেশজুড়ে আলোচনায় আসে র‌্যাবের হাতে আটক যুবলীগ নেত্রী শামীমা নূর পাপিয়ার নানা অপকর্ম। আলোচিত এই দুই অভিযানের পর পরই শুরু হয় করোনাভাইরাসের প্রকোপ। মার্চে দেয়া হয় লকডাউন।

এ সময় আলোচনায় আসে রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক মো. সাহেদ ও জেকেজি হেলথ কেয়ারের চেয়ারম্যান সাবরিনা আরিফ চৌধুরীর করোনার নমুনা সংগ্রহ করে ভুয়া রিপোর্ট দেয়ার বিষয়টি।

আলোচনায় ছিলেন নকল এন-৯৫ মাস্ক সরবরাহের অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী রেজিস্ট্রার শারমিন জাহানও।

এরপর আলোচিত হয় হাজী সেলিমের পুরান ঢাকার ‘চাঁন সরদার দাদা বাড়ী’তে র‌্যাবের অভিযান ও তার কাউন্সিলর পুত্র ইরফান সেলিমকে আটকের বিষয়টি।

নবাব পরিবারের সন্তান পরিচয়ে প্রতারণার অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া নবাব খাজা আলী হাসান আসকারীকে নিয়েও ছিল আলোচনা। ভুয়া পরিচয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া আসকারীর ‘নবাবী স্টাইলে’ চলাফেরার বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়।

বছরের শেষ দিকে নভেম্বরে গামছা বিক্রেতা থেকে জমি ব্যবসার ‘মাফিয়া’ হয়ে ওঠা গোল্ডেন মনিরের বাসায় র‌্যাবের অভিযান ছিল আলোচনার কেন্দ্রে।

এর বাইরে সাদিয়া জান্নাত ওরফে জান্নাতুল ফেরদৌসের ‘পাত্র চাই’ বিজ্ঞাপন দিয়ে ৩০ কোটিরও বেশি টাকা হাতিয়ে নেয়া হতবাক করেছিল সবাইকে।

ক্যাসিনোকাণ্ডের এনু ও রুপন গ্রেফতার : ১৩ জানুয়ারি ক্যাসিনোকাণ্ডের হোতা গেণ্ডারিয়ার আওয়ামী লীগ নেতা এনামুল হক এনু ও রুপন ভূঁইয়াকে গ্রেফতার করে সিআইডি।

গ্রেফতারের সময় তাদের কাছ থেকে নগদ ৪০ লাখ টাকা ও ১২টি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। ছোট লোহা-লক্কড়ের দোকানি থেকে বিপুল অর্থের মালিক হয়েছিলেন তারা। জিজ্ঞাসাবাদে তারা নিজেদের ১২০টি বাড়ি আছে বলে তথ্য দিয়েছে।

পাপিয়ার ১২৯ দিনের হোটেল বিল ৩ কোটি ২৩ লাখ টাকা : বছরের শুরুর দিকে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল যুবলীগ নেত্রী শামীমা নূর পাপিয়ার (২৮) গ্রেফতার। ২২ ফেব্রুয়ারি প্রতারণা, অবৈধ অর্থ পাচার, জাল টাকা সরবরাহ, মাদক ব্যবসা ও অনৈতিক কাজে জড়িত থাকার অভিযোগে পাপিয়াকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। টানা ৪ মাস ৯ দিন গুলশানের একটি পাঁচ তারকা হোটেলের চারটি কক্ষ (একটি প্রেসিডেনশিয়াল স্যুটসহ) ভাড়া নিয়েছিলেন শামীমা নূর পাপিয়া। ২০১৯ সালের ১৩ অক্টোবর থেকে চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত হোটেলটির কক্ষ ভাড়া, খাবার, আনুষঙ্গিক খরচসহ তিনি মোট বিল পরিশোধ করেছেন ৩ কোটি ২৩ লাখ টাকা। প্রতিদিন হোটেলের বিল বাবদ গড়ে খরচ করেছেন আড়াই লাখ টাকা।

রিজেন্ট হাসপাতালের সাহেদ গ্রেফতার : করোনার ভুয়া পরীক্ষা করে দেশজুড়ে আলোচনায় ছিলেন রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মো. সাহেদ। ৬ জুলাই সীমাহীন অনিয়ম ও অপকর্মের অভিযোগের ভিত্তিতে উত্তরার রিজেন্ট হাসপাতালে অভিযান চালায় র‌্যাব। পরদিন অভিযান চলে হাসপাতালের মিরপুর শাখায়। এরপর থেকে বেরিয়ে আসতে থাকে সাহেদের চাঞ্চল্যকর সব প্রতারণার তথ্য। জানা যায়, অন্তত ছয় হাজার নমুনা কোনো পরীক্ষা না করেই করোনাভাইরাসের মনগড়া পজিটিভ-নেগেটিভ রিপোর্ট দিয়েছিলেন তিনি। হাসপাতালটির ছিল না কোনো অনুমোদন। এছাড়া দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতারণার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়েছিলেন সাহেদ।

করোনার নমুনা সংগ্রহ করে ড্রেনে ফেলত জেকেজি : করোনাভাইরাস টেস্টের নামে প্রতারণার অভিযোগে ২৩ জুন জেকেজি হেলথ কেয়ারের চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরীর স্বামী আরিফ চৌধুরীসহ ছয়জনকে গ্রেফতার করে তেজগাঁও থানা পুলিশ। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। কর্মচারী হুমায়ুন কবির ও তার স্ত্রী তানজিনা পাটোয়ারী জানান, করোনার নমুনা সংগ্রহ করে তা পরীক্ষা না করে ড্রেনে ফেলে দিত জেকেজি। এভাবে তারা হাতিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা।

মাস্ক কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে গ্রেফতার ঢাবির সহকারী রেজিস্ট্রার : বছরের অন্যতম আলোচিত ঘটনা ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) নকল এন-৯৫ মাস্ক সরবরাহের ঘটনা। এ ঘটনায় ২৪ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারি রেজিস্ট্রার শারমিন জাহানকে গ্রেফতার করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিলেন, অপরাজিতা ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী শারমিনের সরবরাহ করা এক হাজার ৭০০ মাস্কের মধ্যে নকল মানহীন মাস্ক পাওয়া যায়।

নবাব পরিবারের সন্তান পরিচয়ে প্রতারণা : ২৮ অক্টোবর নবাব পরিবারের সন্তান পরিচয়ে প্রতারণার অভিযোগে নবাব খাজা আলী হাসান আসকারীকে (৪৮) পাঁচ সহযোগীসহ গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম বিভাগ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফুপু পরিচয় দিতেন তিনি। আরও বলতেন, দুবাইয়ে তার গোল্ডের কারখানা রয়েছে। বাবা ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের চেয়ারম্যান, থাকেন নিউইয়র্কে। সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালের মালিকানায় অংশীদারিত্ব রয়েছে তাদের। বাবার কোটি কোটি টাকার ব্যবসা পরিচালনা করেন তিনি নিজেই। চলেন বডিগার্ড নিয়ে। নিজে থাকেন নেদারল্যান্ডসে। এরকম আরও অনেক ভুয়া পরিচয় ছিল তার। এসব পরিচয় দিয়ে ভয়ঙ্কর এ প্রতারক সাধারণ মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নেন কোটি কোটি টাকা।

হাজী সেলিমের বাসায় র‌্যাবের অভিযান : চলতি বছরের অন্যতম আলোচিত ঘটনা ছিল পুরান ঢাকার দাপুটে নেতা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের এমপি হাজী সেলিমের বাসায় র‌্যাবের অভিযান। ২৫ অক্টোবর সন্ধ্যার পর রাজধানীর কলাবাগান ক্রসিংয়ের কাছে মারধরের শিকার হন নৌ বাহিনীর কর্মকর্তা ওয়াসিফ আহমেদ খান। তার মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দিয়েছিল সংসদ সদস্যের স্টিকার লাগানো একটি গাড়ি। এরপর গাড়ি থেকে নেমে কয়েক ব্যক্তি ওই কর্মকর্তাকে বেদম প্রহার করেন ও তার স্ত্রীকে নাজেহাল করেন। এ ঘটনায় ধানমণ্ডি থানায় হত্যাচেষ্টার মামলার পর ২৬ অক্টোবর পুরান ঢাকার চকবাজারে হাজী সেলিমের রাজসিক প্রাসাদ ‘চাঁন সরদার দাদা বাড়ী’তে দিনভর অভিযান চালায় র‌্যাব। এ সময় র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত হাজী সেলিমের ছেলে ইরফান সেলিমকে মাদক রাখার দায়ে এক বছর ও অবৈধ ওয়াকিটকি রাখার কারণে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেন। চকবাজার থানায় অস্ত্র ও মাদক আইনে আরও চারটি মামলা হয়। কয়েক দফায় রিমান্ডে নেয়া হয় তাদের। এসব ঘটনার পর হাজী সেলিমের পুরান ঢাকার সাম্রাজ্য ওলটপালট হতে শুরু করে।

গোল্ডেন মনিরের বাসায় র‌্যাবের অভিযান : ২১ নভেম্বর রাজধানীর মেরুল বাড্ডায় স্বর্ণ ব্যবসায়ী মনির হোসেন ওরফে গোল্ডেন মনিরের বাসায় অভিযান চালায় র‌্যাব। ওই বাড়ি থেকে ৯ লাখ টাকা মূল্যমানের বিদেশি মুদ্রাসহ ১ কোটি ৯ লাখ টাকা, চার লিটার মদ, ৮ কেজি স্বর্ণ, একটি বিদেশি পিস্তল ও কয়েক রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে র‌্যাব। গামছা বিক্রেতা থেকে জমির ব্যবসার ‘মাফিয়া’ হয়ে ওঠা মনিরের বিপুল অর্থ-বিত্তের মালিক হওয়ার বিষয়টিও ওই অভিযানের পর সামনে আসে।

গণপূর্ত ও রাজউকের সঙ্গে তিনি সখ্য গড়ে তোলেন এক মন্ত্রীর সঙ্গে। এরপর তাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। মনির ঢাকা ও আশপাশে ২০ বছরে ২ শতাধিক প্লট-ফ্ল্যাটের মালিক হন। তিনি প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ৩৫টি প্লটের কথা স্বীকার করেন।

‘পাত্র চাই’ বিজ্ঞাপন দিয়ে ৩০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া সাদিয়া গ্রেফতার : বছরের আলোচিত প্রতারণাগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল ‘পাত্র চাই’ বিজ্ঞাপন দিয়ে ৩০ কোটিরও বেশি টাকা হাতিয়ে নেয়া। অবশেষে প্রতারক সাদিয়া জান্নাত ওরফে জান্নাতুল ফেরদৌসকে গ্রেফতার করা হয়। ১৮ সেপ্টেম্বর তাকে গ্রেফতারের খবর জানায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

তারা জানায়, আমেরিকা-কানাডার সিটিজেন, প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী- এমন পরিচয়ে পত্রিকায় পাত্র চেয়ে চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন সাদিয়া। নিজেকে ‘নামাজি পাত্রী’ ও ‘ডিভোর্সি’ পরিচয়ে কানাডায় ২০০ কোটি টাকার ব্যবসা দেখভালের জন্য পাত্র চেয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতেন তিনি।

Rupantor Television

A IP Television Channel

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »