নিস্তরঙ্গ রাজনীতিকে ঘরে তুলেছে করোনা

‘ঘরোয়া রাজনীতি’— কথাটির সঙ্গে দেশের মানুষ সর্বশেষ পরিচিত হয়েছিলেন কথিত ওয়ান ইলেভেনের সময় জরুরি অবস্থাকালে। আর ‘ভার্চুয়াল রাজনীতি’ বা ‘ই-রাজনীতি’ শব্দগুলোর সঙ্গে পরিচয় করাল প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস। রাজনীতির চলমান বাস্তবতায় ২০২০-এর শুরুতে রাজনীতির মাঠ কিছুটা সরগরম ছিল। পৃথিবী নামক গ্রহে হানা দেওয়া করোনা ভাইরাস মার্চের শেষদিকে বাংলাদেশেও ছড়িয়ে পড়লে রাজনীতির অতীতের চিরাচরিত সব ধরনের দৃশ্যপটই একেবারে বদলে যায়, বলা যায় পালটে যায় চিরচেনা রাজনীতির খোলনলচ। চলতে থাকা নিস্তরঙ্গ রাজনীতিকেও পথ-ঘাট-মাঠ ও দলীয় কার্যালয় থেকে ঘরে ঢুকিয়ে দিয়েছে করোনা।

করোনার থাবায় সব রাজনৈতিক দলেরই কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে শুরু করে দেশব্যাপী থাকা বিভিন্ন স্তরের কার্যালয়গুলো মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে টানা কয়েক মাস অঘোষিত লকডাউনে চলে যায়, দলীয় কার্যালয়গুলো হয়ে পড়ে নেতাকর্মীশূন্য প্রায়। করোনা-আতঙ্কে রাজনৈতিক দলগুলোর সীমিত কার্যক্রম চলে প্রযুক্তির সহযোগিতায়। রাজনীতি হয়ে পড়ে পুুরোপুরি ভিডিওবার্তা, ভিডিও কনফারেন্স, ই-মেইল, ফোন, ফেসবুক ম্যাসেঞ্জার, ইমো, হোয়াটসঅ্যাপ ও ভাইবার নির্ভর। অবশ্য ভার্চুয়াল রাজনীতির মধ্যেও করোনাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে ভার্চুয়াল বাহাস চলতে দেখা যায় বিএনপিসহ সরকারবিরোধী বিভিন্ন দলের নেতাদের।

করোনা বিদায় হয়নি, বরং দুনিয়া জুড়ে এখন আবার নতুন ধরনের করোনা ভাইরাসের আতঙ্ক। মাস্ক পরিধানসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে সরকারি নির্দেশনা থাকলেও দেশে আর লকডাউন নেই। শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো বন্ধ। করোনার ঝুঁকির মধ্যেই অবশিষ্ট সবকিছুই প্রায় স্বাভাবিক। লকডাউন উঠে যাওয়ার পর রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যালয়সমূহও খুলেছে। করোনার আগের মতো না হলেও দলীয় কার্যালয়ে নেতা-কর্মী-সমর্থকরা যাতায়াত শুরু করেছেন। ভার্চুয়াল রাজনীতি থেকে এখনো পুরোপুরি বের হতে না পারলেও বিভিন্ন দিবস ও ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলো সীমিত ও নরম কর্মসূচি পালন করছে। করোনার মধ্যেই কয়েকটি সংসদীয় আসনে উপনির্বাচন হয়েছে। ইতিমধ্যে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচনও শুরু হয়েছে। সোমবার ছিল পৌরসভার প্রথম পর্বের ভোট, এই ভোটে ভোটারের উপস্থিতিও সাম্প্রতিক বছরগুলোর তুলনায় কিছুটা বেড়েছে

এর মধ্যেই আজ ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দুই বছর পূর্তি। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে টানা তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম সংসদ নির্বাচন বিএনপি বয়কট করলেও একাদশে অংশ নেয় দলটি। গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে পুরনো জোট ২০ দলকে সঙ্গে নিয়ে ভোটে যায় বিএনপি। ভোটের ফলে ঐক্যফ্রন্ট পায় সাতটি আসন। এর মধ্যে দুটি গণফোরামের, আর পাঁচটি পায় বিএনপি। ভোটের ফল প্রত্যাখ্যান করে বিএনপি শুরুতে সংসদে না যাওয়ার ঘোষণা দিলেও নানা নাটকীয়তা শেষে দলটি সংসদে যোগ দেয়।

একাদশ সংসদ নির্বাচনের দিন ৩০ ডিসেম্বরকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ পালন করে ‘গণতন্ত্রের বিজয়’ দিবস হিসেবে। আর বিএনপি পালন করে ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ হিসেবে। দিনটি উপলক্ষ্যে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ বিভিন্ন দল আজ বুধবার নানা কর্মসূচি পালন করবে।

আর মাত্র একদিন পরেই বিদায় নিতে যাচ্ছে ২০২০। জানুয়ারি থেকে মার্চ—এই তিনটি মাস বাদ দিলে বছরটির বাকি পুরো সময়টিই কোভিড-১৯-এর কবলে। করোনার থাবা বদলে দিয়েছে রাজনৈতিক দল ও নেতাদের চিরচেনা সংবাদ সম্মেলনের ধরনও। লকডাউনে থাকাকালে কোনো কোনো দল সংগঠনের জরুরি সভা করছে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে বা ভিডিও কনফারেন্সে, করেছে ওয়েবিনার। দলীয় নেতা-কর্মী ও এলাকাবাসীর কাছে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা পৌঁছানোর চেষ্টা করেছেন ভিডিওবার্তায়। গণমাধ্যমে প্রয়োজনীয় বিবৃতি পাঠিয়েছেন ই-মেইলে, হোয়াটসঅ্যাপে কিংবা ইমোতে। আর দলের নেতারা পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেন ফোন, ফেসবুক ম্যাসেঞ্জার, ইমো, হোয়াটসঅ্যাপ ও ভাইবারে।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের লকডাউনের সময় প্রায় প্রতিদিনই বক্তব্য রেখেছেন ভার্চুয়ালি। সরকারি বাড়ি থেকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের ক্যামেরায় ধারণকৃত সেই বক্তব্য পৌঁছে যায় অন্যান্য গণমাধ্যমে। এখন অবশ্য ঘরের বাইরেও সরকারি ও দলীয় কর্মসূচিতে তিনি অংশ নিচ্ছেন। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীও লকডাউনে নিয়মিত বক্তব্য তুলে ধরেন ভার্চুয়ালি। শুধু আওয়ামী লীগ-বিএনপিই নয়; করোনাময় এই বছরে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সীমিত কার্যক্রমও পরিচালিত হয় প্রযুক্তির মাধ্যমে।

মার্চে দেশে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর মহামারির বিস্তার ঠেকাতে সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর তৈরি হয় অবরুদ্ধ অবস্থা। সভা-সমাবেশের ওপরও আসে নিষেধাজ্ঞা। তবে সঙ্কটে পড়া মানুষের সহায়তায় ঝুঁকির মধ্যেও বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মীদের তত্পরতা ছিল। বছরের মাঝামাঝিতে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো বন্ধ করে দেওয়ার পর সরব হয়েছিল বাম দলগুলো, তবে তা মিছিল-সমাবেশ-মানববন্ধনেই সীমিত ছিল। ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনেও সক্রিয় হয়ে উঠেছিল বাম দলগুলো, তবে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান করার পর সেই আন্দোলন শেষ হয়। বেশ কয়েক বছর পর হেফাজতে ইসলামের ব্যানারে ইসলামী দলগুলো হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর কার্টুন প্রকাশ নিয়ে ফ্রান্সবিরোধী বিক্ষোভে নেমে করোনার মধ্যেও রাজপথে উত্তাপ ছড়ানোর চেষ্টা করে। সেটিও থেমে গেলে বছরের শেষদিকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতা করে হেফাজত রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ ছড়ায়।

জুনে অবরুদ্ধ অবস্থার বিধি-নিষেধ শিথিল হলে ধীরে-ধীরে রাজনৈতিক তত্পরতা বাড়তে থাকলেও তা চেনা দৃশ্যে ফেরেনি। ঘরোয়া তত্পরতার মধ্যেও ভাঙন ধরেছে গণফোরামে, বছরের শেষ ভাগে এসে আবার জোড়া লেগেছে গণফোরাম। হেফাজতেও বাজে ভাঙনের সুর, এখনো দুটি পক্ষ বিপরীত অবস্থানে। শীতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও করোনা ভাইরাস সংক্রমণ বাড়তে থাকায় রাজনীতির মাঠ কবে স্বাভাবিক হবে তা অনিশ্চিত।

Rupantor Television

A IP Television Channel

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »