চাল আমদানিতে শুল্কহার কমে ২৫ শতাংশ

আমনের ভরা মৌসুমেও বাড়ছে চালের দাম। দাম নিয়ন্ত্রণে সরকার নানা উদ্যোগ নিয়েছে। একই সঙ্গে চাল আমদানি সহজ করতে শুল্কহার অর্ধেকেরও বেশি কমিয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়েছে।

প্রতি বছর মৌসুমের শুরুতে ধান-চালের দাম কম থাকে। কিন্তু এবার তার উল্টোটা ঘটেছে। চালের দাম বাড়ায় বিপাকে পড়েছেন মধ্যবিত্ত ও নিু আয়ের খেটে খাওয়া মানুষ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মিলাররাই ধান-চালের দাম বাড়াচ্ছেন। খোদ কৃষিমন্ত্রী মো. আবদুর রাজ্জাক বলেছেন, চালকল মালিকরা (মিলার) নানা কারসাজি করে বাজারে চালের দাম বাড়িয়েছেন।

চালের বাজার স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে রোববার সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার জানান, এতদিন আমদানিতে ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক দিতে হলেও এখন দিতে হবে ২৫ শতাংশ।

সেক্ষেত্রে শুল্কহার কমছে ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ। পাশাপাশি নতুন শুল্কহারে চাল আমদানি করতে ১০ জানুয়ারির মধ্যে মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে পারবেন আমদানিকারকরা।

দাম না বাড়ালে চাল না দেয়ার বিষয়ে মিলারদের হুমকি প্রসঙ্গে খাদ্যমন্ত্রী বলেন, সরকার কারও হুমকিতে মাথা নত করে না। মিলারদের চুক্তির জন্য পীড়াপীড়ি করিনি আমরা। তারা তাদের হুমকি নিয়ে থাকুক। প্রয়োজন আমরা কৃষকের কাছ থেকে ধান বেশি করে কিনব। দরকার হলে ১৫ থেকে ২০ লাখ টন চাল কিনব।

তিনি বলেন, বেসরকারিভাবে চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তবে কৃষক যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনা শুরু হয়েছে।

সরকার নির্ধারিত মূল্য মণপ্রতি ১ হাজার ৪০ টাকা। আজও বাইরে ১ হাজার ২০০ টাকা মণ দরে ধান বিক্রি হচ্ছে। ধানের দাম কমলে আমরা কৃষকের জন্য হাহাকার করি। আবার চালের দাম বাড়লেও হাহাকার করি।

সংবাদ সম্মেলনে খাদ্য সচিব মোসাম্মৎ নাজমানারা খানুম বলেন, আমরা বেসরকারিভাবে ২৫ শতাংশ শুল্কে চাল আমদানির অনুমতি দিয়েছি। তা থেকে কে কতটুকু আমদানি করতে পারবে, সেটা নির্ধারণ করে দেয়া হবে। কিন্তু বেশি আমদানি করা যাবে না। তাতে আবার কৃষক বঞ্চিত হবে।

এদিকে রোববার সচিবালয় থেকে ভার্চুয়ালি গোপালগঞ্জে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউটের (বিএআরআই) গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনে ভূমি উন্নয়ন ও পূর্ত কাজের উদ্বোধন কৃষিমন্ত্রী মো. আবদুর রাজ্জাক।

এ সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, চাল উৎপাদনে ঘাটতি মেটানোর জন্য সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে- আমরা ৫-৬ লাখ টন চাল বিদেশ থেকে আমদানি করব। সরকারি গুদামেও চাল কমে গেছে।

গত বছর প্রায় ১৩ লাখ টনের মতো খাদ্যশস্য ছিল সরকারি গুদামে। এবার সেটা কমে ৭ লাখ টনে নেমে এসেছে। আবদুর রাজ্জাক বলেন, আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি অতটা চালের ঘাটতি আমাদের নেই।

কিন্তু এ সুযোগে মিলাররা নানা কারসাজি করে চালের মূল্যবৃদ্ধি করার চেষ্টা করছেন। আমরা যদি বিদেশ থেকে এনে চালের বাজার বাড়াতে পারি, আমার মনে হয় না খুব অসুবিধা হবে। তিনি জানান, ভরা মৌসুমে আমনের দাম একটু বেশি। সরকার চেষ্টা করছে কোনোভাবেই যাতে রিকশাওয়ালা, ভ্যানওয়ালা, নিম্ন আয়ের মানুষ, কম আয়ের মানুষ তাদের যেন কোনো কষ্ট না হয়। সেটা বিবেচনায় নিয়ে সরকার ওএমএস (ওপেন মার্কেট সেল) চালু করেছে। অব্যাহতভাবে খোলাবাজারে চাল বিক্রি করছে।

পাশাপাশি রোববার রাজধানীর কৃষিবিদ ইন্সটিটিউশন বাংলাদেশ (কেআিইবি) অডিটোরিয়ামে দিনব্যাপী এক কর্মশালায় কৃষিমন্ত্রী বলেন, অপ্রচলিত ও উচ্চমূল্য ফসলের আবাদ বাড়ানোর জন্য মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

পতিত জমিগুলো কিভাবে আবাদের আওতায় আনা যায় এবং কোন ফসল কোন জায়গায় ভালো হয় তা নিশ্চিত করতে কর্মকর্তাদের সৃজনশীল পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করতে হবে।

এদিন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের ‘উন্নতমানের ডাল, তেল ও মসলা বীজ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিতরণ প্রকল্প (তৃতীয় পর্যায়- প্রথম সংশোধিত)’ এ কর্মশালার আয়োজন করে।

সেখানে তিনি এসব কথা বলেন, এ সময়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালক কৃষিবিদ মো. আসাদুল্লাহের সভাপতিত্বে কর্মশালায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন কৃষি সচিব মো. মেসবাহুল ইসলাম ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. হাসানুজ্জামান কল্লোল। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রকল্প পরিচালক কৃষিবিদ মো. খায়রুল আলম।

কৃষিমন্ত্রী আরও বলেন, আগামী বোরো উৎপাদন বাড়াতে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করতে হবে। চলতি বছর দুই দফা বন্যার কারণে আউশ ও আমন ফলনের কিছু ক্ষতি হয়েছে।

তবে উৎপাদনের যে পরিসংখ্যান সরকারের হাতে আছে, তাতে চালের এত ঘাটতি হওয়ার কথা নয়। অথচ বিদেশ থেকে আমাদের চাল আমদানি করতে হচ্ছে। সরকারের ঘরেও চাল নেই। আমরা চাল কিনতেও পারিনি।

কিছু ভুলভ্রান্তিও আমাদের আছে। তার পরেও চালের দামটা কেন এভাবে বাড়ছে, আমার কাছে বোধগম্য নয়। এত কেন বাড়বে? এমন নয় যে, বাজারে চাল নেই। দুর্ভিক্ষ হলে বাজারে চাল পাওয়া যায় না, চালের ঘাটতি থাকে।

এখন বাজারে যথেষ্ট চাল আছে। দাম প্রতিদিনই বাড়ছে। ১-২ টাকা বাড়াও কিন্তু অনেক বাড়া। সেখানে ৩২-৩৩ টাকার মোটা চাল ৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কারণগুলো কী?

চালের দ্বিতীয় প্রধান মৌসুম আমন ধান উঠলেও চালের দাম কমেনি, বরং বেড়েছে। চালের সরবরাহ বাড়িয়ে দাম কমানোর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বুধবার ভারতের সঙ্গে দেড় লাখ টন চাল আমদানির চুক্তি করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে ভারতীয় চালের দাম পড়বে প্রতি কেজি ৩৩ থেকে ৩৫ টাকা।

এদিকে রোববার পর্যন্ত রাজধানীর বাজারে সব ধরনের চাল চড়া দামে বিক্রি অব্যাহত ছিল। এতে সব শ্রেণির মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছেন। রাজধানীর খুচরা বাজারে এ দিন প্রতি কেজি মিনিকেট ও নাজিরশাইল বিক্রি হয়েছে ৬২ থেকে সর্বোচ্চ ৬৭ টাকা।

বিআর ২৮ চাল বিক্রি হয়েছে সর্বোচ্চ ৬০ টাকা। মোটা চালের মধ্যে স্বর্ণা জাতের চাল প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে ৪৮-৫১ টাকা।

সরকারি সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) বাজারদরের তালিকা অনুযায়ী, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এখন প্রতি কেজি মোটা চালের দাম প্রায় ৪৮ শতাংশ, মাঝারি ২৩ শতাংশ ও সরু চালের দাম ১৭ শতাংশ বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে।

Rupantor Television

A IP Television Channel

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »