বইছে শৈত্যপ্রবাহ, শ্রমজীবীরা কষ্টে

উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলসহ দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে বইছে শৈত্যপ্রবাহ। সূর্যের দেখা তেমন মিলছে না। শৈত্যপ্রবাহের মধ্যে বইছে হিমেল হাওয়া। এতে বেড়েছে ঠান্ডার তীব্রতা। এমন পরিস্থিতিতে দৈনিক কাজ না পেয়ে কষ্টে আছে শ্রমজীবী মানুষ। এছাড়া শীতজনিত রোগে ভুগছে শিশু ও বৃদ্ধরা। হাসপাতালে বেড়েছে রোগীর সংখ্যা। অনেকটাই বিপর্যস্ত জনজীবন। মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের এই শৈত্যপ্রবাহ থেকে রক্ষা পেতে ছিন্নমূল ও দিনমজুররা আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছেন।

স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি অনেক সংগঠন শীতার্ত মানুষের মধ্যে বিতরণ করছে শীতবস্ত্র। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, এমন পরিস্থিতি আরো কয়েকদিন অব্যাহত থাকবে। তবে বুধ/বৃহস্পতিবার থেকে তাপমাত্রা বাড়লে শীতের তীব্রতা কমে আসবে। অধিদপ্তরের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ময়মনসিংহ, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগসহ টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল, যশোর, কুষ্টিয়া, বরিশাল এবং ভোলা অঞ্চলসমূহের ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তা অব্যাহত থাকতে পারে। সারাদেশে রাতের তাপমাত্রা সামান্য হ্রাস পেতে পারে এবং দিনের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে। গতকাল দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল রাজারহাটে ৬ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ঢাকায় তাপমাত্রা ছিল ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এছাড়া টাঙ্গাইলে ৬ দশমিক ৮ ডিগ্রি, সৈয়দপুরে ৭ ডিগ্রি, চুয়াডাঙ্গায় ৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি, বদলগাছীতে ৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি, দিনাজপুর, ঈশ্বরদীতে ৭ দশমিক ৬ ডিগ্রি, ভোলায় ৯ দশমিক ৭ ডিগ্রি তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। আজ রবিবার সারাদেশের আবহাওয়া শুষ্ক থাকতে পারে। মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত দেশে নদী অববাহিকার কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা এবং দেশের অন্যত্র হালকা থেকে মাঝারি ধরনের কুয়াশা পড়তে পারে। সারাদেশে রাতের তাপমাত্রা সামান্য হ্রাস পেতে পারে এবং দিনের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে।

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, শনিবার কুড়িগ্রাম জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৬ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কুড়িগ্রামে এটিই এ পর্যন্ত এই মৌসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা এবং গতকাল পুরো দেশের মধ্যে সর্বনিম্ন। এ তথ্যটি জানিয়েছে কুড়িগ্রামের রাজারহাট আবহাওয়া ও কৃষি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র। কেন্দ্রের পর্যবেক্ষক সুবল চন্দ্র সরকার জানান, শীতের এই তীব্রতা আরো কয়েকদিন থাকতে পারে।

এদিকে কনকনে ঠান্ডায় স্থবির হয়ে পড়েছে কুড়িগ্রামের জনজীবন। গরম কাপড়ের অভাবে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষজন। খড়কুটো জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছেন অনেকেই। কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক মো. রেজাউল করিম জানান, সরকারিভাবে জেলার হতদরিদ্র মানুষের মধ্যে ৩৫ হাজার কম্বল বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়াও জেলার ৯ উপজেলায় গরম কাপড় কিনে বিতরণের জন্য ৬ লাখ করে টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

নাগেশ্বরী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, প্রচণ্ড ঠান্ডায় সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন গ্রাম ও চরাঞ্চলের গরিব, ছিন্নমূল ও নিম্ন আয়ের মানুষ। শিশু ও বৃদ্ধদের অবস্থা বেশি শোচনীয়। জ্বর, সর্দি, কাশি ও নিউমুনিয়াসহ বিভিন্ন শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে তারা।

স্টাফ রিপোর্টার, দিনাজপুর জানান, দিনাজপুরে শনিবার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৭ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং তেঁতুলিয়ায় রেকর্ড করা হয় ৭ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দিনাজপুর আঞ্চলিক আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তোফাজ্জল হোসেন জানান, দিনাজপুরসহ উত্তরাঞ্চলে বইতে শুরু করেছে মৃদ শৈত্যপ্রবাহ। আগামী কয়েকদিন এই মৃদু শৈত্যপ্রবাহ তীব্র আকার ধারণ করতে পারে। শীতের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় এই অঞ্চলে শীতজনিত বিভিন্ন রোগে ভুগছে মানুষ। শিশু ও বয়োবৃদ্ধ রোগীর সংখ্যাই বেশি। হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে এসব রোগীর সংখ্যা।

দিনাজপুরের অরবিন্দ শিশু হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. ফয়জুর রহমান এই তীব্র শীতে শিশুদের গরম কাপড়ে মুড়িয়ে রাখতে এবং গোসলের জন্য সকলকে মৃদু গরম পানি ব্যবহারের পরামর্শ দেন। শীতের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় এই অঞ্চলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষকরে ছিন্নমূল ও অসহায় মানুষেরা পড়েছেন দুর্ভোগে। বিপাকে পড়েছেন কর্মজীবী মানুষ।

পাবনা প্রতিনিধি জানান, পাবনায় শীত জেঁকে বসেছে। স্থবিরতা দেখা দিয়েছে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক কাজকর্মে। শনিবার পর্যন্ত পাঁচ দিন পাবনা অঞ্চলে সূর্যের আলোর তীব্রতা নেই। সন্ধ্যার পর প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ছে শহর-বাজার। প্রায় প্রতিটি ঘরে শিশুরা সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত। পাবনা জেনারেল হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালে শীতজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। পাবনার ঈশ্বরদী আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, গতকাল শনিবার সকালে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৭ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। পর্যবেক্ষক নাজমুল হোসেন জানান, তাপমাত্রা আরো কমতে পারে।

প্রচণ্ড শীতের কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে সহায়-সম্বলহীন হতদরিদ্র মানুষগুলো। কাজ পাচ্ছেন না শ্রমজীবী মানুষ। শীতবস্ত্রের অভাবে তারা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। অনেকেই আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছেন।

জেলা প্রশাসক কবীর মাহমুদ শনিবার ইত্তেফাককে জানান, ইতিমধ্যে জেলার প্রতি ইউনিয়নে ৪৬০টি করে কম্বল বিতরণের লক্ষ্যে মোট ৩৭ হাজার কম্বল উপজেলাগুলোতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সরকারিভাবে শীতবস্ত্র কেনার জন্য উপজেলা প্রতি ৬ লাখ টাকা করে দেওয়া হয়েছে।

স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী জানান, শনিবার রাতে সেখানে তাপমাত্রা এক লাফে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসে। শুক্রবার রাতে রাজশাহীর সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আগামী ১০ দিন পর্যন্ত তাপমাত্রা আরো কমতে পারে বলে জানিয়েছে রাজশাহী আবহাওয়া অফিস। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন বিভাগের একটি সূত্র জানিয়েছে, রাজশাহীর শীতার্তদের মধ্যে বিতরণের জন্য এবার প্রথম ধাপে প্রায় ৬০ হাজার কম্বলের বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।

রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিত্সক ডা. আরিফুল হক জানান, হাসপাতালে শীতজনিত রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। এদের মধ্যে শিশু ও বৃদ্ধদের সংখ্যাই বেশি। বেশির ভাগই ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া, হূদরোগ, অ্যাজমার রোগী।

বরিশাল অফিস জানায়, তীব্র শীতে সেখানকার জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বরিশাল আবহাওয়া অফিসের সিনিয়র পর্যবেক্ষক আনিছুর রহমান জানান, গতকাল শনিবার বরিশালে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। দুস্থ ও নিম্ন আয়ের মানুষ শীতবস্ত্রের অভাবে বিপাকে পড়েছে। বিশেষ করে মেঘনা তীরবর্তী হিজলা, মেহেন্দীগঞ্জ, মীর্জাগঞ্জ ও ভোলার বেড়িবাঁধে ছিন্নমূল মানুষেরা শীতে বেশি কষ্টভোগ করছে। গভীর রাতে এসব এলাকার ছিন্নমুল মানুষ খড়-কুটো জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছে। কিন্তু এতে অগ্নিদগ্ধ হওয়ার যথেষ্ট ঝুঁকি রয়েছে। তাদের এখন প্রয়োজন শীতবস্ত্রের।

শহরের লোকজন শীতের পোশাক কিনতে ভিড় করছে মহসিন মার্কেটসহ শপিং মল ও বিপণিবিতানগুলোতে। গরম পোশাকের পাশাপাশি ইলেকট্রিক হিটারের চাহিদাও বেড়ে গেছে। এসব হিটারের সাহায্যে পানি গরম থেকে শুরু করে ঘর গরম করার সুবিধা রয়েছে। বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকায়।

সিলেট অফিস জানায়, শনিবার সকালে সিলেটে ১১ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং শ্রীমঙ্গলের ৮ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করে সংশ্লিষ্ট আবহাওয়া অফিস। শ্রীমঙ্গল আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের আবহাওয়া সহকারী আনিসুর রহমান জানান, চলতি শীত মৌসুমে এখন পর্যন্ত শ্রীমঙ্গলের এটাই সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। সিলেট আবহাওয়া অফিস জানায়, আগামী ২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত আবহাওয়া এই রকমই থাকবে।

এদিকে সিলেট বিভাগে শীতের প্রকোপ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে এক জনের প্রাণহানি ঘটে। সর্বশেষ শুক্রবার দুই জনের মৃত্যুসহ চলতি মাসের ৫ তারিখ থেকে এ পর্যন্ত ১৪ দিনে সিলেট জেলায় করোনা ভাইরাসে ১৪ জনের প্রাণহানি ঘটে।

সৈয়দপুর বিমানবন্দরে কুয়াশার কারণে উড়োজাহাজ ওঠানামায় বিঘ্ন

সৈয়দপুর (নীলফামারী) সংবাদদাতা জানান, একদিনের ব্যবধানে সৈয়দপুরে আড়াই ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা কমেছে। শনিবার সৈয়দপুর আবহাওয়া অফিস এখানে ৭.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করে। ঘন কুয়াশার কারণে বেলা ১টা পর্যন্ত সৈয়দপুর বিমানবন্দরে কোনো উড়োজাহাজ ওঠানামা করতে পারেনি। শীত বেড়ে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছে ছিন্নমূল মানুষ। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নাসিম আহমেদ জানান, গত এক সপ্তাহে সৈয়দপুরে ২ হাজার কম্বল বিতরণ করা হয়েছে।

তারাগঞ্জ (রংপুর) সংবাদদাতা জানান, রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলায় শীতের তীব্রতা বেড়েই চলেছে। শীতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন, বিপাকে পড়েছে নিম্ন আয়ের মানুষ। উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আমিনুল ইসলাম জানান, আমরা এ পর্যন্ত জেলা প্রশাসন থেকে ২ হাজার ৩০০ কম্বল বরাদ্দ পেয়েছি। আরো কম্বল বরাদ্দের জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়েছে।

Rupantor Television

A IP Television Channel

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »