মজুতদারি ঠেকাতে চাল আমদানির উদ্যোগ

আমনের ভরা মৌসুমে দাম বাড়ছে চালের। অথচ দাম এখন কমার কথা। কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র বলেছে, বন্যা, অতিবৃষ্টিসহ নানা কারণে এবার লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আমনের উত্পাদন হয়নি। যে কারণে ধানের দাম বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে চালের ওপর। তবে আমনের উত্পাদন ভালো হয়নি—এটা মানতে নারাজ খাদ্য মন্ত্রণালয়। তারা বলছে, চলতি মৌসুমে ১ কোটি ৫০ লাখ টন আমন চাল উত্পাদন হবে। এটা লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি। তাহলে কেন আমন মৌসুমে চালের দাম বাড়ছে এ প্রশ্ন এখন ভোক্তাদের?

খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার ইত্তেফাককে বলেছেন, করোনা মহামারির কারণে দেশে কয়েক জন অসত্ চাল ব্যবসায়ী সুযোগ নিচ্ছে। তারা আমনের ভরা মৌসুমেও অস্বাভাবিকভাবে চালের দাম বাড়াচ্ছে। এজন্য আমরা তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেব।

সূত্র জানিয়েছে, গত বোরো মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে ধান-চাল সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। মিল মালিকরা খাদ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে চুক্তি করেও চালের বাড়তি দরের কারণে অনেকেই গুদামে চাল দেয়নি। সেসঙ্গে করোনা মহামারি ও চার দফা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে খাদ্যশস্য বিতরণের কারণে সরকারের মজুত দ্রুত কমছে। আর সরকারের মজুত খাদ্যের পরিমাণ কমায় এর সুযোগ নিচ্ছে এক শ্রেণির অসত্ ব্যবসায়ীরা।

খাদ্য অধিদপ্তরের প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, বর্তমানে সরকারের গুদামে ৭ দশমিক ৮৮ লাখ টন খাদ্যশস্য মজুত রয়েছে। এর মধ্যে চাল ৫ দশমিক ৫৬ লাখ টন ও গম ২ দশমিক ৩৩ লাখ টন। অথচ মাত্র এক মাস আগে গত ৫ নভেম্বর খাদ্যশস্যের মজুত ছিল ১০ লাখ ৩ হাজার ২০ টন। অর্থাত্ এক মাস ৯ দিনের ব্যবধানে ২ লাখ ১৫ হাজার ২০ টন খাদ্যশস্য মজুত থেকে কমেছে।

খাদ্য অধিদপ্তরের এই তথ্যে দেখা গেছে, গত বছর এই সময়ে সরকারের গুদামে খাদ্যশস্যের মোট মজুত ছিল ১৫ লাখ ৯৬ হাজার ৮৪০ টন। এর মধ্যে চাল ১২ লাখ ৩৮ হাজার ৭৩০ টন এবং গম ৩ লাখ ৫৮ হাজার ১১০ টন। এই হিসাবে গত প্রায় এক বছরের ব্যবধানে সরকারের গুদামে খাদ্যশস্যের মজুত কমেছে ৮ লাখ ৮ হাজার ৮৪০ টন।

কিন্তু এ বছর কেন কমেছে সরকারের মজুত?

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, সরকারের খাদ্যশস্য সংগ্রহের সবচেয়ে বড় মৌসুম হলো বোরো। কিন্তু গত মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী খাদ্যশস্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। গত বোরো মৌসুমে সরকার ২০ লাখ টন ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। যার মধ্যে ৮ লাখ টন ধান, ১০ লাখ টন সিদ্ধ চাল ও দেড় লাখ টন আতপ চাল। এর মধ্যে মাত্র ২ দশমিক ২ লাখ টন ধান, ৬ দশমিক ৮ লাখ টন সিদ্ধ চাল এবং ৯৯ হাজার টন আতপ চাল সরকার কিনতে পেরেছিল। এই হিসাবে লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকও পূরণ হয়নি। এবার আমনের আবাদ ভালো না হওয়ায় আমন সংগ্রহ অভিযানও সফল না হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, এবার রোপা ও বোনা আমন মিলিয়ে ৫৯ লাখ ১ হাজার ৮১৫ হেক্টর জমিতে ১ কোটি ৫৫ লাখ ৯০ হাজার ৮৭৪ টন ধান উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু বন্যার কারণে ৫৪ হাজার ৪৩০ হেক্টর জমির রোপা আমন ও ৫০ হাজার ৯৫৮ হেক্টর জমির বোনা আমন সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর প্রভাবে ধানের দাম বেশি। চলতি আমন মৌসুমে কাঁচা ধানই বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৫০ টাকা থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা মণ। ধানের দামের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে চালের দাম। সরকার যে দরে ধান-চালের সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ করেছে তাতে মিল মালিকরা চাল সরবরাহে রাজি নন। ইতিমধ্যে অনেক মিল মালিক তাদের অপারগতা জানিয়ে দিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, একদিকে সরকারের অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে খাদ্যশস্য সংগ্রহ অভিযান ব্যর্থ হয়েছে, অন্যদিকে খাদ্যশস্য বিতরণের পরিমাণ বেড়েছে। করোনা মহামারি ও কয়েক দফা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের সরকার চাল বিতরণ করেছে ২৭ দশমিক ৭৭ লাখ টন। যা আগের বছরে ছিল ২৫ দশমিক ৯৪ লাখ টন। ফলে খাদ্যশস্যের মজুত দ্রুত কমছে। অন্যদিকে বাজারে চালের দাম বাড়ছে।

বর্তমানে রাজধানীর খুচরা বাজারে সরু চাল নাজিরশাইল/মিনিকেট ৫৬ থেকে ৬২ টাকা, মাঝারি মানের চাল পাইজাম/লতা ৫০ থেকে ৫৫ টাকা ও মোটা চাল ইরি/স্বর্ণা ৪৫ থেকে ৪৮ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। যা সপ্তাহের ব্যবধানে চালের মানভেদে কেজিতে দুই থেকে চার টাকা বেশি।

খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, সবকিছু বিবেচনা করেই চাল আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি মাসেই ভারত থেকে ১ লাখ টন চাল আমদানির অনুমোদন দিয়েছে সরকারের ক্রয় কমিটি। সরকারের মজুত রাড়াতে প্রাথমিকভাবে ২ লাখ টন চাল আমদানি করা হবে। তবে পরিকল্পনা রয়েছে কমপক্ষে ৫ থেকে ৬ লাখ টন চাল আমদানির।

এ প্রসঙ্গে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার ইত্তেফাককে বলেন, আমনের উত্পাদন ভালো হয়নি এমন বলা হলেও আমাদের হিসাবে ১ কোটি ৫০ লাখ টন চাল হবে। এছাড়া চলতি মাসেই আরো ৫০ হাজার করে মোট আরো ১ লাখ টন চাল বেসরকারিভাবে আমদানির জন্য ক্রয় কমিটি অনুমোদন দেবে বলে আশা করছি। সেসঙ্গে সরকারিভাবে ভারত ও ভিয়েতনাম থেকে চাল আমদানির জন্য ২৩ ডিসেম্বর এই দুই দেশের সঙ্গে বৈঠক রয়েছে।

তিনি বলেন, বেসরকারির পাশাপাশি সরকারিভাবেও চাল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে কোনোভাবেই সমস্যা তৈরি না হয়। খাদ্যমন্ত্রী বলেন, চালের দাম বাড়ায় আগামী ২০ ডিসেম্বর থেকে সারা দেশে সিটি করপোরেশন ও জেলাগুলোতে খোলা বাজারে চাল বিক্রি (ওএমএস) শুরু করবে সরকার।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখন থেকে কোন মিল প্রতিদিন কত ধান কিনল, কী পরিমাণ চাল উত্পাদন করল, বাজারজাত করল ও মজুত রাখল—তা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক অফিস মনিটর করে প্রতিবেদন দেবে। এছাড়া আগে কোনো মিলের উত্পাদন ক্ষমতার পাঁচ গুণ ধান-চাল মজুত রাখা গেলেও এখন তিন গুণের বেশি রাখা যাবে না। কোনো অবৈধ মজুত পেলে তা সরকারের ধান-চাল হিসেবে বিবেচিত হবে বলে খাদ্যমন্ত্রী জানান।

Rupantor Television

A IP Television Channel

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »