পুরো অঞ্চলে জঙ্গিবাদ ছড়াচ্ছে পাকিস্তান

২৬ নভেম্বর এই অঞ্চলের জঙ্গিবাদের ইতিহাসে একটি ঘৃণ্য অক্ষরের দিন। ২০০৮ সনের এই দিনে পাকিস্তান ভিত্তিক লস্কর-এ-তৈয়ব নামক এক চরমপন্থী জঙ্গি গ্রুপ ভারতের মুম্বাই নগরীর কয়েকটি হোটেলে আক্রমণ চালিয়ে ১৭০ জন নিরাপরাধ মানুষকে হত্যা করে এবং ৩০৪ জনকে মারাত্মক জখম করে, যাদের মধ্যে ভারতীয় নাগরিক ছাড়াও ছিল ব্রিটিশ, আমেরিকান এবং অন্যান্য কয়েক দেশের নাগরিক। তবে এই ঘটনার উল্লেখযোগ্য দিক হলো এই যে সে আক্রমণ পরিকল্পনাটির নীল নকশা প্রণয়ন করেছিল পাকিস্তান সামরিক গোয়েন্দা বাহিনী, আইএসআই এবং আইএসআই’র মেজর ইকবাল এই অভিযানের সমস্ত পরিকল্পনা তদারকি করেন।

পুরো অভিযানের জন্য অর্থের যোগান দেয় পাকিস্তান গোয়েন্দা বাহিনী আইএসআই। একই সময়ে তাজ মহল হোটেল, ওবেরি ট্রাইডেন্ট হোটেল, কামা হাসপাতাল, লিওপোন্ড ক্যাফে, চাবাদ হাউস এবং সিবাজি টারমিনাসে একই সঙ্গে আক্রমণ চালানো হয়। এই আক্রমণের পরে মুম্বাই পুলিশ তদন্ত করে যে অভিযোগপত্র দাখিল ২০০৯ সনের ফেব্রুয়ারি মাসে তাতে এ কথা ফুটে উঠে যে মোট ৩৪ জন পাকিস্তানি জঙ্গি এই নৃশংস আক্রমণ চালায়। আইএসআই’র পরিকল্পনাক্রমে এবং অর্থায়নে এদের মধ্যে ৯ জন জঙ্গি ঘটনাস্থলেই নিহত হয়। ৩৫ জঙ্গি এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে, যাদের পাকিস্তান আশ্রয় দিচ্ছে বলে নিশ্চিত হয়েছে ভারতীয় গোয়েন্দাগণ। যাদের গ্রেফতার করে বিচারে তোলা হয়েছে তাদের নাম (১) আজমল কাসাব, (২) ইউসুফ আনসারি, (৩) সাব্বির আহমেদ শেখ।

এদের মধ্যে আজমল কাসাব ছিল একমাত্র জীবন্ত জঙ্গি যাকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছিল। তার জবানবন্দি থেকে অত্যন্ত মূল্যবান তথ্য পাওয়া যায়। যাতে ছিল তার দলের অন্য সদস্যদের নাম, আইএসআই এর ভূমিকা ইত্যাদি। ২০১২ সনের নভেম্বর মাসে, ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের আপিলের রায় অনুযায়ী তার ফাঁসির নির্দেশ কার্যকর করা হয়। আনসারি এবং সাহাবুদ্দিন নামে যে দু’জনকে সন্দেহভাজন হিসাবে গ্রেফতার করা হয়েছিল, তারা আদালতে বেকসুর খালাস পায়। তদন্তে জানা যায় ডেভিড কোলমেন হেডলি নামক এক তৈয়বা সদস্য, যে পাকিস্তানি বংশধর মার্কিন নাগরিক, ২০০৬ সাল থেকে আক্রমণের জন্য, আইএসআই’র নির্দেশ এবং পরামর্শক্রমে পুরো এলাকা এবং টার্গেটগুলো জরিপ করার দায়িত্বে ছিল। আমেরিকান আদালত তাকে ৩৫ বছর কারাদণ্ডে দন্ডিত করে।

মুম্বাই আক্রমণের পৈশাচিক ঘটনা সারাবিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং বিশ্ব নেতৃবৃন্দ পাকিস্তানের ভূমিকার তীব্র নিন্দা করেন। জাতিসংঘেও এই ঘটনার নিন্দা করে। আক্রমণের ১৫ দিনের মধ্যে নিরাপত্তা পরিষদ হাফিজ এবং তার সহ-অপরাধীদের নিষিদ্ধ তালিকাভুক্ত করে। আমেরিকান আদালত তাকে ৩৫ বছরের জন্য কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে।

 

এই নির্মম জঙ্গি ঘটনার মূল খলনায়ক ছিল লস্কর-ই-তৈয়বার প্রধান হাফিজ সাঈদ। সে যে পাকিস্তানে জামাই আদরে গত ১২ বছর ধরে লালিত হচ্ছে তা সমস্ত তথ্য-উপাত্ত থেকেই জানা যাচ্ছে। সম্প্রতি পাকিস্তানে এক সাজানো বিচারের মাধ্যমে তাকে কারাদণ্ড দেয়ার কথা যে নেহায়েতই চোখে ধুলা তা জানতে বেশি দূর যাওয়ার দরকার হয় না। সে ব্যক্তি আদালতে আসতেন লিমুজিন গাড়ি দিয়ে যে গাড়িটি পাকিস্তান সরকার তাকে দিয়েছে। পাকিস্তান সরকার তাকে মুম্বাই আক্রমণের পর অঢেল অর্থ দিয়ে পুরস্কৃত করেছে বলে অকাট্য প্রমাণ পাওয়া গেছে। হাফিজের লোক দেখানো সাজা বর্তমানে অবস্থা সামলানোর জন্য মাত্র। অদূর ভবিষ্যতে তাকে ছেড়ে দেওয়া হতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন।

অকট্য প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও একজন জঙ্গিকে সাজা দেয়া হয়নি ষড়যন্ত্র এবং আক্রমণের জন্য। হাফিজকে তথাকথিত গ্রেফতারের পর তাকে জেলের নামে সুসজ্জিত আশ্রয়ে রাখা হয়। আর এক জঙ্গি জাকিউর রহমান লাকভির বিরুদ্ধে দুর্বল অভিযোগনামা দায়ের করার কারণে সে খালাস পায় এবং খালাসের বিরুদ্ধে আপলি করা হয়নি। ফাইনানসিয়াল এ্যাকশন টাস্কফোর্স (এফএটিএফ), ২০২১ এর ফেব্রুয়ারি সংস্থার পরবর্তী সভায় পাকিস্তানকে কালো তালিকাভুক্ত করা হতে পারে। যার পরিণতিতে পাকিস্তানের উপরে আর্থিক অবরোধ আরোপিত হতে পারে। সেই ভয়েই পাকিস্তান তড়িঘড়ি করে সাইদ হাফিজের বিচারের নামে প্রহসনের নাটক মঞ্চস্থ করে। তার বিরুদ্ধে মুম্বাই হত্যাকাণ্ড বা তা ঘটানোর ষড়যন্ত্রের কোনো অভিযোগ আনা হয়নি। যা হলে তার সর্বনিম্ন সাজা হতো যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। বরং তার বিরুদ্ধে আনা হয় জঙ্গিদের আর্থিক সহায়তা প্রদানের, যার জন্য তার সাজা হয় ১১ বছর। এর মধ্যে পাকিস্তানের ফেডারেল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এফআইএ) যে তালিকা প্রণয়ন করেছে, এফএটিএফ’র সন্তুষ্টির জন্য তাতে মুম্বাই আক্রমণকারী কারোরই নাম নেই।

উপরের ঘটনাগুলো ভারতে ঘটলেও তার থেকে আমাদের শঙ্কিত হওয়ার, সতর্ক হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে বলেই মুম্বাই ঘটনার বিস্তারিত উপরে উল্লেখ করা হলো যাতে আমাদের জনগণ এ ব্যাপারে পূর্ণাঙ্গ ধারণা নিতে পারেন।

কয়েক বছর আগে ঢাকায় পাকিস্তান দূতাবাসের এক কূটনীতিক আমাদের দেশের বেশ কিছু জঙ্গি, ধর্মান্ধকে নিয়ে তাদের দূতাবাসের ভিতরেই সভা করলে তা আমাদের দক্ষ গোয়েন্দাদের নজরে আসলে সেই কূটনীতিককে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে আমাদের পবিত্র ভূমি ত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। ২০০০ সনে পাকিস্তান দূতাবাসের উপ-রাষ্ট্রদূত ইরফান রাজা আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে কটাক্ষ করে কথা বলায় তাকেও অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হলেও সে দেশ না ছাড়ার জন্য বহু টালবাহানা করতে থাকে। তবে পরে অবশ্য দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়। পাকিস্তান দূতাবাসের পাস দিয়ে যে সড়কটি রয়েছে সেটির নামকরণ করা হয়েছে এক বীর মুক্তিযোদ্ধার নামে। পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত তা সহ্য করতে না পেরে ২০০৮ সনে খোদ আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যেয়ে নামটি তুলে দেওয়ার মতো ধৃষ্টতাপূর্ণ আবদার করতে দ্বিধাবোধ করে নাই, যেটি কিনা ১৯৬৪ সনের ভিয়েনা কনভেশনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। পাকিস্তান ১৯৭১ এ তাদের পরাজয়ের গ্লানি যে ভুলে যেতে পারছে না এগুলো তারই প্রমাণ।

আরো প্রমাণ হলো যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি হওয়ার পর পাকিস্তান পার্লামেন্টের ধৃষ্টতাপূর্ণ নিন্দা প্রস্তাব। এ ছাড়া ২০০০ সনের নির্বাচনের জন্য পাকিস্তান দূতাবাস বিএনপি-জামাতকে প্রচুর পয়সা দিয়েছিল, সে কথা আইএসআই এর সে সময়ের প্রধান পাকিস্তানের আদালতে প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছে। বঙ্গবন্ধু হত্যায় যে পাকিস্তানি হাত ছিল, সেটা দিবালোকের মতোই পরিষ্কার। ২১ আগস্ট গ্রেনেড আক্রমণে যেসব গ্রেনেড ব্যবহার করা হয় তা থেকে এটা সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে সে আক্রমণেও পাকিস্তান সম্পৃক্ত ছিল। তদুপরি পাকিস্তানের কুখ্যাত জঙ্গি দাউদ ইব্রাহিম যে লন্ডনে তারেক জিয়ার সাথে প্রায়ই বৈঠক করে তার সমর্থনেও কিন্তু শক্তিশালী তথ্য রয়েছে। তাছাড়া বিএনপি শাসন আমলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে সন্ত্রাস সৃষ্টির জন্য যে ১১ ট্রাক অস্ত্র পাঠানোর ব্যর্থ চেষ্টা করা হয়েছিল, তাতেও পাকিস্তানের হাত ছিল।

কয়েক বছর আগে ঢাকাস্থ হলি আর্টিজান রেঁস্তোরায় যে ধরনের জঙ্গি আক্রমণ হয়, তার সাথে মুম্বাই আক্রমণ মিল থাকায় হলি আর্টিজান আক্রমণেও পাকিস্তানি আইএসআই এর সম্পৃক্ততা থাকতে পারে ভাবাটি খুবই যুক্তিসঙ্গত। তাছাড়া পাকিস্তানি আইএসআই যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে মিয়ানমার ফিরে না যেতে পরামর্শ দিচ্ছে। তাদের বিভিন্ন অপরাধ কাজে উদ্বুদ্ধ করছে। তাও প্রমাণিত। পাকিস্তান পুরো অঞ্চলটিতে জঙ্গিবাদ এবং জঙ্গি কার্যক্রম পরিচালনা করছে, সেখানে কর্মরত লস্কর-এ-তৈয়বা এবং অন্যান্য জঙ্গি সংগঠনকে ব্যবহার করে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা সাম্প্রতিক প্রকাশিত তার বইতে অকপটেই প্রকাশ করেছেন, পাকিস্তান সরকার ওসামা বিন লাদেনকে আশ্রয় প্রশ্রয় দিয়েছিল। যার কারণে লাদেনকে হত্যা করা হয় পাকিস্তানকে না জানিয়ে। কঠোর গোপনীয়তার সাথে। এ কথা প্রমাণ করছে পাকিস্তান জঙ্গিদের আশ্রয় দেওয়া একটি দেশ।

পাকিস্তান কর্তৃক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড রপ্তানির ব্যাপারে মার্কিন ডাইরেক্টর অব ন্যাশনাল ইনটেলিজেন্স এই মর্মে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছে যে সন্ত্রাসমূলক মৌলবাদ পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ক্ষতিকর প্রভাব হয়তো ফেলবে না, কিন্তু এর ফলে ঐ অঞ্চলের স্থিতির উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

যখন আফজল কাসাবের ফাঁসি হয়, তখন ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অব জুরিস্টের অনুষ্ঠানে ভাষণ দেওয়ার জন্য আমি দিল্লি গিয়েছিলাম। আমি কাসাবের ফাঁসির আদেশের পক্ষে সেদিন যে ভাষণ দিয়েছিলাম, তা ভারতের গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকাসমূহে প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হয়েছিল। একই সাথে পাকিস্তানি প্রধান বিচারপতির অনুষ্ঠানে যোগদান না করার কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল। পাকিস্তানি প্রধান বিচারপতির অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথা থাকলেও তিনি শেষ পর্যন্ত যাননি।

Rupantor Television

A IP Television Channel

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »