একই ভাষা, একই মানুষ অথচ দুটো আলাদা দেশ, এটা ভাবতে কষ্ট হয়

২০০৪ সালে একটি নাটকে অভিনয় করতে ঢাকায় এসেছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। সেইবার গভীর রাতে হোতাপাড়া শুটিং স্পটে  সাক্ষাত্কার দিয়েছিলেন; ২২ জুলাই ছাপা হয়েছিল।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় :ভালোই লাগে (খানিক হেসে), অভ্যাস হয়ে গেছে।

বাংলাদেশে এর আগে এসেছেন?

সৌমিত্র :হ্যাঁ, থিয়েটার করতে। আবার দুটো ফিল্মের কাজেও এসেছি। টিভি নাটক এর আগে কখনো করিনি বাংলাদেশে। এটাই প্রথম

কেমন লাগে বাংলাদেশ

সৌমিত্র :খুবই ভালো লাগে, সুন্দর লাগে। এত সুন্দর দেশ, মানুষের আতিথেয়তা!

 দুই দেশের মানুষের মাঝে তফাত দেখেন?

সৌমিত্র :তফাত খানিকটা হয়তো আছে, বেসিক্যালি বাঙালি সর্বত্রই এক। এখানে এলে আরো বেশি করে বোঝা যায়। প্রথমবার যখন আসি, তখন একটা দুঃখ হয়েছিল। আমরা একই ভাষা বলছি, একই মানুষ, অথচ দুটো আলাদা দেশ। এটা ভাবতে বেশ কষ্ট হয়।

এটা তো ইতিহাসের অংশ এখন, মানতেই তো হবে।

সৌমিত্র :হুম, ইতিহাসের নির্মম বিধান মানতে হবে। কিন্তু তার জন্য যে দুঃখ থাকবে না, এমন তো কথা নেই।

আপনি যখন অভিনয় শুরু করেছেন, তখন আপনাদের কাজ আর এখনকার তরুণ শিল্পীদের কাজের মধ্যে কোনো পার্থক্য চোখে পড়ে?

সৌমিত্র :ইনভলভমেন্টের অভাবটা চোখে পড়ে। আমি আমার কাজের জায়গার কথা বলছি। বাংলাদেশের কথা তো জানি না। আমাদের সময় ইনভলভমেন্ট আরেকটু বেশি ছিল। অভিনয়ের জন্য প্রবল আকর্ষণ ছিল এবং তার জন্য কষ্ট স্বীকার করতেও তারা পিছপা হতেন না।

বর্তমান প্রজন্মের কাছে আপনি একজন আইকন। একজন অভিনেতাকে যে রাজনীতিসচেতন, সাহিত্যমনস্ক ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন হতে হয়; এ প্রজন্মের শিল্পীরা তা আপনাকে দেখে শেখে। এ প্রজন্মের অভিনেতাদের উদ্দেশে বলুন, কেমন হতে হয় একজন অভিনেতাকে?

সৌমিত্র :দেখুন, সমস্ত কাজের উত্কর্ষ চার শব্দের অক্ষরের ওপর নির্ভর করে। শব্দটা হচ্ছে ‘ভালোবাসা’। তারা যদি তাদের কাজকে আরো গভীরভাবে ভালোবাসে, নিশ্চয়ই তারা তাদের কাজটাকে আরো ভালোভাবে তৈরি করতে পারবে। যেটাকে বলছিলাম ইনভলভমেন্ট। এটা বাইরে থেকে হয় না। ভেতর থেকে সেই আগ্রহটা, ব্যাকুলতাটা আসা দরকার।

 সত্যজিত্ রায়ের অনেক সিনেমাতেই আপনি কাজ করেছেন। মানুষের কাছে বিষয়টা এমন, যেন সত্যজিতের শৈলীকে সৌমিত্রের অবয়বে দেখা। আপনার অনুভূতিটা কেমন? কীভাবে পেয়েছেন তাকে?

সৌমিত্র :সত্যজিত্ রায় আমার কাছে শুধু তো পরিচালক ছিলেন না, ইংরেজিতে যাকে বলা হয় ‘মেনটর’, তা-ই ছিলেন। তার সঙ্গে আমি দীর্ঘ একটা সময় কাজ করেছি। ১৪টা ফিল্মে। ১৪টা কেন, দু-তিনটি শর্টফিল্মেও কাজ করেছি। আমার কাজ শেখা বেশির ভাগটাই তার কাছ থেকে। তার এই যে বিপুল প্রতিভা, তার সান্নিধ্যে এসে আমার পক্ষে অভিনয়কর্মই বলুন, শিল্পদৃষ্টিই বলুন—খুঁজে পেতে সহজ হয়েছে। তার সান্নিধ্য যদি না পেতাম, তবে এত সহজ হতো কি না, জানি না। তিনি নেই, কিন্তু আমার কাছে তিনি জ্যান্তই আছেন, প্রাণময় প্রেরণা হয়েই আছেন।

 উত্তম কুমার ও আপনি দুজনেই দারুণ জনপ্রিয় ছিলেন। উত্তম কুমার ছিলেন হিরো। অথচ আপনি সব সময়ই চরিত্রাভিনেতা। হিরোইজমের দিকে ঝুঁকতে দেখা যায়নি কখনোই। কেন?

সৌমিত্র :আমি আমার মতো করেই আমার স্টারডম তৈরি করেছি। আমি বিশ্বাস করি না যে শুধু এক রাস্তা দিয়েই একজন মানুষ তারকা হতে পারে। আরো বহু পথ রয়েছে। আমি নিজের পথ খুঁজে বার করার চেষ্টাটা করে গেছি। আমি জানতাম, আমার অভিনয় তো আমি তার মতো করব না। যদিও আমি উত্তম কুমারের ভীষণ ভক্ত। তার অভিনয় আমার ভীষণ ভালো লাগত। আমাদের দুজনের মধ্যে খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। আমার অগ্রজ বন্ধু ছিলেন তিনি। যেটা বাইরের মানুষ অনেকেই জানত না।

 মুক্তিযুদ্ধের সময় পশ্চিমবঙ্গের মানুষ বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। আপনার কোনো স্মৃতি মনে পড়ে?

সৌমিত্র :মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে পুরো দেশের মানুষের এই যে জাগরণ, এটা আমাদের মধ্যে আবেগের সঞ্চার করত। তবে একটা কথা আমার মনে হয়, পশ্চিম বাংলার বাঙালি তাদের ভাষা, সংস্কৃতি নিয়ে যতটা অসচেতন হয়ে উঠেছে, ঠিক তার বিপরীত মেরু থেকে বাংলাদেশের মানুষ তাদের ভাষার জন্য এত ত্যাগ স্বীকার করেছে, জীবন দিয়েছে। এ ব্যাপারটা সমগ্র জাতির জীবনে একটা বেগ দিয়েছে।

কবি সৌমিত্রের কবিতা কি আপনি আবৃত্তি করেন?

সৌমিত্র :আমি করি না। কেউ কেউ করে। আমার কেন রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সমর সেন, শঙ্খ ঘোষের পর আমি কোনো খারাপ কবির কবিতাই পড়ি না। বাংলার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে বলে, আমি কবিতা লিখেছি বলে, বাংলা সাহিত্যের ছাত্র ছিলাম বলে সেটা আমার অভিনয়ে সহায় হয়েছে। আমি যখন বাংলায় সংলাপ বলি, তখন আমার ভালো লাগে। ইংরেজিতে যাকে বলে ‘রেলিশ’ করি। বাংলা বলে তৃপ্তি পাই, আনন্দ পাই।

 

Rupantor Television

A IP Television Channel

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »