ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ছয় মাসে অর্ধশতাধিক খুন

পারিবারিক কলহ, আধিপত্য বিস্তার এবং একাধিক সংঘর্ষসহ বিভিন্ন ঘটনায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গত ছয় মাসে অর্ধশতাধিক খুনের ঘটনা ঘটেছে। কখনো নিজ বাড়ির খাটের নিচ থেকে জবাই করা মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আবার কখনো প্রতিপক্ষের লোকজনকে বাড়ির আঙিনায় ফেলে দলবেঁধে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে হত্যা করা হয়েছে। কোনো কোনো সময় সড়ক-মহাসড়ক ও জলাশয়ে মিলছে মরদেহ। চলতি বছরে মে থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত অর্ধশত হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়।

এ সব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পৃথক পৃথকভাবে মামলা হলেও অনেক আসামি এখনো রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি মাসের পর মাস পেরিয়ে গেলেও অপরাধীরা ধরা পড়ছে না। প্রকৃত আসামিদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশের গড়িমসি এবং খুনের মতো ঘৃণ্য ঘটনায় সমাজপতিদের হস্তক্ষেপে আপসের মতো অপসংস্কৃতির কারণেই বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হওয়া যাচ্ছে না। তাই বেপরোয়া হয়ে উঠছে অপরাধীরা। অনুসন্ধানে জানা যায়, আলোচিত এসব হত্যাকাণ্ডের মধ্যে আশুগঞ্জ উপজেলার লালপুর লামা বায়েক গ্রামের জোড়া খুন। গত ২৯ সেপ্টেম্বর পাওনা টাকা নিয়ে প্রতিপক্ষের হামলায় খুন হয় ইশান ও মনির নামের দুই যুবক। গেল দেড় মাসে এই হত্যা মামলায় মাত্র দুই জন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়। অন্য আসামিরা রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। নিহত ইশানের বাড়িতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সন্তান হারিয়ে অনেকটা বাক্রুদ্ধ মা আকলিমা আক্তার ও বাবা মিজানুর রহমান। তারা কিছুতেই তাদের সন্তানের এই নির্মম হত্যাকাণ্ড মেনে নিতে পারছেন না। পুত্র শোকে কাতর হয়ে বারবার মূর্ছা যান নিহত ইশানের মা আকলিমা আক্তার। এ সময় তিনি বিলাপ করতে করতে বলেন, ছেলেই ছিল আমার একমাত্র ভরসা। অনেক শ্রম অনেক প্রচেষ্টা দিয়ে তাকে লালনপালন করেছি। আমার ছেলেকে যারা মেরে ফেলেছে তারা এখনো মুক্ত আকাশের নিচে ঘোরাফেরা করছে আর আমরা কষ্টে দিন পার করছি। আসামিদের হুমকিতে আমরা এখন আতঙ্কে রয়েছি। নিহত ইশানের বাবা মিজানুর রহমান জানান, হত্যাকাণ্ডের এত দিন পার হলেও আসামিদের ধরা হচ্ছে না। আসামিরা প্রতিনিয়ত হুমকি দিচ্ছে। কখন কি ঘটে তা বলতে পারি না। আমার ছেলেকে যারা হত্যা করেছে তাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে বিচারের দাবি জানাচ্ছি।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর, নবীনগর, বাঞ্ছারামপুর, সরাইলসহ জেলার ৯টি উপজেলাতেই এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে দুইটি জোড়া খুন, ব্যাংক ডাকাতি চেষ্টায় খুনসহ বিভিন্ন স্থান থেকে বেওয়ারিশ মরদেহও উদ্ধার করা হয়। প্রত্যেকটি ঘটনায় মামলাও হয়েছে। এতে অন্তত শতাধিক আসামি করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসব মামলার সঙ্গে জড়িত অনেক হোতাকে আইনের আওতায় আনলেও মামলার অধিকাংশ আসামিরা রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। অপরাধের ঘটনায় প্রকৃত আসামিদের আইনের আওতায় আনতে ও তদন্ত প্রতিবেদনে পুলিশের গড়িমসির কথা উল্লেখ করে জেলা সচেতন নাগরিক কমিটির সদস্য আবদুন নূর বলেন, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে সামাজিক অস্থিরতাসহ খুনখারাবি বাড়ছে। যথাযথ আইন প্রয়োগের অভাবে অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠে। এতে অপরাধের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। তিনি, একা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর দায় না চাপিয়ে সমাজে অপরাধ বন্ধ করতে পুলিশ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সমাজপতিসহ সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে আহ্বান জানান। জেলার প্রবীণ রাজনৈতিক ব্যক্তি ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আল মামুন সরকার বলেন, একটি খুনেরও সঠিক বিচার হয় না। কোনো খুনের ঘটনা বিচারের প্রক্রিয়ায় গেলেই এক শ্রেণির সমাজপতিরা বা গোষ্ঠীর নেতারা শান্তি রক্ষার নামে হত্যার মতো ঘৃণ্য ঘটনাতেও আপস করার অপসংস্কৃতি চালু করেছে। এ কারণে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হওয়া যাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনকে আরো কঠোর হতে হবে।

তিনি বলেন, কোনো খুনের আপস নয়, বরং খুনের সঙ্গে যারা জড়িত থাকবে তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি শফিউল আলম লিটন বলেন, এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তত্পরতা আরো গতিশীল করতে হবে। কারণ একটা অপরাধ সংঘটিত হবার সঙ্গে সঙ্গে তা দমন করা গেলে কেউ অন্য একটি অপরাধ করতে সাহস পাবে না। অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা গেলেই অপরাধীরা অপরাধ থেকে দূরে থাকবে।

পুলিশ সুপার মো. আনিসুর রহমান বলেন, প্রত্যেকটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডগুলো পারিবারিক কলহ, দলীয় কিংবা গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্বের কারণে ঘটেছে। এসব ঘটনায় পুলিশ দ্রুত তদন্ত, সাক্ষ্যগ্রহণসহ হত্যাকাণ্ডের বেশির ভাগ রহস্য উদ্ঘাটন করে দোষীদের আইনের আওতায় এনেছে। এছাড়াও সামাজিক অপরাধ রোধে বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার কাজ চলছে।

Rupantor Television

A IP Television Channel

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »