নিষেধাজ্ঞা কাটলেও নাগালের বাইরে মনভোলানো ইলিশ

‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ বাংলার প্রচলিত প্রবাদ। মাছের সঙ্গে তাই বাঙালির আজন্ম সম্পর্ক। নানা প্রজাতির মাছে সমৃদ্ধ নদীমাতৃক বাংলাদেশ। সুস্বাদু মাছের নানা পদ খেয়ে বাঙালি হয়েছে ভোজনরসিক। ভাজি-ঝোল কিংবা কারি করে রান্না মাছ যুগ যুগ ধরে রসনাবিলাসী বাঙালিকে মোহাবিষ্ট করেছে। আর এ ক্ষেত্রে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে মাছের রাজা ইলিশ। অতুলনীয় স্বাদের ইলিশ শুধু বাংলাদেশ নয়, এই উপমহাদেশের গন্ডি পেরিয়ে বিশ্বজোড়া স্বীকৃতি লাভ করেছে। বাংলাদেশের ইলিশ এখন জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। সেই ইলিশ মাছের পদ ‘সরষে ইলিশ’-এর কথা শুনলে জিভে জল না এসে কি কোনো উপায় থাকে? আর বঙ্গাব্দের প্রথম দিনে অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে পান্তা ইলিশ ছাড়া যেন বাঙালিত্বের প্রমাণ মেলে না।

ইলিশ নিয়ে বাঙালির আগ্রহের শেষ নেই। কবির ভাষায় আবার শোনা যায়, ‘চাইনিজ, বার্গার, ফেলে মনভোলে, ইলিশের ঝোলে, সে তো ইলিশের ঝোলে’ ইলিশ মৌসুমে তাই বাঙালি সাধ ও সাধ্যের মাঝে সমন্বয় ঘটাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

মা ইলিশ শিকারে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে বৃহস্পতিবার থেকে ইলিশ ধরা শুরু হয়েছে। বাজারেও আসছে মুখরোচক ইলিশ। কিন্তু পরিমাণে কম। আর এ সুযোগে আগের তুলনায় বেশি দাম হাঁকাচ্ছেন দোকানিরা। ইলিশের দাম বেশি থাকায় চাহিদা বেড়েছে অন্যান্য মাছের। দামও কমেছে

\হকেজিতে ১০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত।

শুক্রবার রাজধানীর ফকিরাপুল, টিঅ্যান্ডটি বাজার, কমলাপুর, শান্তিনগর, সেগুনবাগিচা, খিলগাঁও, মালিবাগ ও রামপুরা, বাসাবো বাজারে সরেজমিন গেলে ক্রেতারা অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন পর মনভোলানো ইলিশের স্বাদ নিতে চাইলেও আপাতত তা সম্ভব হচ্ছে না। নিষেধাজ্ঞা শেষে বাজারে আগমন হলেও সাধ্যের মধ্যে মিলছে না সাধের ইলিশ। তবে বিক্রেতারা বলছেন, প্রথম দিকে ইলিশ ধরা কম পড়েছে, তাছাড়া শীতের আগমনে ইলিশ কম ধরা পড়ে নদীতে। তবে ইলিশের সরবরাহ বেশি হলে দাম কমে আসবে।

বাজারে প্রতি এক থেকে দেড় কেজি ওজনের ইলিশের দাম চাওয়া হচ্ছে ১১৫০ থেকে ১২০০ টাকা। এক কেজি ওজনের ইলিশের দাম চাওয়া হচ্ছে ১০৫০ টাকা, ৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের দাম চাওয়া হচ্ছে ৯০০ থেকে ৯৫০ টাকা। ৫০০ থেকে ৬০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের দাম চাওয়া হচ্ছে ৬৫০ থেকে ৭৫০ টাকা। আর ছোট সাইজের ইলিশের দাম চাওয়া হচ্ছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে।

বরিশাল অফিস জানায়, ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে বরিশালের পাইকারি বাজারে আসতে শুরু করেছে ইলিশ। তবে তুলনামূলকভাবে দাম কমেনি বলে জানিয়েছেন ক্রেতারা। সমুদ্রগামী বোটগুলো নিয়মিত আসতে শুরু করলে বাজারে ইলিশের আমদানি যেমন বাড়বে, তেমনি দাম কমবে বলে জানিয়েছেন পাইকাররা। নিষেধাজ্ঞা শেষে সরবরাহ বাড়ায় খুশি বিক্রেতারা, তবে কেউ কেউ বলছেন এবার গত বছরের তুলনায় ইলিশের আমদানি কিছুটা কম। এটাকে অভিযানের সুফল হিসেবে দেখছেন মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা।

বরিশাল নগরের পোর্টরোডস্থ একমাত্র বেসরকারি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ঘুরে জানা গেছে, ভোর থেকে ট্রলারসহ বিভিন্ন নৌ-যানে মৎস্যজীবীরা ইলিশ নিয়ে হাজির হচ্ছেন বরিশালের কীর্তনখোলা নদী তীরের এ পাইকারি বাজারে। বিভিন্ন জায়গা থেকে এ বাজারে বিক্রির জন্য আনা হচ্ছে শত শত মণ ইলিশ। ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁকডাকে বর্তমানে মুখরিত বরিশালের এ পাইকারি বাজার। অথচ গত ৫ নভেম্বরের আগের ২২ দিন শত শত শ্রমিকের কর্মসংস্থানের এ জায়গাটি ছিল সুনশান। এ বাজারে নিষেধাজ্ঞার পর গত দু’দিনে দুই হাজার মণ ইলিশ কেনাবেচা হয়েছে। এরমধ্যে বৃহস্পতিবার বেচাকেনা হয়েছে এক হাজার তিনশ মণ এবং শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত প্রায় সাতশ মণ ইলিশের আমদানি হয়েছে। শুক্রবার পোর্টরোডস্থ এই পাইকারি বাজারে ছয়শ থেকে নয়শ গ্রাম ওজনের ইলিশের প্রতি কেজির পাইকারি দাম ছিল ৬৭৫ টাকা, এক কেজি ওজনের ইলিশ ৭২৫ টাকা, এক কেজির ওপরের ওজনের ইলিশের দাম আটশ টাকা এবং দেড় কেজি ওজনের ইলিশ নয়শ টাকা দরে বেচা-কেনা হয়েছে। তবে সাগরের ইলিশ বাজারে আসা শুরু করলে দাম কমতে পারে বলে জানিয়েছেন বরিশাল জেলা মৎস্য আড়তদার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অজিত কুমার দাস মনু। পোর্ট রোডের অনেক মৎস্য ব্যবসায়ী জানান, মৌসুমি জেলেরা নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও নদীতে ঠিকই ইলিশ শিকার করেছে, বিক্রিও হয়েছে। আর প্রজনন শেষে বেশিরভাগ মা ইলিশ সাগরে ফিরে গেছে, তাই নদীতে এখন ইলিশ কমে গেছে।

Rupantor Television

A IP Television Channel

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »