ঢাকায় হঠাৎ বেড়েছে ডেঙ্গুর প্রকোপ

চলতি বছর নির্ধারিত মৌসুমে মশাবাহিত ভাইরাস রোগ ডেঙ্গুর প্রকোপ খুব একটা দেখা না গেলেও বছরের শেষের দিকে এসে হঠাৎ বেড়ে গেছে আক্রান্তের সংখ্যা। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে ১২ জন ভর্তি হয়েছেন। অর্থাৎ প্রতি দুই ঘণ্টায় ১ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম যায়যায়দিনকে জানিয়েছে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা শিশু হাসপাতালে ২ জন, পিলখানার বিজিবি হাসপাতালে ৩ জন, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ২ জন ও অন্যান্য বেসরকারি হাসপাতালে ৫ জনসহ মোট ১২ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এছাড়া ডেঙ্গু ফিবারজনিত অসুস্থাবস্থায় বর্তমানে ঢাকার সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত ১২টি এবং বেসরকারি ২৯টি হাসপাতালে সর্বমোট ৪৬ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন।

চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৬৯৭ জন। এর মধ্যে হাসপাতাল থেকে ছাড় পেয়েছে ৬৪৬ জন। গতকাল পর্যন্ত দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে রোগী ভর্তি আছে ৪৬ জন।

চলতি বছরে ডেঙ্গু ফিবার, ডেঙ্গু শক সিনড্রোম ও ডেঙ্গু হেমোরজিক ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃতু্য সন্দেহে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে (আইইডিসিআর) ৫ জনের মৃতু্যর তথ্য প্রেরণ করা হয়। পরে আইইডিসিআর মৃতু্যর তথ্য পর্যালোচনা ২ জন ডেঙ্গুতে মারা গেছেন বলে নিশ্চিত করে।

এদিকে গত ২৫ অক্টোবর ডেঙ্গু হেমারেজিক ফিভারে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ডা. জাহিদুর রশীদ সুমন নামে একজন চিকিৎসক মারা যান। তার মৃতু্যর পরপরই আবার

\হআলোচনায় আসে ডেঙ্গু। এর আগে ২৮ আগস্ট রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে একজন চিকিৎসক মারা যান।

শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস) শাখার সহকারী পরিচালক ডা. মো. কামরুল কিবরিয়া স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ১৯৯ জন, ফেব্রম্নয়ারিতে ৪৫ জন, মার্চে ২৭ জন, এপ্রিলে ২৫ জন, মে’তে ১০ জন, জুনে ২০ জন, জুলাইতে ২৩ জন, আগস্টে ৬৮ জন, সেপ্টেম্বরে ৪৭ জন এবং অক্টোবরে ১৭৩ জন ও চলতি নভেম্বরের প্রথম ৬ দিনে (গতকাল পর্যন্ত) ৭০ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন।

সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ২৫টি ওয়ার্ড এখনো ডেঙ্গুঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা। এই শাখার এক জরিপে এই তথ্য দেখা গেছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মোট ১০০টি এলাকায় (ডিএনসিসি ৪১টি এবং ডিএসসিসি ৫৯টি), দুই হাজার ৯৯৯টি বাড়িতে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও জিকা ভাইরাসের ওপর জরিপটি পরিচালিত হয়।

১৯ থেকে ২৮ জুলাই পর্যন্ত দুই সিটি করপোরেশনে রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার জাতীয় ম্যালেরিয়া ও এডিস বাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আওতায় চালানো জরিপে বলা হয়েছে, উত্তর সিটি করপোরেশনের ৯টি এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১৬টি ওয়ার্ড ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে রয়েছে।

এসব ওয়ার্ডে এডিস মশার লার্ভার সূচক ব্রম্নটো ইনডেক্স ২০-এর বেশি। এর মধ্যে উত্তর সিটি করপোরেশনের ভেতরে রয়েছে ১০, ১১, ১৭, ১৯, ২১, ২৩, ২৪, ২৯, ৩২ নম্বর ওয়ার্ড এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ভেতরে রয়েছে ২, ৪, ৮, ৯, ১২, ১৩, ১৪, ১৫, ১৬, ১৮, ২৫, ৩৪, ৪০, ৪১, ৪৫ এবং ৫১ নম্বর ওয়ার্ড। তবে উত্তরে ১৭ নম্বর এবং দক্ষিণে ৫১ নম্বর ওয়ার্ড সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। ব্রম্নটো ইনডেক্স ২০-এর বেশি হলে তাকে ঝুঁকিপূর্ণ বলা হয়। জরিপে দেখা গেছে, উত্তর সিটি করপোরেশনে ২৯ এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩৮টি ওয়ার্ডের ব্রম্নটো ইনডেক্স ১০-এর বেশি এবং দুই সিটির পাঁচটি ওয়ার্ডে কোনো এডিস মশা পাওয়া যায়নি।

জরিপে জানানো হয়, সর্বোচ্চ বিআই (ব্রম্নটো ইনডেক্স) ৪৩ দশমিক ৩ পাওয়া গেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১১ নম্বর ওয়ার্ডের কল্যাণপুর, পাইকপাড়া ও মধ্য পাইকপাড়া এলাকায় এবং বিআই ৪০ পাওয়া গিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের খিলক্ষেত, কুড়িল ও নিকুঞ্জ এলাকায় এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৫১ নম্বর ওয়ার্ডের মীর হাজীরবাগ, দোলাইরপাড় ও গেন্ডারিয়া এলাকায় সর্বোচ্চ বিআই ৪০ পাওয়া গেছে। এই তিনটি ওয়ার্ড সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে।

মৌসুম জরিপে প্রাপ্ত এডিস মশার পজিটিভ কনটেইনারে (পানির উপস্থিতিপূর্ণ) শতকরা হার বহুতল ভবনে ৫০ দশমিক ৬১ শতাংশ, নির্মাণাধীন ভবনে ২১ দশমিক ১৭ শতাংশ, বস্তি এলাকাতে ১৩ দশমিক ১৪ শতাংশ, একক ভবনে ১২ দশমিক ৪১ শতাংশ এবং খালি জমিতে ২ দশমিক ৬৮ শতাংশ পাওয়া গেছে।

জরিপে এডিস মশার প্রজনন স্থানগুলোর মধ্যে শতকরা হার বহুতল ভবনে ৫১ দশমিক ৩৪ শতাংশ, নির্মাণাধীন ভবনে ২০ দশমিক ৩২ শতাংশ, বস্তি এলাকায় ১২ দশমিক ৮৩ শতাংশ, একক ভবনে ১২ দশমিক ৫৭ শতাংশ এবং পরিত্যক্ত জমিতে ২ দশমিক ৯৪ শতাংশ লার্ভা পাওয়া গেছে।

জানতে চাইলে জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এডিসবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সাবেক ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (জনস্বাস্থ্যবিদ) ডা. এম এম আখতারুজ্জামান যায়যায়দিনকে বলেন, বাংলাদেশ ভৌগোলিক অবস্থানগতভাবে এমন একটি দেশ, যেখনে থেমে থেমে বৃষ্টিপাত হওয়ার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ রয়েছে। যা মশার লার্ভা বা বংশ বিস্তারের জন্য অন্যতম। আরেকটি হলো কঠিন বর্জ্যব্যবস্থাপনা অপসারণ সবসময় উপেক্ষিত থাকা। এরই মধ্যে গত কয়েক দিন থেমে থেমে বৃষ্টিপাত হওয়ায় পরিত্যক্ত টায়ার, বোতল, ফুলের টব, ডাবের খোসায় পানি জমে ডেঙ্গু মশার উপদ্রব বাড়ছে, যা অপসারণ সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব থাকলেও যথাযথভাবে হচ্ছে না। ফলে মশা বাড়ছে।

এছাড়া এবার ডেঙ্গুর সময়ে করোনা সংক্রমণ হওয়ায় অনেক ডেঙ্গু আক্রান্ত হলেও সার্বিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা হুমকির মুখে পড়ায় এটি উপেক্ষিত থেকে গেছে। এখন জনসাধারণের মধ্যে করোনাভীতি কিছুটা দূর হলেও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা বাড়ছে। তবে নভেম্বরে এসে ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা অশনিসংকেত। এটি নিয়ন্ত্রণ করতে হলে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, সরকার ও নীতিনির্ধারকদের প্রতিদিনের রুটিন ব্যবস্থাপনায় ডেঙ্গু গাইডলাইন অনুযায়ী ত্বরিত ব্যবস্থা নিতে হবে।

Rupantor Television

A IP Television Channel

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »