বিচারের সময় কমানোর আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

বিচারের রায় বাংলায় লেখার উদ্যোগ নিতে প্রধান বিচারপতি ও আইনমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, বিচারের রায় বাংলায় লেখার ব্যবস্থা নিতে হবে। এটা আমি চাই, আপনারা ব্যবস্থা নিন। আমি মনে করি এটা একান্তভাবে দরকার। প্রধানমন্ত্রী একইসঙ্গে মামলার দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে দ্রম্নততম সময়ে রায় দেওয়ার উপায় খুঁজে বের করার জন্য বিচারক ও আইনজীবীদের অনুরোধ জানিয়েছেন

রাজধানীর জনসন রোডস্থ আদালত পাড়ায় ঢাকা জেলার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত নবনির্মিত ভবনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বুধবার এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। গণভবন থেকে ঢাকা চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবনে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন তিনি।

আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে আইন সচিব গোলাম সারোয়ার মূল অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত থেকে ভবনের ফলক উন্মোচন করেন। গণভবন প্রান্তে অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস।

শেখ হাসিনা বলেন, রায় লেখায় ব্যবহৃত অনেক শব্দ, কথা ও টার্ম সাধারণভাবে ব্যবহার হয় না। অনেকেই রায় সহজে বুঝতে পারে না। কিন্তু বাংলায় লেখা হলে কী রায় পেল, তা বিচারপ্রার্থী নিজে দেখতে পারবে, জানতে পারবে, বুঝতে পারবে। এ ব্যাপারে যদি কোনো ফান্ড লাগে, সেটাও ব্যবস্থা করব। কিন্তু আমি চাই, এটা যেন হয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের মামলার রায়গুলো কিন্তু ইংরেজিতে দেওয়া হয়। আমাদের দেশে এখন হয়তো একটু লেখাপড়ার সংখ্যা বাড়ছে। তারপরও অনেক সময় অনেকে সেই রায়টা বুঝতে পারেন না। তার সহায়ক যে থাকেন তিনি যা বোঝান তাই বুঝতে বাধ্য হন। রায় যদি কেউ বাংলায় না লিখতে পারেন, তাতে আপত্তি নেই। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সেটা বাংলায় ট্রান্সলেশন করে এটা যেন প্রচার হয়, সে ব্যবস্থাটা করে দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, আমি খুব প্র্যাকটিক্যাল চিন্তা করি। দীর্ঘদিন ধরে ইংরেজিতে লিখতে লিখতে অনেকে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। এখন আমি যদি ওটাকে খুব চাপ দেই বাংলায় সব লিখে ফেলতে হবে তাহলেই কিন্তু এটা থেমে যেতে পারে। কাজেই সেখানে বলব, আর এখন ট্রান্সলেশন করা এমন কোনো কঠিন কাজ না। আর অনেক প্রফেশনাল ট্রান্সলেটরও থাকে এবং তাদের আপনারা কিছু ট্রেনিং করিয়ে নিতে পারেন।

আইনমন্ত্রীর উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আইনমন্ত্রী এখানে আছেন। আর এ ব্যাপারে যদি কোনো ফান্ড লাগে, সেটাও আমি ব্যবস্থা করব। কিন্তু আমি চাই, এটা যেন হয়। যাতে ট্রান্সলেশনের সঙ্গে সঙ্গে প্রচার হয়। আর এখন তো অনলাইনে চলে যাবে। আরও সুবিধা, মানুষ জানতে পারবে।

বিচারাধীন মামলাগুলোর দীর্ঘসূত্রিতা কমিয়ে দ্রম্নত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ২০২০ সালের জুন মাস পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন আদালতসমূহে ৩৭ লাখ ৯৪ হাজার ৯০৮টা মামলা বিচারাধীন আছে। এসব মামলার দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে দ্রম্নততম সময়ে রায় প্রদানের উপায় বের করার জন্য আমি সব বিচারক এবং আইনজীবী সবার কাছে আমি অনুরোধ জানাচ্ছি।

তিনি আরও বলেন, এত মামলা যেন এভাবে জমে না থাকে। আপনারা কিভাবে দ্রম্নত বিচার সম্পন্ন করা যায়, অবশ্যই সেই ব্যাপারে একটু আন্তরিক হবেন এবং ব্যবস্থা নেবেন এবং এর জন্য যদি কোনো রকমের কিছু সহযেগিতা প্রয়োজন হয়, সরকারের পক্ষ থেকে সেটা আমরা নিশ্চয়ই করব। কিন্তু এতগুলো মামলা এভাবে পড়ে থাকুক সেটা আমরা চাই না।

আওয়ামী লীগ সরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারবদ্ধ উলেস্নখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষ যেন ন্যায় বিচার পায়, মানুষ যেন ভালো থাকে, স্বস্তিতে থাকে, শান্তিতে থাকে, নিরাপদে থাকে এবং উন্নত জীবন পায়। আর এভাবেই যেন আমরা জাতির পিতার স্বপ্নের উন্নত, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে পারি। এ লক্ষ্যে ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবার জন্য সমতার ভিত্তিতে সুবিচার নিশ্চিত করা এবং বিচার ব্যবস্থার উন্নয়ন সাধন করে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় আমাদের সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘আইনের দৃষ্টিতে সকলেই সমান এবং সকলেই আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।’ আবার ১৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করিতে রাষ্ট্র সচেষ্ট হইবে।’ কিন্তু তিনি এবং তার বোন (শেখ রেহানা) জাতির পিতার হত্যাকান্ডের বিচার চাইতে পারেননি। ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স জারি করে জিয়াউর রহমান সে বিচারের পথ রুদ্ধ করে দেন বলে জানান শেখ হাসিনা।

১০ ট্রাক অস্ত্র মামলা, বিডিআর বিদ্রোহ ও হত্যাকান্ডের বিচার, নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত ৭ খুনের মামলা এবং হলি আর্টিজেন হত্যাকান্ডের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলাসহ বর্তমান সরকারের আমলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলার বিচার কাজ সম্পন্ন হওয়ায় বিচারকদের ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি আরও বলেন, বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ ও এজলাস সংকট নিরসনের পাশাপাশি মামলা ব্যবস্থাপনার দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। ২০১০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ১১ বছরে অধঃস্তন আদালতে ১১২৬ জন বিচারক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দরিদ্র-অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সরকারিভাবে আইনি সহায়তা প্রদান করার লক্ষ্যে দেশের ৬৪টি জেলা সদরে এবং সুপ্রিম কোর্টে লিগ্যাল এইড অফিস স্থাপন করা হয়েছে। ২০০৯ থেকে জুলাই ২০২০ পর্যন্ত জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার মাধ্যমে সর্বমোট ৫ লাখ ২৫ হাজার ৩০ জনকে বিনামূল্যে আইনি সেবা প্রদান করা হয়েছে।

বাংলাদেশে একটি স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠায় আওয়ামী লীগ সরকার সব সময়ই আন্তরিক উলেস্নখ করে তিনি আরও বলেন, ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর পরই ‘দি কোড অব ক্রিমিন্যাল প্রসিডিউর (সংশোধন) আইন, ২০০৯’ পাসের মাধ্যমে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের কাজটিকে স্থায়ী রূপ দিয়েছে।

বিচার বিভাগের বিভিন্ন উন্নয়নের কথা উলেস্নখ করে তিনি আরও বলেন, অধঃস্তন আদালতের বিচারকদের জন্য পৃথক বেতন স্কেল বাস্তবায়ন, বিচারকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির পাশাপাশি জুডিশিয়াল ভাতা প্রদান করা হয়েছে। ৪২টি জেলায় চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের জন্য ৮-১০ তলা পর্যন্ত ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। এরই মধ্যে ২৯টি জেলায় নবনির্মিত আদালত ভবন উদ্বোধন করা হয়েছে।

Rupantor Television

A IP Television Channel

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »