দরজায় শীতের উঁকিঝুঁকি মনে করোনার ভয়

কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘দুয়ারে আসিছে শীত; বরি লও তারে…। হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগিয়ে আসছে শীত। ভোরের শিশির ভেজা ঘাস ও কাঁচা-পাকা ধানের শীষে মুক্তোদানা চুপিচুপি শীতের আগমন বার্তা দিচ্ছে। উত্তর থেকে আসছে শিরশিরে বাতাস। দীর্ঘ রাতের কুয়াশার আবরণ আর সকালের শিশির বিন্দু দেখে শীতের আগাম আমেজ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একই সঙ্গে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ নিয়েও মানুষের মনে চরম ভীতি দেখা দিয়েছে।

দুর্গাপূজা, দীপাবলি। এরপরই শীতের আগমন। গ্রীষ্মপ্রধান এই দেশে শীতকালে কয়েকটা দিনের শীতল স্পর্শের জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে সবাই। কিন্তু এবারের পরিস্থিতিটা আলাদা। শীতকালে করোনা সংক্রমণ আরও বাড়বে বলে আগে থেকেই সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে যাদের শ্বাসকষ্ট আছে, শীতে তাদের সেই সমস্যা আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বলছেন, এবারের শীতে করোনাভাইরাস মোকাবিলাই হচ্ছে বড় চ্যালেঞ্জ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিরাপদ এবং যথেষ্ট কার্যকরী করোনা ভ্যাকসিন বাজারে আসতে আসতে ২০২১-এর মার্চ মাস হয়ে যাবে। এর মানে গোটা শীতকালটা করোনা ভ্যাকসিন ছাড়াই কাটাতে হবে। সর্দি-কাশি যাদের বেশি, তাদের একসঙ্গে করোনা এবং ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আবহাওয়াবিদ শাহীনুল ইসলাম যায়যায়দিনকে বলেন, আবহাওয়ার ভাষায় শীতকাল ধরা হয় ডিসেম্বর, জানুয়ারি আর ফেব্রম্নয়ারি- এই তিন মাস। আর আগে অক্টোবর ও নভেম্বর সাধারণ রাজশাহী, ময়মনসিংহ, সিলেট ও খুলনা বিভাগে কিছু কিছু এলাকায় শীত শুরু হয়ে যায়। এবারও তাই হয়েছে। শীতকালে সাধারণ প্রাকৃতিক দুর্যোগ সাইক্লোন বা ঘূর্ণিঝড় হয় না। তবে মাঝে-মধ্যে ব্যতিক্রম হতেও পারে। ডিসেম্বর, জানুয়ারি ও ফেব্রম্নয়ারি বাংলাদেশের জন্য পুরোপুরি শীতকাল। তবে জানুয়ারি ও ফেব্রম্নয়ারিতে শীতের তীব্রতা বেশি হয়ে থাকে। এবারও তাই হবে। তার মতে, আগামী মাসের (নভেম্বর) শুরুর দিকে বাংলাদেশে বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। ওই বৃষ্টি

হওয়ার পর শীতের আগমনী বার্তা নিয়ে আসবে। তবে ডিসেম্বর-জানুয়ারির মতো তীব্র হবে না।

আবওহাওয়া অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এবারের শীতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে অক্টোবর-নভেম্বর বাংলাদেশের ঘূর্ণিঝড়ের সিজন। নভেম্বরে সাগরে কয়েকটি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে। তার মধ্যে একটি বা দুটি ঘূর্ণিঝড়ে রূপান্তরিত হতে পারে। তবে ডিসেম্বর, জানুয়ারি ও ফেব্রম্নয়ারি প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাবনা খুবই কম।

ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে ফেব্রম্নয়ারির মাঝামাঝি শীতকাল হলেও বাস্তবে নভেম্বর থেকেই হালকা শীত অনুভূত হয়। জানুয়ারি মাসে গড় তাপমাত্রা দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে শুরু করে উপকূলীয় অঞ্চলে ২০-২১ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বজায় থাকে। এ সময় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কম থাকে।

কিছু ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়া রয়েছে, যারা শীতে খুব সক্রিয় থাকে। শীতের সময় অসুখ-বিসুখ বাড়ে না; বরং কিছু কিছু রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পায়। শীতের রোগ বিষয়ে সতর্ক থাকতে পরামর্শ দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউর) মেডিসিন বিভাগের সাবেক ডিন ও ইউজিসি অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুলস্নাহ। তিনি যায়যায়দিনকে বলেন, শীতের সময় কমন অসুখ হলো সর্দি-কাশি-জ্বর,। এ ছাড়া নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট বা অ্যাজমা, অ্যালার্জি, চোখ ওঠা, ডায়রিয়া, খুশকি, খোসপাঁচড়া বা চর্মরোগ প্রভৃতিরও প্রকোপ বেশি দেখা দেয়।

তবে শীত সামনে রেখে কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকলে এসব রোগের জটিলতা থেকে রেহাই পাওয়া যায়। তিনি বলেন, সর্দি-কাশি-জ্বর শীতের সময়কার একটি সাধারণ রোগ। সর্দিজ্বর দেহের শ্বাসনালির ভাইরাসজনিত এক ধরনের সংক্রমণ। ঋতু পরিবর্তনের সময় এই রোগ বেশি দেখা যায়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যাদের কম, তাদের এই রোগ বেশি হয়। হাঁচি-কাশির মাধ্যমে এসব রোগ একজনের শরীর থেকে অন্যজনের শরীরে ছড়ায়। সর্দিজ্বর হলে প্রথমে নাকে ও গলায় অস্বস্তি লাগে, হাঁচি হয়, নাক দিয়ে অনবরত পানি ঝরতে থাকে। নাক বন্ধও থাকতে পারে। মাথাব্যথা, মাথা ভারি বোধ হওয়া, শরীরে ব্যথা, জ্বর, গলাব্যথা প্রভৃতি উপসর্গও দেখা যায়।

এদিকে, গত ২৮ আগস্ট স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নবনিযুক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম কোভিড-১৯ নিয়ে জনস্বাস্থ্য-বিষয়ক জাতীয় কমিটির সঙ্গে অনলাইন সভা করেন। সেখানে আট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত আট সদস্যই উপস্থিত ছিলেন। ওই সভা সূত্রে জানা যায়, সেখানে করোনা-বিষয়ক সাতটি এজেন্ডা নিয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত হয়। এর মধ্যে তিন নম্বরে রয়েছে শীতকালের করোনা পরিস্থিতি।

অন্যদিকে, বাতাস করোনাভাইরাস ট্রান্সমিশনের অন্যতম বাহক বলে জানান জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. লিয়াকত আলী। তিনি যায়যায়দিনকে বলেন, ‘শীতের সময় ঘর বদ্ধ থাকে এবং ভেন্টিলেশন কম থাকে বলে এসব রোগ বাড়ে। শীতে অনেকে ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ রাখে। এতে করে সবার হাঁচি-কাশি আবদ্ধ ঘরের বাতাসে জমা হয়। তাই সংক্রমণ কমাতে ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা করতে হবে।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের ভাইরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. জাহিদুর রহমান বলেন, ‘শীতের সময় আবহাওয়ার কারণে সর্দি-কাশি বেশি হয়, আবার যেকোনো ছোঁয়াচে রোগ শীত ও বর্ষায় বেশি হয়। একই সঙ্গে হিউমিলিটি যখন ড্রাই থাকে, তখন সেটা বাতাসে বেশিক্ষণ থাকে। এ জন্য সংক্রমণের সম্ভাবনাও বাড়ে। তিনি বলেন ‘অ্যাজমা বা শ্বাসকষ্ট যাদের থাকে, তাদের শীতের সময় এসব রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। এ কারণে ভাইরাসের শিকার হলে সেটা সিভিয়ার হয়ে যায়।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলের এই চিকিৎসক বলেন, শীতের সময় সংক্রমণ বাড়বেই। এটা এখন কমলেও পরে বাড়বে। এটাকে সেকেন্ড ওয়েভ বলা যায়। তাই সংক্রমণ কমাতে হলে এখন থেকেই পদক্ষেপ ও প্রস্তুতি নেওয়া দরকার বলে মনে করেন তিনি।

Rupantor Television

A IP Television Channel

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »