মামলাবাজ সিন্ডিকেটে কারাবন্দি জীবন

মামলার বাদীর ঠিকানা ভুয়া। সাক্ষীর পূর্ণাঙ্গ ঠিকানাও থাকে না। মামলা দায়েরের পর আদালতে মিথ্যা পরিচয় দিয়ে বাদীকে উপস্থিত করা হয়। আদালতে মামলার শুনানিতে বাদীপক্ষের আইনজীবী উপস্থিত থাকেন। শুনানিতে আইনজীবীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত আসামির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে।

ঐ গ্রেফতারি পরোয়ানাটি দ্রুত আসামির ঠিকানার সংশ্লিষ্ট থানায় পৌঁছানো হয়। এরপর ঐ মামলাবাজ চক্রের সহায়তায় পুলিশ আসামিকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠায়। আদালত আসামির জামিন শুনানির দিন অন্তত এক সপ্তাহ পরের তারিখ ধার্য করে। ঐ সময়ের মধ্যে আসামিকে কারাগারে থাকতে হয়। এরই মধ্যে ঐ চক্রটি আসামির বিরুদ্ধে একাধিক ভুয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা তৈরি করে সংশ্লিষ্ট থানায় পাঠায়। এবার পূর্বের মামলার জামিন শুনানিতে আসামি জামিন পায়। জামিন নির্দেশনার বলে আসামি কারাগার থেকে বের হওয়ার সময় তার বিরুদ্ধে আরো একটি গ্রেফতারি পরোয়ানা সেখানে পৌঁছে যায়। ফলে আসামিকে আর মুক্তি দেওয়া হয় না। তাকে কারাবন্দি জীবনযাপন করতে হয়।

এভাবেই একটি মামলাবাজ সিন্ডিকেট সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে তাদের সর্বস্বান্ত করছে। জমি দখল, চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট, পূর্বশত্রুতার জেরসহ নানাবিধ কারণে প্রতিপক্ষরাই এই সিন্ডিকেট দিয়ে সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করছে।

গত ৭ অক্টোবর ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে দায়ের করা সিআর মামলা নং-৪৪০/২০২০ তে বাদীর ঠিকানা বলা হয়েছে জাকির হোসেন, বাসা নং-৫২/ক/১, ফ্ল্যাট-এ-২, রোড ৮/এ, ধানমন্ডি, ঢাকা। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে আসামি সৈয়দ রফিকুল ইসলাম দিলুর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। আসামির উল্লেখিত ঠিকানা সংশ্লিষ্ট তেজগাঁও থানায় পাঠানো হয়। গ্রেফতারি পরোয়ানা পেয়ে পুলিশ ১৩ অক্টোবর রাতে মণিপুরীপাড়ার ১৪৭/সি নম্বর বাড়ি থেকে আসামিকে গ্রেফতার করে পর দিন আদালতে পাঠায়। আদালত তার জামিনের শুনানির সময় বাদীকে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেয়। বাদী হাজির হতে পারেননি বলে পরদিন ১৫ অক্টোবর পুনরায় জামিনের শুনানির দিন ধার্য করে আদালত। এদিনও জামিনের শুনানির সময় মামলার বাদীকে হাজির করতে পারেননি বাদীর আইনজীবী। পরবর্তী সময়ে আসামির জামিনের শুনানির দিন ধার্য করে ১৯ অক্টোবর। ঐদিনও বাদীকে হাজির করতে পারেনি বলে আদালত আসামিকে জামিন দেয়।

ভুক্তভোগী সৈয়দ রফিকুল ইসলাম দিলু জানান, পুলিশ তদন্ত করে দেখতে পায় যে তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার বাদীর ঠিকানা ভুয়া। ধানমন্ডির ঐ ঠিকানায় জাকির হোসেন নামে কেউ বসবাস করেন না। দিলু বলেন, তিনি জিএমসি বিল্ডার্সের পরিচালক। এই প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক পার্টনার আব্দুল মালেক খান, শাহাদত হোসেন, সৈয়দ মাসুদ, শামীম আহমেদ ও নুরুল ইসলাম জয়েন্ট স্টক কোম্পানিতে স্বাক্ষর জালিয়াতির মাধ্যমে তার কোম্পানি থেকে ২ কোটি টাকা আত্মসাত্ করে। তারা জিএমসি বিল্ডার্স থেকে ২ কোটি টাকা স্থানান্তর করে নিজেদের নামে জিএনসি ডিজাইনার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি, বাংলাদেশ হোম মেকার্স ও জেএন এন্টারপ্রাইজ নামক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। এসব প্রতিষ্ঠানের নামে মিরপুর ও শেওড়াপাড়ায় সাতটি বহুতল ভবন নির্মাণ করে যার মধ্যে তিনটি ভবন অবৈধ নির্মাণের কারণে রাজউক ইতিমধ্যে সেগুলো ভেঙে ফেলার নোটিশ দিয়েছে। তাদের জাল জালিয়াতির তথ্য ফাঁস করার কারণে তারা একটি মামলাবাজ সিন্ডিকেট দিয়ে তার বিরুদ্ধে আদালতে মিথ্যা মামলা দায়ের করে। এতে তাকে আট দিন জেল খাটতে হয়েছে।

আশুলিয়ার মির্জানগর এলাকার তাকসুর গ্রামের ১৪ কাঠা জমির মালিক আওলাদ হোসেন। তার জমিসংলগ্ন পাঁচ বিঘা জমির মালিক সৌদিফেরত প্রবাসী দানেশ ঢালি। তার জমি দানেশ ঢালির কাছে বিক্রি করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। তিনি জমি বিক্রি করতে না চাইলে তার সঙ্গে দ্বন্দ্ব হয়। গত বছর ২৯ অক্টোবর রাতে পুলিশ একটি গ্রেফতারি পরোয়ানা দেখিয়ে আওলাদ হোসেনকে গ্রেফতার করে। ঢাকার আদালতে হাজির করার পর জামিনের শুনানির দিন ধার্য করে এক সপ্তাহ পর। আদালতে জামিন দেওয়ার পর কেরানীগঞ্জ কারাগারে কক্সবাজার আদালতে ৩২৫/১২ নম্বর মামলার গ্রেফতারি পরোয়ানা যায়। ঐ গ্রেফতারি পরোয়ানায় তাকে কক্সবাজার আদালতে হাজির করা হয়। ২০১২ সালের দায়ের করা মামলাটি ছিল নিষ্পত্তিমূলক মামলা। পরে কক্সবাজার থেকে তাকে কেরানীগঞ্জ কারাগারে পাঠানো হয়। কেরানীগঞ্জ কারাগারে রাজশাহীর তানোর থানার নারী নির্যাতন দমন আইনের একটি মামলার গ্রেফতারি পরোয়ানা পৌঁছে। এই মামলায় তাকে রাজশাহীর আদালতে তোলার পর সেটিও ভুয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা বলে প্রমাণ মেলে। এবার তাকে কেরানীগঞ্জ কারাগারে আনার পর বাগেরহাট আদালতের একটি মামলার পিডব্লিউ (প্রিভিয়াস ওয়ারেন্ট) দেখানো হয়। এরপর তাকে বাগেরহাট আদালতে তোলা হয়। সেখান থেকে জামিন নেওয়ার পর শেরপুর আদালতের একটি গ্রেফতারি পরোয়ানায় তাকে শেরপুর পাঠানো হয়। এভাবে ৩০ অক্টোবর থেকে ৬ ফেব্রুয়ারি দেশের সাতটি জেলার ডজনখানেক ভুয়া মামলায় আওলাদ হোসেনকে কারাবন্দি রাখা হয়। এরপর উচ্চ আদালতের নির্দেশে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।

শ্যামলী হাউজিংয়ের দ্বিতীয় প্রকল্পের এইচ ব্লকের ১ নম্বর রোডের ১৩ নম্বর বাড়ির মালিক দুই সহোদর মইন উদ্দিন ও জহির উদ্দিন। তিন কাঠার প্লটে টিনশেডের সাতটি ঘর নির্মাণ করে তারা বসবাস করতে থাকেন ২০০৭ সাল থেকে। বাড়ির গ্যাস ও বিদ্যুত্ লাইন তাদের নামে। ২০১৩ সালে আদালত থেকে একটি মামলার রায় আসে যে তাদের বাড়ির মালিক হুমায়ন ও হাবিব। আদালতে মামলা দায়েরের বিষয়টি দুই সহোদর জানতেন না। স্থানীয় সন্ত্রাসী চক্র মনির বাহিনীর ক্যাডাররা তাদের বাড়িটি দখল করে নেয়। পরবর্তী সময়ে আদালতে খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারেন যে হুমায়ন ও হাবিবের দায়ের করা মামলায় বাড়ির কাগজপত্র জমা দেওয়া হয়েছিল বি ব্লকের ১ নম্বর রোডের ১৩ নম্বর বাড়ির ঠিকানায়। ঐ চক্রটি ব্লকের ঠিকানা পরিবর্তন করে দিয়ে অন্যের জমির কাগজপত্র জমা দিয়ে ঐ আদালত থেকে তাদের পক্ষে একতরফা রায় নেয়। এই ভুয়া মামলা করে এখন পর্যন্ত মনির বাহিনী তাদের বাড়িটি দখল করে রেখেছে।

এ ব্যাপারে ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতের পাবলিক প্রসিকিউসন (পিপি) আব্দুল্লাহ আবু বলেন, মামলার বাদী তার মিথ্যা পরিচয় দিয়ে মামলা দায়ের করলে আইনজীবীর করার কিছুই থাকে না। কারণ একজন আইনজীবীর পক্ষে বাদীর নাম ঠিকানা যাচাই করা সম্ভব হয় না। এ ধরনের মিথ্যা পরিচয় দিয়ে মামলা দায়ের করলে, নিরপরাধ মানুষ ভুক্তভোগীর শিকার হন। সে ক্ষেত্রে থানায় বা আদালতে মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে বাদীর জাতীয় পরিচয়পত্র সংযুক্ত করলে মিথ্যা মামলা দায়েরের হয়রানি অনেক কমে যাবে। জাতীয় পরিচয়পত্র সংযুক্ত করার নির্দেশনা আদালত দিতে পারে।

Rupantor Television

A IP Television Channel

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »