গাজী মাজহারুল আনোয়ার : বাংলা গানের সূর্য

মানুষ এক জীবনে হাজার হাজার কোটি টাকা উপার্জন করে, গাড়ি করে, বাড়ি করে; একটা সময় সবই চলে যায়। পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী ও শান শওকতের অধিকারী সম্রাটের ক্ষমতা হারিয়ে গেছে কালের গর্ভে। মাটিতে মিশে গেছে মানুষের গড়া অনেক গর্বিত সভ্যতাও। তার ভিড়ে কিছু মানুষ এমন কিছু কাজ করে গেছেন যা শত সহস্র বছর পেরিয়েও এই পৃথিবীতে টিকে আছে নন্দিত হয়ে, অনুপ্রেরণায়।

সেই অনুপ্রেরণার পৃথিবীতে গাজী মাজহারুল আনোয়ার লিখলেন অনবদ্য এক ইতিহাস। প্রায় ২০-২৫ হাজার গান লিখেছেন তিনি। যা অবিশ্বাস্য, বিস্ময়কর ও অসাধারণ এক সাফল্য। মুক্তিযুদ্ধ, দেশপ্রেম, প্রকৃতি, জীবনবোধ, প্রেম, বিরহ, স্নেহ; অনুভূতির বৈচিত্রময় প্রকাশে গেল কয়েক দশক ধরেই এদেশের মানুষের কাছে খুব প্রিয় গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা গান। অসংখ্য কালজয়ী গানের স্রষ্টা তিনি। আমাদের সংগীতের জীবন্ত কিংবদন্তি। বিবিসি বাংলার তৈরি করা করা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বিশটি বাংলা গানের তালিকায় রয়েছে তার লেখা তিনটি গান। এটাও এক বিরল সম্মান বটে।

গানের বাইরেও গাজী মাজহারুল আনোয়ার বিকশিত হয়েছেন একজন চলচ্চিত্র চিত্রনাট্যকার, পরিচালক ও প্রযোজক হিসেবেও। কর্মের স্বীকৃতি হিসেবে এক জীবনে কোটি মানুষের ভালোবাসা ও দোয়াকেই সেরা বলে মনে করেন। পেয়েছেন বেশ কয়েকবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। তিনি ২০০২ সালে বাংলাদেশের একুশে পদকও লাভ করেন।

সম্প্রতি তার বাসভবনে হয়ে গেল এক ঘরোয়া আড্ডা। যেখানে চেনাজানা সদালাপী গাজী মাজহারুল আনোয়ারকেই পাওয়া গেল। পাশাপাশি জানা গেল তার কিছু অজানা অধ্যায়-

কুমিল্লায় সূর্য উঠেছে
জন্মেছেন কুমিল্লায়। দাউদকান্দি থানার তালেশ্বর গ্রাম তার। বনেদি পরিবারের সন্তান। দাদা ও দাদি দুজনই ছিলেন জমিদার বংশের। বাবা ব্রিটিশ আমলের আইনজীবী। সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে। বেড়ে উঠেছেন কুমিল্লাতেই। তার প্রথম স্কুল কুমিল্লা জেলা স্কুল। এরপর কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে। জীবনের দারুণ সময় কেটেছে তার কুমিল্লায়। শিক্ষীজীবনের সেইসব দিন আজও ফিরে এসে স্মৃতির আয়নায় ভেসে উঠে, ডুবে যায়; সোনালি পোশাকে।

বড় দঃখ নিয়ে বাবা লিখলেন, ‘ইউ আর মাই লস্ট নেম’
সব পিতামাতাই প্রত্যাশা করে ছেলে বড় হবে, নাম করবে। গাজী মাজহারুল আনোয়ারের বাবা ও মা-ও সেটা করতেন। সন্তান নিয়ে এটুকু বাবা-মায়ের অধিকার। তবে তাই বলে ছেলের স্বাধীন জীবনে তারা খুব একটা হস্তক্ষেপ করেননি। কারণ ছোটবেলা থেকেই ভিষণ মেধাবী ছিলেন গাজী। বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ছিলেন। আইনজীবী বাবা চাইতেন ছেলে ডাক্তার হবে। কলেজ শেষ করে ছেলে ভর্তিও হলেন ঢাকা মেডিকেলে। কিন্তু ওষুধের গন্ধ, মরে পঁচে গলে পড়ে থাকা লাশের গন্ধ, হাসপাতালের দিনযাপন সহ্য করতে পারলেন না। সিদ্ধান্ত নিলেন ডাক্তারি ছেড়ে দেবেন। সুন্দরী ক্লাসমেট অবাক হলো। সে সাহস দিলো, বললো সবরকম সহযোগিতা করবে। ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে যাবে। এই সেই। গাজী মাজহারুল আনোয়ার ধারণা করলেন ওই সুন্দরী সহপাঠিনী তার প্রেমে পড়েছেন। তবে সেই প্রেম ডাক্তারি পড়ার সাহস দিতে পারলো না। অগ্যতা ‘বিদায় জিন্দাবাদ’ বলে দিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজকে। সেই সময়টাতেই তিনি শুরু করলেন গান লেখা। এ খবর বাবার কানে যেতেই বাবা বড় বিষাদ-বেদনা নিয়ে চিঠি লিখলেন, ‘ইউ আর মাই লস্ট নেম’।

‘প্রথমত বাবা মানতে পারেননি আমি ডাক্তারি ছেড়ে দিয়েছি। তারপর যখন শুনলেন আমি গান লিখে বেড়াচ্ছি খুব হতাশ হয়ে গেলেন। ধরেই নিলেন ছেলের গতি আর হবে না। বড় দুঃখ নিয়ে তিনি আমাকে চিঠিতে লিখেছিলেন, আমি তার হারিয়ে যাওয়া নাম। তবে সেই কথায় তিনি অটল থাকতে পারেননি। যখন বেশ নাম ডাক হলো একদিন ডাকলেন। কাছে যেতেই বুকে জড়িয়ে নিলেন। বললেন, ‘তুমি কখনোই আমার হারিয়ে ফেলা ছেলে নও।’ সেদিন খুব আনন্দ হয়েছিলো। মনে হয়েছিলো যাক, বাবার স্বপ্ন পূরণ না করতে পারলেও তাকে অন্তত লজ্জিত করিনি বোঝা গেল’- যোগ করেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার।

Gazi-05.jpg

দাদার দেয়া রঙিন সেই পাঁচ টাকার নোট
আমার দাদা জমিদার ছিলেন। বিশাল এলাকা ছিলো তার। দাদীও জমিদার বাড়ির মেয়ে। ছেলেবেলায় দাদা-দাদীর কাছে যেতাম, দারুণ সময় কাটতো। দাদা ছিলেন সুফি টাইপের মানুষ। অনেক কিছু চিন্তা করে কাজ করতেন, কথা বলতেন। একবার আমের মৌসুমে বাড়ি গেলাম। দাদা একটা একটা করে আম খেতে দিচ্ছেন। তাই দেখে দাদী রেগে গেলেন। বললেন, ‘চারদিকে এত এত আম গাছ। আম পড়ছে, পঁচে গলে যাচ্ছে। আর তুমি আমাদের নাতিদের গুনে গুনে আম খাওয়াচ্ছো?’ দাদা উত্তর দিলেন, ‘দেখো আমি ওদের একেক প্রজাতির আম একটা একটা করে খাওয়াচ্ছি। যাতে করে ওরা বুঝতে পারে ভালো কোনটা আর মন্দ কোনটা। জীবনে ভালো মন্দ বিচার করতে পারাটা জরুরি। ছেড়ে দিলে ওরা তো সব আম একসাথে খেয়ে বুঝতে পারবে না কোনটার স্বাদ কেমন।’ দাদার সেই কথাটা আজও মনে পড়ে।

সেই দাদা আমাকে প্রথমবার গানের জন্য পারিশ্রমিক দিয়েছিলেন। গল্পটা হলো গ্রামে তখন কিছু লোকজন দলবেঁধে গান শোনাতো। লোকে তাদের গান শুনে টাকা দিতো। সেটা বেশিরভাগ সময়ই রাতের বেলায় হতো। একদিন সকালে দাদা আমাকে বললেন, ‘কাল রাতে গানের দল যে গানটি গেয়েছে তুমি কি তার দুটি লাইন বলতে পারবে? যদি পারো পাঁচ টাকা পাবে।’ চেয়ে দেখলাম দাদার সাদা পাঞ্জাবীর বুক পকেটে লাল রঙের পাঁচ টাকার নোট। টাকার লোভে হরহর করে বলে দিলাম গানের দুটি লাইন। সেটি ছিলো গানের কোরাস। বারবার গাইছিলো শিল্পীরা। তাই মনে ও মগজে ঢুকে গিয়েছিলো। দাদা শুনে খুব খুশি হলেন। টাকাটাও দিলেন।

দাদা ওই বয়সে পাঁচ টাকার লোভ দেখিয়ে ভালো করলেন না মন্দ করলেন জানি না। তবে গানের জন্য আমাকে প্রথম পারিশ্রমিকটা দাদাই দিয়েছিলেন। সেটা হয়তো একটা ইশারা ছিলো আমি গানেই ক্যারিয়ার গড়ে তুলবো।

ষাট দশকে মালিবাগের উত্তাল দিনগুলো
ষাটের দশক। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তখন। নানা ইস্যুতে উত্তাল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান। মিছিল, মিটিং, আন্দোলন, বিপ্লব- চলছেই। তখন মালিবাগে থাকতেন তরুণ গাজী মাজহারুল আনোয়ার। এক ভ্যান চালক স্ত্রীকে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন তাকে রান্না করে খাওয়াবে সেই চুক্তিতে। ১৯৬৩ সাল থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি গান লেখালেখি শুরু করেন তিনি।

তখন আলতাফ মাহমুদদের মতো গুণি মানুষদের সঙ্গে পরিচয় ঘটে। ডিআইটি রোডে বিটিভি তখন। সেখানকার স্টুডিওতেই কাটতো সময়। নিয়মিত যেতেন রেডিওতেও। দেশের গানের সোনালি যুগ চলছিলো। তবে অস্থিরতার মধ্যেও সময় কাটাতে হতো। যখন তখন পুলিশ-মিলিটারির হানা।

আলতাফ মাহমুদের সঙ্গে ইয়াহিয়া খানকে নিয়ে একটি গান লিখে বিপদে পড়ে গেলেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার। তার নামে ওয়ারেন্ট জারি হলো। আলতাফ মাহমুদ বলে দিলেন একটু সাবধানে থাকতে। বাধ্য হয়ে লুকিয়ে চলাফেরা করতে হতো।

‘এইসব আতঙ্কের মধ্যেই ডিআইটি রোডে বিটিভির স্টুডিওতে বসে আছি। নতুন গানের কাজ চলছিলো। হঠাৎ বিকট আওয়াজ। সবাই ভয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। আমি আর বের হতে পারিনি। মিলিটারি এসে ধরলো। পরিচয় দিলাম গান লিখি। বললাম যে সরকারি রেডিও-টিভি’র জন্য গান লিখি। ফিল্মেও চেষ্টা করছি। ওরা খুব একটা বিশ্বাস করলো না। বললো, ‘তাহলে চল, এফডিসির রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে চল আমাদের।’ কি আর করা। ভয় নিয়েই ওদের সঙ্গে গাড়িতে উঠে বসলাম। পিঠে বন্ধুক ধরা। মনে মনে ভাবছি, ইয়াহিয়া বিরুদ্ধে গানটা যে লিখেছি আমি সেটা ওরা জানে না, এই রক্ষা। এফডিসি নিয়ে গেলাম। তখন গেট ছিলো পেছনের দিকে। এফডিসি চিনি দেখে ভাবলো যে মিথ্যে বলিনি। গেটের সামনে নিয়ে একটা লাথি মেরে আমাকে ফেলে চলে গেল। ব্যথা পেয়েছিলাম কি না সেটা আর অনুভব করিনি। ওরা চলে গেছে তাতেই শান্তি। তখন বিশাল গোফওয়ালা এক দারোয়ান ছিলেন এফডিসিতে। তিনি আমাকে চিনতেন। ভেতরে নিয়ে তিনি সেবা করলেন’- স্মৃতিচারণে বললেন কিংবদন্তি গীতিকবি।

তিনি জানান, এই মিলিটারিরা বাংলাদেশ বেতারের অনেক ক্ষতি করে গেছে। যাবার সময় সব কাগজপত্র পুড়িয়ে দিয়েছিলো তারা। অনেক গানের কোনো হিসেব পাই না আমি। হয়তো আরও অনেকেরই এমনটা হয়েছে।

Gazi-05.jpg

মায়ের চিঠির জবাব দিতে গিয়ে তৈরি হলো বিখ্যাত গান
আমি পুলিশ-মিলিটারির ভয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। অনেকদিন বাড়ি যাই না। মা চিঠি লিখলেন। ঝাপসা লেখার একটা চিঠি। মনে হয় লিখতে লিখতে কাঁদছিলেন। কাগজে চোখর পানি পড়েছিলো। হয়তো অনেক কিছুই লিখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কীভাবে কী বলবেন বুঝে উঠতে পারেননি। বকবেন নাকি শাসন করবেন! মাত্র এক লাইনের একটি চিঠি দিলেন। তার জবাব দিতে আমি লিখলাম, ‘মাগো আর তোমাকে ঘুম পাড়ানি মাসি হতে দেবোনা/ তোমার মাথার খোঁপারই ফুল বাসি হতে দেবোনা/ তোমায় মাগো কারো ঘরের দাসি হতে দেবোনা’। সেটি পরে গান হিসেবে লিখে শেষ করি। গেয়েছিলেন সাবিনা ইয়াসমিন। এটি জনপ্রিয়তা পেয়েছিলো।

জয় বাংলা বাংলার জয়
১৯৭০ সালের ৭ মার্চ, রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ডাক দিলেন। দেশের মানুষ ঝাপিয়ে পড়লো স্বাধীনতার জন্য সেই ডাকে সাড়া দিয়ে। বঙ্গবন্ধু ভাষণ শেষ করলেন ‘জয় বাংলা’ দিয়ে। সেই জয় বাংলার বারুদ ছড়িয়ে গেল সর্বত্র। যেদিন ভাষণ দিলেন সেদিনের সন্ধ্যায় ফার্মগেটে একটি স্টুডিওতে বসে আছি। সেটি তখন খুব বিখ্যাত স্টুডিও। বড় বড় সব গানের মানুষদের আনাগোনা। সেখানে ছিলেন সালাহউদ্দিন স্যার। তিনি আমার স্কুলের স্যার ছিলেন। বললেন, ‘জয় বাংলা’ নিয়ে একটা কাজ করতে পারো। এই মুহূর্তে এটা প্রচার করা খুব জরুরি। মানুষকে উৎসাহ দেবে। আমি ভাবতে থাকলাম ‘জয় বাংলা’ নিয়ে কি লেখা যায়। শেষে বাংলা শব্দটা থাকলে ছন্দ মেলাতে কষ্ট হচ্ছে। ভালো শব্দ পাই না। বাংলা, হ্যাংলা….! তারপর সেটাকে ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ করে নিলাম। দেখলাম দ্রুতই গান দাঁড়িয়ে গেল। আনোয়ার পারভেজকে ফোন করে বললাম স্টুডিওতে আসতে। সঙ্গে যেন শাহিনকেও (সংগীতশিল্পী শাহনাজ রহমতুল্লাহ) নিয়ে আসে। আব্দুল জব্বারকেও আসতে বললাম।

এদিকে হঠাৎ ঢুকলেন আলতাফ মাহমুদ। তিনি দেখলেন আমি লিখছি। কাগজটা নিয়েই বললেন, ‘বাহ, দারুণ হয়েছে তো। দে সুর করি।’ কাগজটা নিয়ে হারমোনি টান দিয়ে বসেই সুর করে ফেললেন। আমি বললাম, ‘আনোয়ার পারভেজ আসছে। আপনি বসেন।’ পরে আনোয়ার পারভেজ এলো, আলাউদ্দিন আলী এলো, জব্বার, শাহিন। সবাই মিলে দেখলাম গানটি তৈরি হলো। এর সুর-সংগীত করলো আনোয়ার পারভেজ। শাহিন আর জব্বার গাইলো। সঙ্গে আরও অনেক শিল্পী ছিলেন। গান তৈরি করে বঙ্গবন্ধুর কাছে নিয়ে গেলাম। তিনি শুনে খুব পছন্দ করলেন। বললেন এই গান দিয়েই যাত্রা করবে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। আর গান প্রকাশ হতেই রাতারাতি সবার মুখে মুখে চলে গেল ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’।

Rupantor Television

A IP Television Channel

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »